মাত্র ৩০ টাকার টিকিটে ঈদ আনন্দ, বালিয়াটি জমিদার বাড়িতে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়

সাটুরিয়া (মানিকগঞ্জ) প্রতিনিধি :

 

​দেশের অন্যতম বৃহত্তম এবং প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী বালিয়াটি জমিদার বাড়িতে মাত্র ৩০ টাকার টিকিট কেটে ঈদের আনন্দ উপভোগ করছেন হাজার হাজার দর্শনার্থী। প্রতি বছরের মতো এবারও ঈদুল আজহার পরের দিন সকাল থেকেই এই জমিদার বাড়িতে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ করা গেছে। টানা ছুটিতে জমিদারদের প্রাচীন স্থাপত্য ও ঐতিহাসিক নিদর্শন দেখতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসছেন পর্যটকরা। আর এই পর্যটকদের কেন্দ্র করে জমিদার বাড়ির আশপাশে গড়ে উঠেছে শতাধিক ভাসমান দোকানপাট।

​পারিবারিক ভ্রমণ আর সাশ্রয়ী বিনোদনের এক দারুণ মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে মানিকগঞ্জের এই ঐতিহাসিক স্থানটি। ঈদুল আজহার পরের দিন শুক্র ও শনিবার এখানে রেকর্ডসংখ্যক পর্যটকের সমাগম ঘটে। সাধারণত রবি ও সোমবার বালিয়াটি প্যালেস জাদুঘরের সাপ্তাহিক ছুটি থাকলেও, ঈদের বিশেষ বিবেচনায় ও পর্যটকদের সুবিধার্থে এই ছুটি বাতিল করে তা উন্মুক্ত রাখা হয়। ফলে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত মুখরিত থাকছে পুরো জমিদার বাড়ি প্রাঙ্গণ।

​সহজ যোগাযোগ ও সাশ্রয়ী বিনোদন

​মানিকগঞ্জ জেলার সাটুরিয়া উপজেলার বালিয়াটি গ্রামে অবস্থিত এই জমিদার বাড়িটির যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত চমৎকার। ঢাকা থেকে বাসযোগে মাত্র দুই ঘণ্টায় এবং মানিকগঞ্জ জেলা শহর থেকে ইজিবাইক বা গাড়িতে মাত্র ৩০ মিনিটে এখানে অনায়াসেই পৌঁছানো যায়।

​সাশ্রয়ী খরচে এমন নান্দনিক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে ধামরাই উপজেলার কাওলিপাড়া গ্রাম থেকে আসা দর্শনার্থী আবু রাসেল বলেন,

​”পরিবার-পরিজন নিয়ে বেড়ানোর জন্য এটি চমৎকার জায়গা। ১০ বছরের ঊর্ধ্বের বয়সীদের জন্য মাত্র ৩০ টাকা এবং ছোট বাচ্চাদের জন্য ১০ টাকার টিকিট। বেসরকারি কোনো রিসোর্ট বা পার্কে গেলে যেখানে শুধু প্রবেশ ফি-ই লাগে হাজার টাকার ওপরে, সেখানে কোনো ধরনের হয়রানি ছাড়াই মাত্র ৩০ টাকায় আমরা ঈদের আনন্দ উপভোগ করলাম।”

​একই অনুভূতি প্রকাশ করলেন ধামরাইয়ের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকুরিজীবী মিজানুর রহমান ও ঢাকার আমিনবাজার থেকে আসা সাজ্জাদ হোসেন। সাজ্জাদ জানান, ঢাকা শহরের কোলাহল ছেড়ে আমিনবাজার থেকে ৮০ টাকা বাসভাড়া আর ১০ টাকা ইজিবাইক ভাড়ায় সহজেই এখানে চলে এসেছেন। টিকিট ও দুপুরের খাবারসহ মাত্র ২৭০ টাকার মধ্যে সারাদিন ঘুরে ঈদের আনন্দ উপভোগ করেছেন তিনি, যা ঢাকায় ঘুরলে জনপ্রতি অন্তত ১ হাজার টাকা খরচ হতো।

​ভেতরের আকর্ষণ ও ‘ভাইরাল জানালা’

​সরেজমিনে জমিদার বাড়ির ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকেই দর্শনার্থীরা প্রথমে চলে যাচ্ছেন মূল অন্দরমহলে। বালিয়াটি জমিদার বাড়ির দৃষ্টিনন্দন ৪টি বড় ভবনের মধ্যে বাঁ দিক থেকে দ্বিতীয় ভবনের দোতলায় ৪টি কক্ষে জমিদারদের ব্যবহৃত বিভিন্ন আসবাবপত্র ও ঐতিহাসিক সামগ্রী সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। কথিত আছে, এই ভবনের বড় কক্ষটিতে তৎকালীন জমিদাররা নাচ-গান ও জলসার আয়োজন করতেন।

​ভবনগুলোর বিশাল বারান্দায় দাঁড়িয়ে অনেককে সেলফি তুলতে দেখা যায়। সামনের সীমানা প্রাচীরে থাকা ৪টি রাজকীয় সিংহদ্বারের (সিংহ খচিত গেট) সামনে ছবি তোলার জন্য পর্যটকদের সবচেয়ে বেশি ব্যস্ততা লক্ষ করা গেছে। অনেকেই আবার দলবেঁধে সবুজ ঘাসের গালিচায় বসে গল্পগুজব করে সময় পার করছেন।

​সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, মাঝের ভবনের বারান্দার একটি জানালার ফ্রেম তরুণ-তরুণীদের কাছে এখন দারুণ জনপ্রিয়, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ভাইরাল জানালা’। এখানে ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করে অনেকেই ক্যাপশন দিচ্ছেন—“জমিদার বাড়ি আসব আর ভাইরাল পয়েন্টে ছবি তুলব না, তা কি হয়!”

​চাঙ্গা স্থানীয় অর্থনীতি

​জমিদার বাড়ির মূল ফটকের সামনে শিশুদের খেলনা, ফুচকা, চটপটি, ডাব, শরবত, আইসক্রিম ও বিভিন্ন লোকাল খাবারের শতাধিক অস্থায়ী দোকান বসেছে। খলিলাবাদ গ্রামের ব্যবসায়ী পাখি মিয়া জানান, এই ঈদের ছুটিতে সাময়িকভাবে বসা দোকানগুলোতে প্রায় ২ থেকে ৩ লক্ষ টাকার বেচাকেনা হয়েছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

​ভালো রাজস্ব আদায়ের আশা

​সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে থাকা বালিয়াটি প্রাসাদ জাদুঘরের সহকারী কাস্টোডিয়ান নিয়াজ মাখদুম জানান:

​”ঈদুল আজহা উপলক্ষে দর্শনার্থীদের এই বিপুল সমাগমে আমরা আনন্দিত। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ এখানে এসে আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারছেন। এতে যেমন পর্যটন খাতের বিকাশ ঘটছে, তেমনি স্থানীয় ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। ঈদের পরদিন থেকে শনিবার পর্যন্ত প্রায় দেড় লক্ষ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। আশা করছি, আগামী কয়েক দিনে টিকিট বিক্রি থেকে প্রায় ৫ লক্ষ টাকা সরকারি রাজস্ব অর্জিত হবে।”

​বালিয়াটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মীর সোহেল আহমেদ চৌধুরী বলেন, সারা বছরই এখানে পর্যটকদের আনাগোনা থাকে। তবে দুই ঈদ, পহেলা বৈশাখ এবং বিভিন্ন জাতীয় দিবসে ভিড় বহুগুণ বেড়ে যায়। ঢাকার কাছাকাছি এবং যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো হওয়ায় দিন দিন দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে এর আকর্ষণ বাড়ছে।

​ভবিষ্যৎ আধুনিকায়নের পরিকল্পনা

​সাটুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাজী মোহাম্মদ অনিক ইসলাম জানান, জমিদার বাড়ির ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব বজায় রেখে পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য উন্নত পরিষেবা ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে।

​তিনি আরও জানান, স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আফরোজা খানম রিতার বিশেষ পরিকল্পনা রয়েছে এই স্থানটিকে নিয়ে। দর্শনার্থীদের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা আরও দৃষ্টিনন্দন করতে এবং এই ঐতিহাসিক পুরাকীর্তিটির টেকসই সুরক্ষা নিশ্চিত করতে খুব দ্রুতই বড় ধরনের উন্নয়নমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা হচ্ছে।

এই বাংলা/এমএস

টপিক 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here