মোহাম্মাদ মোশার্রাফ হোছাইন খান :
দাম্পত্য জীবনের চরম ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতি হলো বিবাহবিচ্ছেদ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মুসলিম সমাজে ‘তিন তালাক’ পরবর্তী পুনর্বিবাহকে কেন্দ্র করে ‘নিকাহ হালালা’ বা ‘হিল্লা বিয়ে’ নামক এক চরম অনৈতিক প্রথার অপব্যবহার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পবিত্র কুরআনের বিধানকে অপব্যাখ্যা করে একশ্রেণীর সুযোগসন্ধানী মানুষ এটিকে একটি লাভজনক ‘বাণিজ্যিক সিন্ডিকেটে’ রূপ দিয়েছে, যা হাদীসের পরিভাষায় ‘ভাড়া করা ষাঁড়’ (The Borrowed Bull) বা ‘আল-তাইসুল মুস্তায়ার’ হিসেবে পরিচিত।
ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপট
ইসলাম-পূর্ব জাহেলিয়াত যুগে আরবে পুরুষেরা নারীদের ওপর মানসিক নির্যাতন চালাতে অগণিতবার তালাক দিত এবং ফিরিয়ে নিত। এই অমানবিক প্রথা রোধে ইসলাম সর্বোচ্চ তিন তালাকের বিধান প্রবর্তন করে নারীর সুরক্ষাকবচ তৈরি করে। মহানবী (সা.) এই আইনের ফাঁকফোকর খুঁজে চুক্তিভিত্তিক দ্বিতীয় স্বামী গ্রহণের প্রথাকে তীব্র ভাষায় ভর্ৎসনা করেছেন। তিনি এমন ব্যক্তিকে ‘আল-তাইসুল মুস্তায়ার’ বা ‘ভাড়া করা ষাঁড়’ আখ্যা দিয়ে এর সাথে জড়িত সকলের ওপর অভিশাপ দিয়েছেন (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং: ১৯৩৬)। সুতরাং, এটি কোনো ধর্মীয় অনুশাসন নয়, বরং শরীয়াহর অপব্যবহার।
বিচ্ছেদের বৈশ্বিক চিত্র ও বাংলাদেশ
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS)-এর ‘বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিক্স ২০২৩’-এর উপাত্ত অনুযায়ী, ২০২২ সালে তালাকের হার প্রতি ১০,০০০ জনে ১৪.০ জন এবং ২০২৩ সালে তা ১১.০ জনে দাঁড়িয়েছে। একটি সমাজতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, শহরাঞ্চলের (১০.০) তুলনায় গ্রামীণ এলাকায় (১৫.০) তালাকের হার ও ফতোয়ার প্রভাব বেশি। এই অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত ফতোয়াবাজদের খপ্পরে পড়েই অনেক নারী এই ঘৃণ্য প্রক্রিয়ার শিকার হন।
দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন
আইনি সীমাবদ্ধতা ও বাস্তব চিত্র
বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ ২০০১ সালের এক রায়ে (Tayeeb (Md) vs State and Others, 53 DLR 2001) ফতোয়া ও হিল্লা বিয়েকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করেছে। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৭ নম্বর ধারায় তালাক কার্যকর হওয়ার প্রক্রিয়া অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং সেখানে হিল্লা বিয়ের কোনোই সুযোগ নেই। তবে গ্রাম্য সমাজকাঠামোয় লোকলজ্জা, আইনি প্রক্রিয়ার জটিলতা এবং সচেতনতার অভাবে এখনো অনেক ভুক্তভোগী নীরব থাকছেন। এই সুযোগটিই নিচ্ছে আধুনিক ‘ডিজিটাল হালালা সিন্ডিকেট’।
ডিজিটাল যুগে অপরাধের নতুন রূপ
বর্তমানে ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে গোপন ‘হালালা সেন্টার’ খুলে অসহায় নারীদের ব্ল্যাকমেইল করা হচ্ছে। এই বাণিজ্যিক সিন্ডিকেটগুলো রাতের জন্য ‘ভাড়া করা বর’ সাজিয়ে তালাক দিতে অস্বীকার করে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করে। এটি কেবল ধর্মীয় অপরাধ নয়, বরং নারীর মর্যাদার ওপর এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ও বাণিজ্যিক যৌন নির্যাতন।
উত্তরণের পথ
১. প্রি-ম্যারেজ কাউন্সিলিং: বিয়ের রেজিস্ট্রেশনের সময় তালাকের আইনি ও ধর্মীয় নিয়ম সম্পর্কে দম্পতিদের বাধ্যতামূলক কাউন্সিলিং প্রদান।
২. গণসচেতনতা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও স্থানীয় মসজিদের খুতবার মাধ্যমে হালালার অপব্যাখ্যা ও এর আইনি প্রতিকার সম্পর্কে প্রচার।
৩. সাইবার তদারকি: সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় হালালা সিন্ডিকেটগুলোকে শনাক্ত করে কঠোর সাইবার সিকিউরিটি আইনের আওতায় আনা।
৪. ভুক্তভোগীর আইনি সুরক্ষা: তালাকপ্রাপ্ত নারীদের সুরক্ষায় সরকারি লিগ্যাল এইড ও স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারি জোরদার করা।
উপসংহার
‘নিকাহ হালালা’র নামে যা চলছে, তা কোনো ধর্মপালন নয়; বরং এটি ধর্মের লেবাসে একশ্রেণীর মানুষের চরিত্রহীনতা ও বিবেকহীনতার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। সমাজ থেকে এই অন্ধকার দূর করতে হলে কেবল আইনি শাস্তিই যথেষ্ট নয়, বরং এর বিরুদ্ধে ব্যাপক সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং নারীদের আইনি অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলা অপরিহার্য।
এই বাংলা/এমএস
টপিক

