কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি :
তিস্তা নদী কখনও শান্ত, কখনও উচ্ছ্বসিত। এই নদীর বুকে দাঁড়িয়ে যেন সময় একটু থমকে যায়। কুড়িগ্রামের চিলমারী আর গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে নির্মিত মওলানা ভাসানী সেতু আজ শুধু মানুষের পথ চলার মাধ্যম নয়। এটি হয়ে উঠেছে ভ্রমণ, প্রকৃতি ও যোগাযোগ–এই ত্রিমিলনের নতুন দিগন্ত। পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে সেতু হয়ে উঠতে পারে একটি শহরচিত্রের পরিবর্তনকারী শক্তি। তিস্তাতীরকে দিতে পারে নতুন পরিচয়–একটি রিভার ট্যুরিজম হাব।
দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন
মওলানা ভাসানী সেতুর দৈর্ঘ্য ১ দশমিক ৪৯ কিলোমিটার। এটি একটি দুই লেনের প্রি-স্ট্রেসড কংক্রিট গার্ডার সেতু। তিস্তা নদীর ওপর নির্মিত সেতুটি গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ ও কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী অঞ্চলের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেছে। চলতি বছরের ২০ আগস্ট সেতুটির উদ্বোধন করা হয়।
নির্মাণ ব্যয় ৯২৫ কোটি টাকা। সেতুটি নির্মাণের পরই দুই জেলায় যোগাযোগে আসে গতিময়তা। সাফল্য এখানেই থেমে নেই। মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ভিড়, সামাজিক মাধ্যমে অসংখ্য ছবি, ভিডিও–সব মিলিয়ে সেতুটি অল্পসময়েই হয়ে উঠেছে উত্তরাঞ্চলের নতুন পর্যটনকেন্দ্র।
সরেজমিনে সেতু এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, বিকেলের আকাশ একটু লাল হলেই সেতুর দুই প্রান্ত জমে ওঠে। সন্ধ্যায় মানুষের মেলা বসে। পরিবার নিয়ে কেউ আসেন প্রকৃতির সান্নিধ্য পেতে। বন্ধুরা আসেন আড্ডা দিতে। ছোট বাচ্চারা খোলা জায়গায় ছোটাছুটি করে। তিস্তায় ভাসমান নৌকার সারি, দূরে দিগন্তজোড়া বাতাস, আর ডুবে যাওয়া সূর্যের লাল আভা–সব মিলিয়ে সেতুটিকে দেয় অন্যরকম এক সৌন্দর্য।
স্থানীয় কয়েকজন তরুণ নিজ উদ্যোগে সেতু ঘিরে চালু করেছেন নৌভ্রমণের ব্যবস্থা। দর্শনার্থীরা উপভোগ করছেন নতুন অভিজ্ঞতা, জলে ভাসা নৌকার ওপর সীমাহীন আকাশ আর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল সেতু। তবে আনন্দের মধ্যেই রয়েছে নিরাপত্তাহীনতা। নৌযাত্রার কোনো নির্দিষ্ট নীতিমালা নেই, নেই লাইফ জ্যাকেট বা নিরাপত্তা বেষ্টনী। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।
তিস্তায় নৌভ্রমণ নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত তুলনামূলক নিরাপদ ও আকর্ষণীয়। তিস্তা-ব্রহ্মপুত্র মোহনা ব্রহ্মপুত্র নদের সবচেয়ে প্রশস্ত অংশগুলোর একটি, যা নৌভ্রমণের অভিজ্ঞতাকে আরও মনোমুগ্ধকর করে তোলে। ভাসানী সেতু ও চিলমারী নদীবন্দরে সূর্যাস্ত দেখার জন্য বিশেষভাবে জনপ্রিয় দুটি স্পট।
তিস্তাঘেঁষা অঞ্চলে রৌমারীর কাছে ভারতের মেঘালয়ের বিস্তীর্ণ পাহাড় দেখা যায়। পড়ন্ত বিকেলে চিলমারী নদীবন্দর থেকে তাকালে নীলাভ ধোঁয়াটে রঙে মোড়া পাহাড়ের সারি অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অসাধারণ দৃশ্য সৃষ্টি করে।
এত আকর্ষণীয় সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এলাকায় পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাব রয়েছে। দর্শনার্থী মিনহাজুল ইসলাম মনে করেন, প্রয়োজনীয় সুবিধা বাড়ানো গেলে এটি উত্তরবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মোঃ সালাম উদ্দিন জানান, এখানে বসার জায়গা, টয়লেট এবং ভালো খাবারের ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে। স্থানীয়দের এই কথাগুলোই বাস্তব চাহিদাকে স্পষ্ট করে তুলে ধরে।
তবে আশার কথা শুনিয়েছেন রেল, নৌ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটির সাবেক সভাপতি নাহিদ হাসান। তাঁর প্রস্তাব–ভাসানী সেতু ও তিস্তাভূমিকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা যেতে পারে রিভার পার্ক। গড়ে উঠতে পারে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। স্থানীয় হস্তশিল্প বাজারও হতে পারে পর্যটনের বাড়তি আকর্ষণ। এমনকি ভাসানী স্মৃতিকেন্দ্র গড়ে উঠলে ইতিহাস, প্রকৃতি আর মানুষের মিলনস্থল হয়ে উঠবে এই সেতু ও নদীভূমি।
পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মোঃ রেজাউল করিম মনে করেন, এ অঞ্চলে গড়ে উঠছে বড় ধরনের পর্যটন সম্ভাবনা। পরিকল্পিত উদ্যোগ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, নৌ-পরিবহন ও বিনোদন সুবিধার উন্নয়ন করা গেলে এটি উত্তরাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন জোনে পরিণত হবে। এর ফলে স্থানীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায় আসবে ইতিবাচক পরিবর্তন।
কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলেন, সেতুকে ঘিরে পর্যটনের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তা বিবেচনায় এনে এলাকাটিকে পর্যটন মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা চলছে। ভবিষ্যতে এখানে সার্বিক উন্নয়ন হলে তিস্তাতীর ঘিরে গড়ে উঠতে পারে একটি আধুনিক রিভার ট্যুরিজম স্পট।
এই বাংলা/এমএস
- টপিক

