নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী হালতিবিল বর্ষা মৌসুমে পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে ওঠে। বিস্তীর্ণ জলরাশি ও ঢেউয়ের কারণে স্থানীয়ভাবে ‘মিনি কক্সবাজার’ হিসেবে পরিচিত এ এলাকায় প্রতিদিনই বিভিন্ন স্থান থেকে দর্শনার্থীরা আসেন। তবে পর্যটনের সম্ভাবনাময় এ স্থানটিতে নৌভ্রমণের নামে উচ্চ শব্দে গান বাজানো, শৃঙ্খলাহীনতা ও অশালীন আচরণের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে নৌকা ভাড়াকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে পর্যটকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও করছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, হালতিবিলে চলাচলকারী কিছু ইঞ্জিনচালিত নৌকায় উচ্চ শব্দে গান বাজানো হয়। কিছু নৌকায় কাপড় বা ত্রিপল দিয়ে আড়াল তৈরি করে পর্যটকদের নির্জনে সময় কাটানোর সুযোগ দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ সুযোগে কিছু নৌকার মাঝি অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছেন বলে দাবি স্থানীয়দের।
তাদের অভিযোগ, নৌকা ভাড়া নেওয়ার ক্ষেত্রে নির্ধারিত মূল্যের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হচ্ছে। ফলে পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরতে আসা অনেক দর্শনার্থী ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, হালতিবিলে নৌভ্রমণ পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ হলেও নৌযানে পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকায় কিছু ব্যক্তি এর সুযোগ নিচ্ছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্ধারিত ভাড়া ও আচরণবিধি থাকলেও তা সব ক্ষেত্রে মানা হচ্ছে না বলে তারা অভিযোগ করেন।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে সব তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
পর্যটকদের নিরাপত্তা ও পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ
স্থানীয়দের মতে, হালতিবিলকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে প্রথমেই নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে পরিবার নিয়ে আসা দর্শনার্থীরা যাতে স্বাচ্ছন্দ্যে নৌভ্রমণ করতে পারেন, সে জন্য নৌযানে আচরণবিধি বাস্তবায়ন, অতিরিক্ত শব্দ নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত প্রশাসনিক নজরদারি প্রয়োজন।
তারা আরও বলেন, উচ্চ শব্দে সাউন্ডবক্স ব্যবহারের কারণে শব্দদূষণ হচ্ছে। এতে পর্যটকদের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দারাও বিরক্ত হচ্ছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু নৌকা নির্ধারিত এলাকার বাইরে গিয়ে দীর্ঘ সময় অবস্থান করে। এতে নৌযান পরিচালনা ও পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
নির্ধারিত ভাড়া কার্যকর করার দাবি
হালতিবিলে পর্যটকদের নৌভ্রমণের সুবিধার্থে গত ৩০ জুলাই উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নৌকার ভাড়া নির্ধারণ করা হয়। ‘হালতিবিল সংরক্ষণ ও পর্যটন বিকাশ’ কমিটির সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পর্যটকদের কাছ থেকে নির্ধারিত ভাড়া নেওয়ার কথা।
তবে স্থানীয়দের দাবি, নির্ধারিত ভাড়ার পরও কিছু নৌকার মালিক ও মাঝি পর্যটকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নিচ্ছেন। ফলে ভ্রমণ শেষে অনেক দর্শনার্থী অসন্তোষ নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি চক্র নৌকা পরিচালনা ও ভাড়ার বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করছে। তবে এ অভিযোগের সঙ্গে কারা জড়িত বা এর পেছনে কারও রাজনৈতিক কিংবা প্রশাসনিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পর্যটন নগরী গড়ার উদ্যোগ
হালতিবিলকে আরও আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা হালতিবিল পরিদর্শন করে এটিকে পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলার ঘোষণা দেন। এ সময় জাতীয় সংসদের হুইপ ও নাটোর-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. শামমিউজ্জামানসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
স্থানীয়রা বলছেন, পর্যটনকেন্দ্রটির উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পাশাপাশি নৌযান পরিচালনায় শৃঙ্খলা, নির্ধারিত ভাড়া কার্যকর, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে সম্ভাবনাময় এই পর্যটনকেন্দ্র সম্পর্কে দর্শনার্থীদের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে।
প্রশাসনের বক্তব্য
হালতিবিলে শৃঙ্খলা ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করতে নিয়মিত অভিযান চালানোর কথা জানিয়েছেন নলডাঙ্গা থানার ওসি (তদন্ত) ইব্রাহিম খলিল। তিনি বলেন, “হালতিবিলে আমরা পরিচ্ছন্ন পরিবেশ চাই। এ জন্য আমাদের নিয়মিত অভিযান চলছে এবং চলবে।”
নলডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আল এমরান খাঁন বলেন, হালতিবিলে অশালীনতা বন্ধে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
নাটোরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক বলেন, হালতিবিলে উচ্চস্বরে সাউন্ডবক্স ব্যবহার ও অশালীনতা বন্ধে পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারি ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে হালতিবিলের পর্যটন পরিবেশ আরও নিরাপদ ও শৃঙ্খলাপূর্ণ হবে। একই সঙ্গে নৌকা ভাড়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত হলে দর্শনার্থীদের আস্থা বাড়বে এবং হালতিবিলকে একটি সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ আরও সফল হবে।
এই বাংলা/এমএস