কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি :
কুড়িগ্রামের প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের (পিটিআই) সুপারিনটেনডেন্ট মোঃ জয়নুল আবেদীনের বিরুদ্ধে একের পর এক আর্থিক অনিয়ম ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে। তাঁর বিরুদ্ধে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে ভুয়া বিল-ভাউচার, অতিরিক্ত ভাতা দেখানো ও অতিথিকক্ষে থেকেও বাসাভাড়া উত্তোলনের মাধ্যমে প্রায় ১১ লাখ টাকার আর্থিক অসংগতির তথ্য উঠে এসেছে অডিটে।
একই সঙ্গে নিম্নমানের খাবার, অপরিচ্ছন্ন আবাসন ও নিরাপত্তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রশিক্ষণার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকেরা। তাঁদের অভিযোগ, অব্যবস্থাপনার কারণে পুরুষ ও নারী হোস্টেলের পরিবেশ নষ্ট হয়ে গেছে। পিটিআই ক্যাম্পাসে বহিরাগত মানুষের অবাধ যাতায়াতের পাশাপাশি মাদক সেবনের ঘটনাও ঘটছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ১০ অক্টোবর কুড়িগ্রাম পিটিআই এর সুপারিনটেনডেন্ট পদে যোগ দেন মোঃ জয়নুল আবেদীন। এরপর থেকে বিভিন্ন খাতে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। সরকারি বাসভবনে না উঠে তিনি দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানের অতিথিকক্ষে অবস্থান করছেন। যদিও বিধি অনুযায়ী অতিথিকক্ষে ১০ দিনের বেশি থাকার সুযোগ নেই। অতিথিকক্ষে থাকলেও তিনি বেতনের সঙ্গে বাড়িভাড়ার টাকা উত্তোলন করেছেন।
অডিট আপত্তিতে দেখা গেছে, অতিথিকক্ষে থেকেও তিনি বাড়িভাড়া বাবদ ৪ লাখ ৩২ হাজার টাকা উত্তোলন করেছেন। এ ছাড়া বিপিপিটি মনিটরিং, মেন্টরিং ও মূল্যায়ন-সংক্রান্ত শিক্ষকদের এক দিনের ডিএ ভাতা হিসেবে ৪৬ হাজার ৬১৫ টাকা এবং আইসিটি প্রশিক্ষণে ২৩৩ জনের এক দিনের ডিএ ভাতা বাবদ ১ লাখ ৬৩ হাজার ১০০ টাকার অসংগতি, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে মুদ্রিত ম্যানুয়াল ও তথ্যপুস্তক কেনার নামে ১ লাখ ১৩ হাজার ৪০০ টাকা উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে।
অডিটে আরও বলা হয়, পত্রিকায় প্রকাশ ছাড়াই ১০০ কপি ম্যাগাজিন ছাপানোর নামে জাল ভাউচারের মাধ্যমে ২০ হাজার ৫০০ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। এ ছাড়া টিচিং-লার্নিং ম্যাটেরিয়াল বাবদ ২৫ হাজার টাকা, মনিহারি সামগ্রী ক্রয়ে ৬০ হাজার টাকা, সরকারি গাড়ি ব্যবহার করেও রাতযাপন দেখিয়ে ৫০ হাজার টাকার ভ্রমণ বিল ও সরঞ্জাম ক্রয়ে আরও ২০ হাজার টাকা ব্যয় অসংগতি আছে।
দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন
এ ছাড়া দুই বছর মেয়াদি প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষকদের সাত দিনব্যাপী প্রশিক্ষণেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রত্যেক প্রশিক্ষণার্থীর জন্য দৈনিক ৪৬০ টাকা খাবার ভাতা বরাদ্দ থাকলেও নিম্নমানের খাবার সরবরাহ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন প্রশিক্ষণার্থী। তাঁরা জানান, নতুন ব্যানারের জন্য বরাদ্দ দেখালেও পুরোনো ব্যানার ব্যবহার করা হয়েছে। একইভাবে প্রশিক্ষণার্থী ও প্রশিক্ষকদের জন্য জনপ্রতি ৫০০ টাকা বরাদ্দের ‘কিট ব্যাগ’ দেখানো হলেও বাস্তবে শুধু প্যাড, কলম, খাতা, ফাইল ও নেমপ্লেট দেওয়া হয়েছে; যার বাজারমূল্য ১০০ টাকার কম।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী বলেন, সুপারিনটেনডেন্ট যোগদানের পর থেকেই অতিথিকক্ষে থাকছেন। গণপূর্ত বিভাগের একটি দল সরকারি বাসভবনটি সংস্কার করে বসবাসের যোগ্য ঘোষণা করলেও তিনি ওঠেননি। বিভিন্ন খাতে অর্থ উত্তোলন করা হলেও বাস্তবে কাজের প্রতিফলন নেই।
সম্প্রতি সরেজমিনে ক্যাম্পাস ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন স্থানে আগাছা ও জঙ্গল ছড়িয়ে আছে। ক্যাম্পাসের মাঠজুড়ে পানি। পুরুষ ও নারী হোস্টেলের কয়েকটি কক্ষের ফ্যান নষ্ট, খাট ভাঙা ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ। প্রধান ফটক অধিকাংশ সময় খোলা থাকায় বহিরাগত মানুষের অবাধ যাতায়াত চলছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন প্রশিক্ষণার্থী বলেন, প্রশিক্ষণ শেষে ভাতা দেওয়ার কথা থাকলেও এখনো তাঁরা কোনো ভাতা পাননি। দৈনিক ৪৬০ টাকার খাবার বরাদ্দ থাকলেও খাবারের মান ছিল নিম্নমানের। রাজশাহী থেকে আসা কয়েকজন প্রশিক্ষক বলেন, পিটিআই এর ভেতরে থাকার মতো পরিবেশ না থাকায় তাঁদের বাইরে হোটেলে অবস্থান করতে হয়েছে।
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পিটিআই সুপারিনটেনডেন্ট মোঃ জয়নুল আবেদীন। তিনি বলেন, ‘অডিটে যেসব অসংগতির কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর যথাযথ জবাব দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণার্থীদের ভাতা বরাদ্দ এলে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দেওয়া হবে।’ সরকারি বাসভবনে না উঠে অতিথিকক্ষে থাকার বিষয়টি স্বীকার করলেও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।
মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের অডিটর জয়তু দাস বলেন, ‘অডিটে কুড়িগ্রাম পিটিআইয়ে কিছু আর্থিক অসংগতি পাওয়া গেছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জানানো হয়েছে।’
এই বাংলা/এমএস
টপিক

