টানা বৃষ্টিতে কুড়িগ্রামে বোরো ধানে বিপর্যয়, দিশেহারা কৃষক

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি :

 

কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী উপজেলার চর শৌলমারী ইউনিয়নের চতলারতল দোলা। বোরো ধান লাগানো শত শত বিঘা জমিতে বৃষ্টির পানি জমে কোথাও কোমর-সমান আবার কোথাও হাঁটু উচ্চতায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করেছে। ধানগাছ ডুবুডুবু খাচ্ছে। মঙ্গলবার (১৯ মে) হাঁটু উচ্চতার পানি মাড়িয়ে পাকা ধান কাটছিলেন কৃষক মোঃ ফুল মিয়া (৫৭) ও তার ছেলে মোঃ শাহিন (১৮)। চোখে মুখে হতাশার ছাপ।

ভোগান্তির কথা জানাতে গিয়ে মোঃ ফুল মিয়া বলেন, ‘ঝড়ির উপরা ঝড়ি। আইগনা শুকপার দেয় না। ধান কাটি আনি নেট বিচি যে নারি দেমো (শুকাতে দেওয়া) এই কায়দাও পাই না। এমন অবস্থা দাঁড়াইছে।’

একই গ্রামের কৃষাণি মোছাঃ ইয়াতুন্নেছা (৬৩)। বৃষ্টিতে ধান আর খড় নিয়ে তার পরিবারে চলছে চরম দুর্ভোগ। মোছাঃ ইয়াতুন্নেছা জানান, পানিতে থাকা ধান কাটার শ্রমিক মিলছে না। উচ্চ মূল্যে শ্রমিক জুটলেও বৃষ্টির কারণে ধান ও খড় শুকাতে পাচ্ছেন না। গত কয়েক বছরের মধ্যে এমন দুর্ভোগ পোহাতে হয়নি। ধানের দাম পাওয়া তো দূরের কথা পচন থেকে বাঁচাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।

মোঃ ফুলমিয়া ও মোছাঃ ইয়াতুন্নেছার বাড়ি চর শৌলমারী ইউনিয়নের চতলাকান্দা গ্রাম। তাদের মতো কুড়িগ্রামের হাজারো কৃষকের ঘরে ধান নিয়ে হাহাকার, বিড়ম্বনা। জেলার সব গ্রামের একই চিত্র। বোরো ধানের জমিতে পানি আর পানি। গাদা করে রাখা খড়ে ধরছে পচন।

কৃষি বিভাগ বলছে, চলমান পরিস্থিতিতে পাকা ধান জমিতে না রেখে বৃষ্টি বিরতিতে কেটে মাড়াই করে নিতে হবে। ছাউনিযুক্ত স্থানে ধান ছড়িয়ে রাখতে হবে। এতে বাতাসে ধানের ভেজাভাব কিছুটা কমে যাবে। রোদ উঠলে ভালোভাবে শুকিয়ে নিতে হবে। তবে খড়ের ক্ষেত্রে প্রকৃতির সহায়তার বিকল্প কোনও পরামর্শ দিতে পারেনি কৃষি বিভাগ।

কৃষকদের জন্য কিছুটা স্বস্তির বার্তা দিয়ে আবহাওয়া বিভাগ বলছে, মঙ্গলবার (১৯ মে) থেকে আগামী তিন থেকে চার দিন বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমতে পারে। বৃষ্টি হলেও সকাল কিংবা রাতে হতে পারে। দিনের আবহাওয়া স্বাভাবিক ও রৌদ্রোজ্জ্বল থাকতে পারে। এই বিরতিতে পাকা ধান কেটে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে কৃষি বিভাগ।

শুধু বোরো ধান নয়, চলতি মৌসুমে আকস্মিক অতি বৃষ্টিপাতে কুড়িগ্রামে ভুট্টা, পাট ও শবজি নিয়ে চরম বিপাকে পড়েন কৃষকরা। জমিতে থাকা পাকা বোরো ধান তলিয়ে যাওয়া, কেটে নেওয়া ধান ও খড় শুকাতে না পারায় কৃষকরা দিশাহারা। শ্রমিক সংকট তাদের ভোগান্তি আরও বাড়িয়েছে।

কৃষি বিভাগ বলছে, চলতি মৌসুমে কুড়িগ্রাম জেলায় ১ লাখ ১৭ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে অতিবৃষ্টির কারণে প্রায় ৩৭ হেক্টর জমির ধান আক্রান্ত হয়েছে।

দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন

তবে কৃষকদের দাবি, ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি। জমিতে থাকা ধানের পাশাপাশি কেটে নেওয়া ধান বেশি নষ্ট হয়েছে। শুকাতে না পারায় অনেকের ধানে পচন ধরে দুর্গন্ধ বের হয়েছে। এসব ধান শুকালেও খাওয়ার যোগ্য থাকবে না। বিক্রি করে দামও পাওয়া যাবে না।

অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতে বোরো আবাদসহ কৃষিতে সংকটের কথা স্বীকার করেন কুড়িগ্রাম জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মোঃ আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘এ বছর অতিবৃষ্টিতে বোরো ধান নিয়ে কৃষকরা বিপাকে পড়েছেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করেই এগিয়ে যেতে হবে।’

কৃষকদের জন্য করণীয় সম্পর্কে এই কৃষি কর্মকর্তা বলেন, ‘রোদ না থাকলে ছাউনিযুক্ত স্থানে আলো-বাতাসে ধান ছড়িয়ে রেখে দিলে ভেজাভাব কমে যাবে। যারা কাটেননি তাদেরকে পাকা ধান কেটে নিতে হবে। পানিতে বেশিদিন পাকা ধান থাকলে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। রোদ উঠলে শুকিয়ে নিতে হবে। তবে রোদে শুকাতে না পারলে খড় ভালো রাখার বিকল্প কোনও উপায় নেই। দুর্যোগ হলে কিছুটা ক্ষয়ক্ষতি হওয়া স্বাভাবিক।’

আবহাওয়া বিভাগ বলছে, চলতি মৌসুমে কুড়িগ্রামে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত হচ্ছে। গত ১৩ মে জেলায় ১৯০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে যা বিগত ৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ১৮ মে সর্বোচ্চ ১১৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। মে মাসজুড়ে থেমে থেমে বজ্র ঝড় ও বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতরের আবহাওয়াবিদ মোঃ নাজমুল হক বুধবার দুপুরে বলেন, ‘প্রকৃতিতে কখনও কখনও ভিন্ন রকম ঘটনা ঘটে। পশ্চিমা লঘু চাপের বর্ধিতাংশ এই সময়টাতে পশ্চিমবঙ্গ ও এর আশেপাশে অবস্থান করে। কখনও যদি এই বর্ধিতাংশ বাংলাদেশের উপরে দীর্ঘ সময় বিস্তার লাভ করে এবং সেসময় সমুদ্র থেকে জলীয় বাষ্পসহ দখিনা বাতাস ওসব এলাকায় প্রবেশ করে তাহলে বৃষ্টিপাত বেশি হয়। বৃষ্টিপাতের প্রবণতা এখন কমে এসেছে। আগামী আরও তিন দিন এই প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে।’

এই বাংলা/এমএস

টপিক 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here