নাব্য সংকটে অচল চিলমারী–রৌমারী ফেরি: ভোগান্তি বাড়ছে, লোকসানে বিআইডব্লিউটিসি

0
167
নাব্যতা সংকটে বছরের অধিকাংশ সময় চিলমারী-রৌমারী ফেরি সার্ভিস বন্ধ থাকছে / ছবি - এই বাংলা

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি :

ভোরের কুয়াশা কাটতেই ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে জড়ো হন মানুষ। কেউ পণ্যবাহী ট্রাক নিয়ে, কেউ যাত্রী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন ফেরিঘাটে। সবার দৃষ্টি নদীর বুকে, সবার মুখে একই প্রশ্ন—আজ কি ফেরি চলবে? কিন্তু অধিকাংশ দিনই সেই প্রশ্নের কোনো উত্তর মেলে না।

চিলমারী–রৌমারী ফেরিঘাটের এই অপেক্ষার দৃশ্য এখন আর ব্যতিক্রম নয়; এটি হয়ে উঠেছে নিত্যদিনের বাস্তবতা। উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনার আশায় ২০২৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর চালু হওয়া ফেরি সার্ভিসটি এখন দুর্ভোগ, অনিশ্চয়তা ও ক্ষতির প্রতীক।

দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন

নাব্য সংকটের কারণ দেখিয়ে গত বছরের ১৯ নভেম্বর থেকে ফেরি চলাচল বন্ধ রয়েছে। ফলে যাত্রী, চালক, কৃষক ও ব্যবসায়ীরা পড়েছেন চরম ভোগান্তিতে। ফেরি বন্ধ থাকায় কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধা জেলার মানুষ ও পণ্যবাহী যানবাহনকে বিকল্প পথে দীর্ঘ পথ ঘুরে চলাচল করতে হচ্ছে। এতে যাতায়াতের সময় দ্বিগুণের বেশি লাগছে এবং পরিবহন খরচও বেড়ে যাচ্ছে। কৃষিপণ্য পরিবহন, হাটবাজারের সরবরাহ এবং জরুরি যাতায়াতে এর নেতিবাচক প্রভাব প্রতিদিনই বাড়ছে।

সোনাহাট স্থলবন্দর থেকে ময়মনসিংহে পাথর পরিবহনকারী ট্রাকচালক জসিম উদ্দিন বলেন, “ফেরি বন্ধ থাকলে যমুনা সেতু হয়ে ঘুরে যেতে হয়। এতে সময় ও খরচ দুটোই বাড়ে। ক্ষতি শুধু আমাদের নয়, পুরো এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।”

বিআইডব্লিউটিএ চিলমারী ঘাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ফেরি চালুর পর ওই বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১০৪ দিনের মধ্যে ফেরি চলেছে ৯৭ দিন। ২০২৪ সালে সারা বছরে চলেছে ২৪১ দিন। তবে ২০২৫ সালে ফেরি চালু ছিল মাত্র ৮০ দিন। উদ্বোধনের পর থেকে ২০২৬ সালের ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত মোট ৮৩৮ দিনের মধ্যে ৪৩০ দিনই ফেরি বন্ধ ছিল, যা মোট সময়ের অর্ধেকেরও বেশি।

দীর্ঘ সময় ফেরি অচল থাকায় একদিকে যাত্রী ও পরিবহন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে সরকার হারাচ্ছে রাজস্ব। লোকসানে পড়ছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি)। বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রহ্মপুত্র নদের অতিরিক্ত সিলট জমা, ডুবো চর সৃষ্টি এবং উজানের ভাঙনের কারণে দ্রুত নাব্য সংকট দেখা দিচ্ছে। উজান থেকে আসা পলিতে চর জেগে উঠছে, আবার বর্ষা মৌসুমে নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে বারবার ড্রেজিং করেও স্থায়ী সমাধান মিলছে না।

বিআইডব্লিউটিএ ড্রেজিং বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. কামরুজ্জামান জানান, “চিলমারী–রৌমারী ফেরিপথ প্রায় ২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ, যা দেশের সবচেয়ে বড় ফেরিপথগুলোর একটি। অতিরিক্ত সিলটেশনের কারণে এখানে সারা বছরই খনন প্রয়োজন। তবে স্থানীয়দের বাধার কারণে কয়েক মাস কাজ বন্ধ ছিল। বর্তমানে দুটি সরকারি ড্রেজার দিয়ে সীমিত পরিসরে খনন চলছে।”

অন্যদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, খননের কাজ কার্যকর নয়; স্থায়ীভাবে নাব্য ফিরছে না। বরং এ খাতে অর্থ অপচয় হচ্ছে বলেও তারা দাবি করেন।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশনের চিলমারী ঘাটের ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) প্রফুল্ল চৌহান বলেন, “নাব্য সংকটের কারণে ফেরি চলাচল বন্ধ রয়েছে। ডুবো চর ও খনন বন্ধ থাকায় হকের চর এলাকায় ফেরি চলাচলের মুখ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। বর্ষা মৌসুম ছাড়া ফেরি চালুর সম্ভাবনা নেই।”

তিনি আরও জানান, ফেরি বন্ধ থাকায় প্রতিমাসে বিআইডব্লিউটিসির প্রায় সাড়ে ১২ লাখ টাকা লোকসান হচ্ছে। পাশাপাশি ঘাটের অন্তত ২০ জন কর্মচারী দীর্ঘদিন ধরে কার্যত অলস সময় পার করছেন।

এই বাংলা/এমএস

টপিক 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here