মোহাম্মদ মোশার্রাফ হোছাইন খান :
আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক পিএলসি-এর নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী ও অভ্যন্তরীণ ডিসক্লোজার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের পর ব্যাংকটির করপোরেট সুশাসন, রেগুলেটরি তদারকি এবং নৈতিক পরিপালনের এক ভয়াবহ চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের যেখানে ০% লভ্যাংশ দিয়ে সম্পূর্ণ খালি হাতে ফেরানো হয়েছে, সেখানে ব্যাংকের শীর্ষ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ নিজেদের জন্য রাজকীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করেছে। সবচেয়ে নজিরবিহীন বিষয় হলো, ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রতি মাসে দেশের প্রধানমন্ত্রীর নির্ধারিত মাসিক বেতনের চেয়ে ১৫.৫ গুণেরও বেশি বেতন-ভাতা পকেটে পুরেছেন। এই তীব্র বৈষম্য ব্যাংকের সামগ্রিক আর্থিক কাঠামোর চরম অবক্ষয়কে স্পষ্ট করে, যেখানে ১৫ হাজার কোটি টাকার ঝুঁকিপূর্ণ ও খেলাপি ঋণ আড়াল করতে চতুর অ্যাকাউন্টিং পদ্ধতি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া বিশেষ নীতিমালার অপব্যবহার করা হয়েছে।
আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক: প্রধান আর্থিক সূচকসমূহ
-
নিট বিনিয়োগ আয় (Net Income): ▼ ৫১.৩২% (কমে দাঁড়িয়েছে ৬০৬.৭ কোটি টাকা)
-
কর-পূর্ববর্তী মুনাফা (PBT): ▼ ৭৩.৪৮% (কমে দাঁড়িয়েছে ১০৮.১ কোটি টাকা)
-
খেলাপি বিনিয়োগ (NPI রেশিও): ▲ ১৭.১৬% (৮,৮৫২.২০ কোটি টাকা)
-
মূলধন পর্যাপ্ততা (CRAR): ১০.৭২% (ন্যূনতম রেগুলেটরি সীমা: ১২.৫%)
-
শেয়ারহোল্ডার লভ্যাংশ: ০% (কোনো ডিভিডেন্ড দেওয়া হয়নি)
১৫ হাজার কোটি টাকার আর্থিক ধস ও লোকসান লুকানোর চতুর কৌশল ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে সম্পূর্ণ কৃত্রিম উপায়ে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ ছাড়ের ওপর ভর করে টিকে রয়েছে, যা ব্যাংকিং পরিভাষায় টেকনিক্যাল ইনসলভেন্সি বা প্রায়-দেউলিয়া অবস্থার শামিল।
-
বিশাল খেলাপি ঋণ (NPL): ব্যাংকটির ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের পাহাড় জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। মোট বিনিয়োগের ১৭.১৬% বা ৮,৮৫২.২০ কোটি টাকা (৮৮,৫২২.০৪ মিলিয়ন) ইতোমধ্যে খেলাপি বা চরম ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে (NPI) পরিণত হয়েছে।
-
প্রভিশন ঘাটতি ও ডেফারাল ফাঁকিবাজি: বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর নিয়মনীতি অনুযায়ী এই বিশাল খেলাপি ঋণের বিপরীতে যে পরিমাণ নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন রাখার বাধ্যবাধকতা ছিল, ব্যাংকটি তা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। এর ফলে শুধু বিনিয়োগ খাতেই প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪,৯৯৮.৫৮ কোটি টাকা। ব্যাংকটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বিশেষ ‘ডেফারাল বা স্থগিতাদেশ সুবিধা’ নিয়ে এই লোকসানকে কাগজে-কলমে কয়েক বছরের জন্য স্থগিত রেখেছে। এই বিশেষ সুবিধা না থাকলে ব্যাংকটির ৫,৩০৬.৬৮ কোটি টাকার প্রকৃত নিট লোকসান জনসমক্ষে চলে আসত।
-
মূলধন পর্যাপ্ততার সংকট: ব্যাসেল-৩ (Basel III) আন্তর্জাতিক নীতিমালা অনুযায়ী ব্যাংকটির মূলধন পর্যাপ্ততার হার (CRAR) যেখানে ন্যূনতম ১২.৫০% থাকা বাধ্যতামূলক, সেখানে তা আশঙ্কাজনকভাবে কমে ১০.৭২%-এ নেমে গেছে। সব মিলিয়ে খেলাপি ঋণ, বিপুল প্রভিশন ঘাটতি এবং রাইট-অফ (অবলোপন) হিসাব করলে ব্যাংকটির সামগ্রিক আর্থিক ঝুঁকি ও ধসের পরিমাণ প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা।
আয়ের রেকর্ড পতন, অথচ এমডির পকেটে রাজকীয় বেতন ব্যাংকের উৎপাদনশীলতা ও ব্যবসায়িক সূচক যখন খাদের তলানিতে, তখন শীর্ষ নির্বাহীদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর এই প্রবণতা প্রাতিষ্ঠানিক নৈতিকতার চরম বিপর্যয়কে নির্দেশ করে। বাংলাদেশের “দ্য প্রাইম মিনিস্টারস (রেমুনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজ) অ্যাক্ট” অনুযায়ী মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্ধারিত মাসিক মূল বেতন ১ লক্ষ ১৫ হাজার টাকা। অথচ আল-আরাফাহ ব্যাংকের এমডি মো. রাফাত উল্লাহ খান বছরে মোট ২ কোটি ১৪ লক্ষ ২৪ হাজার ৬৪৬ টাকা বিশাল বেতন-ভাতা গ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ, তিনি প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ১৭.৮৫ লক্ষ টাকা বেতন নিয়েছেন, যা প্রধানমন্ত্রীর বেতনের ১৫.৫ গুণেরও বেশি।
অথচ তার এই মোটা বেতনের বিপরীতে ব্যাংকের আর্থিক পারফরম্যান্স ছিল নজিরবিহীনভাবে ব্যর্থ:
-
বিনিয়োগ আয়ে ধস: মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকের মূল আয়ের উৎস বা নিট বিনিয়োগ আয় (Net Investment Income) ৫১.৩২শতাংশ ধসে গিয়ে ১২,৪৬৪ মিলিয়ন টাকা থেকে মাত্র ৬,০৬৭ মিলিয়ন টাকায় নেমে এসেছে।
-
মুনাফায় পতন: চরম অব্যবস্থাপনা এবং খেলাপি ঋণের খরচের কারণে ব্যাংকের কর-পূর্ববর্তী মুনাফা (Profit Before Tax) আগের বছরের চেয়ে ৭৩.৪৮ শতাংশ হ্রাস পেয়ে মাত্র ১,০৮১.৬৫ মিলিয়ন টাকায় দাঁড়িয়েছে।
সাধারণ আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীরা যেখানে শূন্য (০%) লভ্যাংশ পাচ্ছেন, সেখানে শীর্ষ নির্বাহীর এই বিপুল অর্থ গ্রহণ আমানতকারীদের সাথে একটি শরীয়া ব্যাংকের চরম নৈতিক বিশ্বাসঘাতকতা।
নামমাত্র মূল্যে শরীয়াহর ছাড়পত্র: সবচেয়ে বড় রেগুলেটরি প্রহসন এই চরম আর্থিক বিপর্যয়ের মাঝে সবচেয়ে বড় কাঠামোগত প্রহসনের জন্ম দিয়েছে ব্যাংকের শরীয়াহ সুপারভাইজরি কমিটি। যখন ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ চরম ঝুঁকিতে, তখন শরীয়াহ কমিটি ব্যাংকের সার্বিক কার্যক্রমকে “শরীয়াহ নীতিমালা অনুযায়ী পরিচালিত হয়েছে” বলে একটি রুটিন ছাড়পত্র বা বৈধতা দিয়েছেন।
দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন
আর্থিক অসামঞ্জস্যতা: বার্ষিক ব্যয় বরাদ্দ বিশ্লেষণ
-
পুরো শরীয়াহ বোর্ডের বার্ষিক সম্মানী (৬ জন সদস্য): ২,৫৩,৬৩৯ টাকা (গড়: জনপ্রতি মাসে মাত্র ৩,৫২২ টাকা)।
-
১ জন ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) বার্ষিক বেতন: ২,১৪,২৪,৬৪৬ টাকা (গড়: প্রতি মাসে ১৭,৮৫,০০০ টাকা)।
আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বিশাল আর্থিক ধসকে বৈধতা দেওয়া ৬ সদস্যের শরীয়াহ কমিটিকে ফি বা সম্মানী বাবদ বছরে সর্বমোট মাত্র ২,৫৩,৬৩৯ টাকা প্রদান করা হয়েছে। অর্থাৎ, গড়ে একেকজন শীর্ষ শরীয়াহ স্কলার বছরে মাত্র ৪২,২৭৩ টাকা সম্মানীর বিনিময়ে এই ব্যাংকের শরীয়াহ সনদ নিশ্চিত করেছেন।
পুরো শরীয়াহ কমিটির পেছনে ব্যাংকের বার্ষিক খরচ ছিল এমডির মাত্র ৪ দিনের বেতনের সমান। এই নামমাত্র ব্যয় প্রমাণ করে যে, ব্যাংকটিতে শরীয়াহ পরিপালনকে কোনো স্বাধীন অডিট বা কঠোর তদারকি ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করতে দেওয়া হয়নি; বরং একে কেবল একটি ‘কাগুজে আনুষ্ঠানিকতা’ বা সাইনবোর্ড হিসেবে ব্যবহার করে আর্থিক কেলেঙ্কারি ঢাকা দেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন শরীয়া বিশেষজ্ঞদের অনেকে।
বোর্ড মেম্বারদের বিলাসী সুবিধা এবং সিএসআর (CSR) ব্যয়ে চরম কৃপণতা ব্যাংকটির সামাজিক দায়বদ্ধতার অবক্ষয় এবং অভ্যন্তরীণ ব্যয় বণ্টনের চরম অসামঞ্জস্যতা নিচের দুটি চিত্রে স্পষ্ট:
-
পরিচালকদের পেছনে বিপুল ব্যয়: বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক পুনর্গঠিত ৫ জন স্বতন্ত্র পরিচালকের সমন্বয়ে গঠিত পর্ষদের সভা ও যাতায়াত বাবদ সাবসিডিয়ারিসহ সমন্বিতভাবে ৮৪.৮০ লক্ষ টাকা (৮৪, ৮০, ১৩২ টাকা) ব্যয় হয়েছে। এই হিসাবে ৫ জন পরিচালকের প্রত্যেকে গড়ে প্রায় ১৬.৯৬ লক্ষ টাকা করে সম্মানী ও আনুষঙ্গিক সুবিধা পেয়েছেন।
-
সিএসআর খাতে ধস: ব্যাংকের আর্থিক সংকটের সবচেয়ে বড় বলি হয়েছে সমাজকল্যাণমূলক খাত। পূর্ববর্তী বছরে ব্যাংকটি করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (CSR) খাতে যেখানে ২৯.৯২ কোটি টাকা ব্যয় করেছিল, সেখানে এই ব্যয় এক ধাক্কায় প্রায় ৭৪.৭৩% হ্রাস করে মাত্র ৭.৫৬ কোটি টাকায় (৭৫.৫৯ মিলিয়ন) নামিয়ে আনা হয়েছে।
এই বাংলা/এমএস
টপিক

