আওয়ামী সুবিধা ভোগী এলজিইডির অবসরপ্রাপ্ত সহকারী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) এবিএম সাইফুল ইসলাম দুর্নীতির মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক 

নাসরিন আক্তার :

 

এবিএম সাইফুল ইসলাম একজন অবসরপ্রাপ্ত সহকারী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক)। এবিএম সাইফুল ইসলাম এর বাড়ি যশোর জেলার বাঘারপাড়া উপজেলায়। ১৯৯৫ সালে উপসহকারী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) হিসাবে এলজিইডির একটি প্রকল্পে যোগদান করেন। তার বাবা ইউনিয়ন জামাতের নেতা ছিলেন ।

এবিএম সাইফুল ইসলাম আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। তিনি ১৯৯৯ সালে নিয়ম বহির্ভূতভাবে এলজিইডিতে নিয়মিত /পদায়ন হন।

এরপর 2025 সালে জুন মাসে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসলে তিনি রাতারাতি বিএনপি সেজে যান এবং তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী মোঃ শহিদুল হাসান এর আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে এলজিইডির যান্ত্রিক শাখার কর্ণধার হন। এরপরেই তিনি ব্যাপকভাবে দুর্নীতি শুরু করেন। তার ইশারা ছাড়া কোন প্রকল্প পরিচালক প্রকল্পের গাড়ি ও যন্ত্রপাতি ক্রয় করতে পারতেন না ।

নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি সকল ক্রয় পরিচালনা করতেন এবং কোটি কোটি টাকা আয় করেছেন । এছাড়া গাড়ি মেরামতের নামে কোটি কোটি টাকা লোপাট করেছেন । তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী মোঃ শহিদুল হাসানের ঘনিষ্ঠ সহচর হওয়ায় কেউ কোন কথা বলতে পারতো না। নিজের স্ত্রী, মেয়ে ও ভাইদের জন্য এলজিইডির পাঁচটি গাড়ি ব্যবহার করতেন ।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুর্নীতির কারণে তাকে চাকুরী থেকে বরখাস্ত করা হয় । এরপরে তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মোঃ তাজুল ইসলামের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং চাকরি ফিরে পান ।

অতঃপর তাকে ২০১৮ সালে টাঙ্গাইল জেলার নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ে সহকারী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) হিসাবে পোস্টিং দেওয়া হয়। তৎকালীন মন্ত্রীর ক্ষমতার দাপটে টাঙ্গাইলে তিনি কোনদিনই অফিস করেননি । অথচ বেতন ভাতা দি নিয়মিত উত্তোলন করেছেন।

বিগত পাঁচই আগস্ট ২০২৪ গণঅভুত্থানের পর তিনি প্রধান প্রকৌশলী মোঃ আলী আকতার হোসেন কে কোটি টাকা ঘুষ দিয়ে এলজিইডি সদর দপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী ( যান্ত্রিক) হিসেবে পোস্টিং করান পূর্বের ন্যায় যান্ত্রিক শাখায় লুটপাটের জন্য । তিনি আবার যান্ত্রিক শাখার সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী পদ দখলে নেন কয়েকজন কে ডিঙ্গিয়ে ।তিনি সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী যান্ত্রিকের দায়িত্ব নেওয়ার পর এতে যান্ত্রিক শাখার অন্যান্য প্রকৌশলী গনের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয় । তিনি যে রুমে বসতেন সেই ধরনের রুম এলজিইডির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর নেই । তিনি প্রতিজন গাড়ি চালক বদলি করে লক্ষ লক্ষ টাকা বানিজ্য করেছেন । এতে গাড়ি চালকদের মধ্যে ব্যাপক অশান্তোস ছিল ।

চাকুরী হারানোর ভয়ে কেউ কিছু বলতে পারেনি ।তিনি চাকুরীকালীন সময়ে গাড়ি মেরামতের নামে কোটি কোটি টাকা কামাই করেছেন । একজন সহকারি প্রকৌশলী হলেও তিনি ব্যবহার করতেন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীদের জন্য নির্ধারিত গাড়ি (গাড়ি নং ঢাকা মেট্রো ঘ ১৩- ১৮৬১ ) ।

তিনি নবম গ্রেড ভুক্ত কর্মকর্তা । কোন অবস্থায় গাড়ি বরাদ্দ পেতে পারেন না। অর্থাৎ সরকারি গাড়ি প্রাধিকার ভুক্ত কর্মকর্তা ছিলেন না ।এছাড়া তার ভাই মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম একজন কর্মচারী হয়েও সরকারি গাড়ির ব্যবহার করেছেন তার ক্ষমতা বলে। এখন অবসরে গিয়েও ক্ষমতার দাপটে ঢাকা মেট্রো ঘ- ১৮-২৯৯৫ নম্বর অত্যাধুনিক জিপ গাড়ি ফুলটাইম সাইফুল ইসলাম ব্যবহার করছেন। মোঃ শহিদুল হাসান স্থানীয় সরকার বিভাগের চুক্তিভিত্তিক সচিব নিয়োগ পাওয়ার পর এলজিইডিতে দুর্নীতিবাজ দালালদের নিয়ে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন ।

এই সিন্ডিকেট গ্রুপের মুখ্য ব্যক্তি এবিএম সাইফুল ইসলাম। তার ইশারা ছাড়া এখন এলজিইডিতে কোন নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি হয় না ।তিনি উপজেলা প্রকৌশলী /সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী বদলি করে ১৫ লক্ষ হতে ২০ লক্ষ টাকা; নির্বাহী প্রকৌশলী বদলি করে ৫০ লক্ষ থেকে এক কোটি টাকা এবং পদোন্নতির ক্ষেত্রে সার্ভার থেকে উপসহকারী প্রকৌশলী পদোন্নতিতে ৫ লক্ষ টাকা করে ; উপোসহকারী প্রকৌশলী থেকে সরকারি প্রকৌশলী পদোন্নতিতে ১০ লক্ষ টাকা করে এবং নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) প্রদানের জন্য ২০ লক্ষ টাকা করে ঘুষ নিয়েছেন ।

প্রকল্প পরিচালক নিয়োগে প্রকল্পের ধরন অনুযায়ী 50 লক্ষ টাকা থেকে দুই কোটি টাকা পর্যন্ত ঘুষ নিয়েছেন । কোন কর্মকর্তা ঘুসের টাকা দিতে অস্বীকার করলে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব কে দিয়ে তাদের ফাইল আটকায় রাখা হয়। সাইফুল ইসলাম এর দালালি ও ক্ষমতার দাপটের কারণে এলজিইডি তে অনেকেই আতঙ্কিত ও স্তব্ধ । শহিদুল হাসান চুক্তিভিত্তিক সচিব নিয়োগ পাওয়ার পর সাইফুল ইসলাম এর মধ্যেই শত কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য করেছেন। এছাড়া কোন প্রকল্পের যানবাহন ও যন্ত্রপাতি ক্রয়ে তার পছন্দমত লোক ছাড়া কেহ কাজ পায় না।

এবিএম সাইফুল ইসলাম এর ছোট ভাই মোঃ তরিকুল ইসলাম হিসাব রক্ষক হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ নগর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে কর্মরত তরিকুল ইসলাম খুবই দুর্নীতিবাজ একজন কর্মচারী । প্রকল্পের স্কিম অনুমোদন ও প্রাককলন অনুমোদন দিয়ে ৫% হারে টাকা নিতেন পৌরসভার মেয়রদের কাছ থেকে ।

দরপত্র মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুমোদন দিয়ে ২ পার্সেন্ট হারে টাকা নিতো এবং অর্থ ছাড় করে ৩ পার্সেন্ট হারে টাকা নেন । তার বিরুদ্ধে পৌরসভার মেয়রগন অভিযোগ উত্থাপন করলে তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী মোঃ আবুল কালাম আজাদ তাকে দোহার উপজেলায় বদলি করেন ।

সেখানে কিছুদিন কাজ করার পর আওয়ামী লীগের মন্ত্রী তাজুল ইসলামকে ধরে 50 লক্ষ টাকা ঘুষ দিয়ে পুনরায় গুরুত্বপূর্ণ নগর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে হিসাব রক্ষক পদে পোস্টিং নেন । ঘুষের সব টাকা মোঃ তরিকুল ইসলামের স্ত্রী এক্সিম ব্যাংকের কর্মকর্তা এর একাউন্টে জমা হতো । ঘুসের টাকা জমা এবং উত্তোলনের কারণে ও দুর্নীতির কাজে সহায়তা করার জন্য তরিকুল ইসলামের স্ত্রীকে এক্সিম ব্যাংক থেকে অব্যাহতি প্রদান করা হয় । দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত টাকা দিয়ে তরিকুল ইসলাম ধানমন্ডি 13 নম্বর সড়কে দুইটি দুটি ফ্লাট কিনেছেন যার প্রতিটির আয়তন ৩ হাজার বর্গফুট। দুটি বিলাসবহুল গাড়ি কিনেছেন নিজের ও ছেলে মেয়েদের ব্যবহারের জন্য । তরিকুলের দুর্নীতির খবর পত্রিকা প্রকাশিত হলে এবং এ বিষয়ে দুদকে অভিযোগ দাখিল করা হলে দুদক এর সত্যতা পাওয়ায় তরিকুলের বিরুদ্ধে দ্রুত মামলা করেছে এবং সেই মামলা বর্তমানে চলমান রয়েছে।

এবিএম সাইফুল ইসলাম দুর্নীতির মাধ্যমে ২০০ কোটি টাকার মালিক হয়েছেন । তিনি ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে দুইটি ফ্লাট কিনেছেন যার প্রতিটি আয়তন 2700 বর্গফুট এবং এই ফ্লাটে তিনি এখন বসবাস করেন। নির্মাণ করেছেন মিরপুর পল্লবীতে কে – ৫৭ নম্বর ৫ কাঠার প্লটে ছয় তলা ভবন ; বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় কিনেছেন দুইটি পাঁচ কাঠকাটা প্লট ; পূর্বাচলে নিয়েছেন দুইটি পাঁচ কাটার প্লট; সাভারের কোন্ডা ও গান্ধারিয়া মৌজায় কিনেছেন তিন বিঘা জমি । বিভিন্ন ব্যাংকে আছে বেনামে 50 কোটি টাকা । এছাড়া তার ভাই, স্ত্রী ও শ্যালকের নামে আরো অনেক সম্পদ রয়েছে । তিনি এতই টাকার মালিক যে তিনি তার ভাই ও শ্যালকে তার নিজ খরচে লন্ডনে পড়ালেখা করিয়েছেন এবং সেখানে কিনেছেন ১৫ কাঠা জমির উপর ১৫ কোটি টাকা মূল্যের বাড়ি। তিনি তার লন্ডনে বসবাসকারী ভাই ও শ্যালকের হিসাব নম্বরে পাচার করেছেন শত কোটি টাকা । নিজ এলাকায় যশোরের বাঘারপাড়ায় রয়েছে নামে বেনামে ৫০ বিঘা জমি ।

তার দাপটে নিজ এলাকার লোকজন থাকে তটস্থ । তার অনুমতি ছাড়া বা তাকে বাদ দিয়ে কেউ কোনো জমি কিনতে পারে না। সম্প্রতি এলজিইডির নিয়োগ , বদলি ও পদোন্নতি ঘুস বানিজ্য করে নিজের ও স্ত্রীর নামে কিনেছেন একটি অত্যাধুনিক জিপ গাড়ি এবং একটি নতুন প্রেমিও গাড়ি।

এই বাংলা/এমএস

টপিক 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here