গাজীপুর প্রতিনিধি :
গাজীপুরে তারাবির নামাজ শেষে নিখোঁজ হওয়া এক মাদ্রাসাছাত্রকে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর মরদেহে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলার চাঞ্চল্যকর ঘটনার রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) গাজীপুর জেলা। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ছাব্বির আহম্মেদ (১৯) নামে এক যুবককে গ্রেফতার করা হয়েছে।
নিহত কিশোর মাহাবুব ইসলাম রনি (১৩) গাজীপুরের জয়দেবপুর থানাধীন ভবানীপুর পূর্বপাড়া এলাকার খুরশিদিয়া মারকাজুল উলুম কওমী মাদ্রাসা ও এতিমখানার নাজেরা বিভাগের ছাত্র ছিল।
পিবিআই সূত্রে জানা যায়, এ ঘটনায় জয়দেবপুর থানায় মামলা নং-০১, তারিখ ১ মার্চ ২০২৬, দণ্ডবিধির ৩০২/২০১/৩৪ ধারায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে।
গ্রেফতারকৃত ছাব্বির আহম্মেদ (১৯) ময়মনসিংহ জেলার ঈশ্বরগঞ্জ থানার দেওয়ানগঞ্জ বাজার এলাকার নিজ তুলন্দর গ্রামের বাসিন্দা। তার পিতা মো. আব্দুল বারেক ও মাতা মাফিয়া বেগম। বর্তমানে তিনি গাজীপুরের জয়দেবপুর থানাধীন ভবানীপুর এলাকায় হাজী ইকবাল হোসেনের বাড়িতে ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করতেন।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, বাদী তারা মিয়ার (৫৫) নাতি মাহাবুব ইসলাম রনি গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ রাত আনুমানিক ৯টার দিকে ভবানীপুর পূর্বপাড়া দারুস সালাম জামে মসজিদে তারাবির নামাজ আদায় করে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। এরপর সে আর বাসায় ফেরেনি। পরিবারের সদস্যরা সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো সন্ধান পাননি।
পরদিন ২৮ ফেব্রুয়ারি সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে স্থানীয় লোকজন ভবানীপুর পূর্বপাড়া এলাকার মোশারফ হোসেনের মালিকানাধীন একটি ফলজ ও বনজ গাছপালার জঙ্গলের ভেতর আগুনে পোড়া অবস্থায় এক কিশোরের মরদেহ দেখতে পান। খবর পেয়ে নিহতের স্বজনরা ঘটনাস্থলে গিয়ে কোমর থেকে মাথা পর্যন্ত পোড়া মরদেহটি শনাক্ত করেন, যা মাহাবুব ইসলাম রনির বলে নিশ্চিত হয়।
খবর পেয়ে জয়দেবপুর থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে এবং মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়। পরে নিহতের দাদা বাদী হয়ে থানায় মামলা দায়ের করেন।
মামলা দায়েরের পর জয়দেবপুর থানা পুলিশ পাঁচ দিন তদন্ত কার্যক্রম চালায়। একই সময় পিবিআই গাজীপুর জেলার একটি বিশেষ দল ছায়া তদন্ত শুরু করে। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ৫ মার্চ ২০২৬ রাত ৭টা ১০ মিনিটে জয়দেবপুরের ভবানীপুর এলাকা থেকে অভিযুক্ত ছাব্বির আহম্মেদকে গ্রেফতার করা হয়।
দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন
জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন এবং আদালতে স্বেচ্ছায় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিতে সম্মতি দেন। পরবর্তীতে মামলাটি পিবিআইয়ের সিডিউলভুক্ত হওয়ায় সংস্থাটি তদন্তভার গ্রহণ করে।
পিবিআই জানায়, ঘটনার দিন রাত আনুমানিক ৯টার দিকে ছাব্বির আহম্মেদ গাঁজা সেবনের উদ্দেশ্যে ওই জঙ্গলে যায়। এ সময় রনি তাকে গাঁজা সেবন করতে দেখে এবং বিষয়টি অন্যদের জানিয়ে দেওয়ার কথা বলে। এতে ছাব্বির তাকে কাউকে না বলার জন্য অনুরোধ করলেও রনি রাজি না হলে ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দেয়।
পরে পেছন দিক থেকে গলায় হাত দিয়ে চেপে ধরে এবং একপর্যায়ে ঘাড় মুচড়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। এরপর ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে মরদেহে আগুন লাগিয়ে সেখান থেকে পালিয়ে যায়।
৬ মার্চ ২০২৬ অপরাহ্নে গ্রেফতারকৃত আসামি ছাব্বির আহম্মেদ আদালতে হাজির হয়ে মাহাবুব ইসলাম রনিকে হত্যার পর মরদেহ পুড়িয়ে ফেলার বিষয়টি স্বীকার করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন।
পিবিআই গাজীপুর জেলার পুলিশ সুপার মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, “নির্মম এই হত্যাকাণ্ডটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার, স্থানীয় সোর্স তথ্য এবং পেশাদার তদন্তের মাধ্যমে অল্প সময়ের মধ্যেই হত্যার রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হয়েছে। নিরপরাধ একটি শিশুকে হত্যা করে মরদেহ পুড়িয়ে ফেলার মতো নৃশংস অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।”
তিনি আরও জানান, অপরাধ দমন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় পিবিআই গাজীপুর জেলা নিয়মিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে এবং মামলার তদন্ত কার্যক্রম এখনো চলমান রয়েছে।
এই বাংলা/এমএস
টপিক

