রাজধানীর মিরপুর সেকশন ২ এর পুনর্বাসন এলাকায় জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের উন্মুক্ত জায়গা দখল করে পাঁচটি দোকান নির্মাণ করে ভাড়া দেওয়ার ঘটনায় উচ্ছেদের নোটিশ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। স্মারক নম্বর ৪২ নম্বরের নোটিশটি গত ৭ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে জারি করা হয় এবং তাতে আগামী সাত দিনের মধ্যে অবৈধভাবে নির্মিত দোকান ভেঙে অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নোটিশে প্রাপক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে শহীদ ইসলাম গং, যার ঠিকানা ব্লক এইচ, রোড ৪, পুনর্বাসন প্লট নম্বর ১/১, সেকশন ২, মিরপুর, ঢাকা। একই ঠিকানার জনৈক ব্যক্তি ওই প্লটের পশ্চিম পার্শ্বের কর্তৃপক্ষের উন্মুক্ত জায়গায় পাঁচটি দোকান নির্মাণ করেছেন বলে সরেজমিন পরিদর্শনে পাওয়া গেছে। নোটিশে বিষয়টি স্পষ্টভাবে বেআইনি এবং প্লটের বরাদ্দপত্র ও ইজারা চুক্তিপত্রের পরিপন্থী বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
নোটিশে আরও বলা হয়েছে, যদি নির্দেশিত সময়ের মধ্যে দোকানগুলো স্বেচ্ছায় অপসারণ করা না হয়, তাহলে কর্তৃপক্ষ উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করে অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে দেবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নামে বরাদ্দকৃত প্লটের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবর পত্র পাঠানো হবে। এতে প্লট বরাদ্দ বাতিলের মতো কঠোর পরিণতির সম্ভাবনাও ইঙ্গিত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের ঢাকা উপ-বিভাগ-২ এর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী রবিউর রাশেদুল আলম ও উপ-সহকারী প্রকৌশলী-২ আবদুল ওয়াদুদ তালুকদারের কাছে জানতে চাইলে তারা জানান, দোকান মালিককে ইতোমধ্যে নোটিশ করা হয়েছে। নোটিশে উল্লেখিত নির্দেশনা অনুযায়ী দোকান মালিক যদি অবৈধভাবে নির্মিত দোকানগুলো নিজ দায়িত্বে ও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অপসারণ না করেন, তাহলে উচ্ছেদ অভিযানের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের আরও একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এ বিষয়ে জানান, নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজন হলে আরও নোটিশ জারি করা হবে। তিনি জানান, ব্লক এইচ ও এর আশেপাশের এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে দোকান করার জন্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের কাছে জায়গা বরাদ্দের আবেদন করেছিল, তবে কোনো আবেদনই এখনো বরাদ্দ পায়নি। আবেদনকারীদের জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হয়নি, কিন্তু অন্য একটি চক্র দখল করে সেখানে স্থাপনা গড়ে তুলেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। হাউজিং সূত্র থেকে জানা গেছে, উচ্ছেদ অভিযানের প্রস্তুতি চলছে এবং এ ধরনের দখলের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক নোটিশ জারি করা হবে।
আইনি পর্যালোচনায় দেখা যায়, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ আইন ২০০০ যা ২০০০ সালের ২৭ নং আইন হিসেবে পাস হয়, এর ধারা ৭ এর অনুচ্ছেদ চ ও ছ অনুযায়ী কর্তৃপক্ষের মালিকানাধীন জমির ক্ষণাবেক্ষণ এবং বেদখল জমি উদ্ধারে উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করার দায়িত্ব সংস্থাটির। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৩১ আগস্টের উচ্ছেদ অভিযানে কর্তৃপক্ষ মিরপুরে দখলকৃত সরকারি জমি দখলমুক্ত করেছিল বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
এই ঘটনায় অবৈধ দখলকারীর বিরুদ্ধে ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৩ এর ধারা ১১ প্রযোজ্য হতে পারে। উক্ত ধারা অনুযায়ী সরকারি, আধা সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের স্বার্থযুক্ত ভূমি অবৈধভাবে দখল করা বা সেখানে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করলে তা অপরাধ হবে এবং দোষী ব্যক্তি অনধিক দুই বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন। পাশাপাশি ওই আইনের ধারা ১৪ অনুযায়ী জেলা প্রশাসক বেআইনী দখল ও স্থাপনা অপসারণের আদেশ দিতে পারবেন এবং বিধি প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত সরকারি ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের ভূমি ও ভবন দখল উদ্ধার অধ্যাদেশ ১৯৭০ এর বিধান অনুসরণে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
প্রসঙ্গত মিরপুর এলাকায় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের জমি দখলের প্রবণতা নতুন নয়। হিসাববিভাগের তথ্য উল্লেখ করে বণিকবার্তা জানিয়েছে, শুধু ঢাকা ডিভিশন ১ মিরপুরের আওতায় সেকশন ১ থেকে ১২ এবং রূপনগর সম্প্রসারণ দ্বিতীয় পর্বসহ মোট ১০ হাজার ৯৫৭ বিঘা জমি রয়েছে, যেখানে হাজারো আবাসিক, বাণিজ্যিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও পুনর্বাসন প্লটসহ হাজার হাজার নিউক্লিয়াস বাড়ি রয়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে মিরপুরে উদ্ধার করা সরকারি জমি দখলকে কেন্দ্র করে উত্তরায় কর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছিল, যা দখলকারীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেটের সক্রিয়তার ইঙ্গিত বহন করে। সম্প্রতি মিরপুর ১২ নম্বরের ঝিলপাড়ে সাত একর জায়গা দখল করে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদেও কর্তৃপক্ষ অভিযান চালিয়েছে বলে গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।
এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত দোকান মালিক শহীদ ইসলাম গংয়ের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। নোটিশে উল্লেখিত সাত দিনের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর কর্তৃপক্ষ উচ্ছেদ অভিযানে যায় কি না, সেদিকেই এখন এলাকাবাসীসহ সংশ্লিষ্ট সবার নজর রয়েছে।
এই বাংলা/এমএস