কুড়িগ্রামে ছাত্রকে ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত মাদ্রাসার মুহতামিমের দাবী তাকে ফাঁসানো হয়েছে

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি :

 

কুড়িগ্রাম জেলার সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের একটি মাদ্রাসায় ১৩ বছরের এক ছাত্রকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে ওই মাদ্রাসার মুহতামিমের (প্রধান শিক্ষক) বিরুদ্ধে। গত সোমবার (১৮ মে) কুড়িগ্রাম জেলার সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের যাত্রাপুর নুরানি তা’লিমুল কোরআন হাফিজিয়া মাদ্রাসায় এ ঘটনা ঘটে। মাদ্রাসার একাধিক শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।

অভিযুক্ত মাদ্রাসার মুহতামিম শিক্ষকের বাড়ি সিরাজগঞ্জ জেলায়। ধর্ষণের শিকার শিক্ষার্থীর অভিযোগের পর স্থানীয়দের মধ্যস্থতায় ওই শিক্ষককে রাতের বেলা নিরাপদে এলাকা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

তবে অভিযুক্ত শিক্ষকের দাবি, ‘আমাকে পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানো হয়েছে। দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে সুনামের সঙ্গে মাদ্রাসা চালিয়ে আসছি। কিছু লোক শত্রুতা করে আমাকে অপবাদ দিয়ে বিদায় করে দিয়েছে। স্থানীয় কিছু শিক্ষক কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে আমাকে ফাঁসিয়েছে। আল্লাহ ভালো জানেন। তিনি বিচার করবেন।’

মাদ্রাসার একাধিক শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাদ্রাসাটিতে আবাসিক ও অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন শাখায় আরবি শিক্ষা দেওয়া হয়। মোট ৯০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে আবাসিক শিক্ষার্থী ৪০ জনের কিছু বেশি। ধর্ষণের শিকার শিক্ষার্থী আবাসিকের ছাত্র। মুহতামিম মাদ্রাসায় থাকতেন।

গত ১৮ মে রাতে মাদ্রাসার প্রধান ওই শিক্ষার্থীকে নিজ কক্ষে নিয়ে ধর্ষণ করেন। কয়েকজন ছাত্র বিষয়টি বুঝতে পেরে বাইরে থেকে ঘরের দরজা লাগিয়ে স্থানীয়দের ডেকে আনে। স্থানীয় লোকজন মুহতামিমকে জেরা করলে তিনি ছাত্রকে ধর্ষণের কথা স্বীকার করেন। পরে মাদ্রাসা কমিটির সভাপতি ও স্থানীয় যাত্রাপুর ইউপি চেয়ারম্যান মোঃ আব্দুল গফুরকে জানানো হয়। স্থানীয়ভাবে সালিশ বৈঠক বসে। সালিশেও অভিযুক্ত শিক্ষক ধর্ষণের দায় স্বীকার করেন। পরে তাকে মাদ্রাসা ছেড়ে চলে যেতে বলা হয়।

ওই মাদ্রাসার এক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘মুহতামিম ও ছাত্র দুজনই ধর্ষণের কথা স্বীকার করেছেন। মুহতামিম বলেছেন, হ্যাঁ আমি দোষী। তার স্বীকারোক্তির জবানবন্দি স্থানীয় অনেকের কাছে রেকর্ড আছে। পরে স্থানীয় মুরুব্বিরা বসে ওই শিক্ষককে মাদ্রাসা থেকে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। মুরুব্বিরা যেটা ভালো মনে করেছেন সেটা করেছেন। এখানে আমার কিছু বলার নেই।’

দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন

আরেক জ্যেষ্ঠ শিক্ষক বলেন, ‘এর আগেও দুই শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছিল। তিনি স্বীকারও করেছিলেন। ক্ষমা চাওয়ায় তাকে মাদ্রাসায় রাখা হয়। কিন্তু এবার মুরুব্বিরা আর তাকে রাখতে চাননি।’

বিচার কিংবা মামলা ছাড়া তাকে যেতে দেওয়ার প্রশ্নে ওই শিক্ষক বলেন, ‘মুরুব্বিরা বসে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মুহতামিমকে রাতেই কুড়িগ্রাম জেলার শহর পর্যন্ত রেখে আসা হয়েছে। পরে তিনি সিরাজগঞ্জে নিজ বাড়িতে চলে গেছেন।’

নির্যাতনের শিকার শিশু শিক্ষার্থী বর্তমানে আর মাদ্রাসায় থাকছে না। সে বর্তমানে ব্রহ্মপুত্রের চরাঞ্চলে নিজ বাড়িতে অবস্থান করছে। তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।

অভিযুক্ত মুহতামিম বলেন, ‘আমি কোনও দায় স্বীকার করিনি। কেন করবো। রাতে ওই ছাত্র আমার কক্ষে তার ভেজা কাপড় শুকাতে দিতে আসে। এমন সময় বাইরে থেকে ঘরের দরজা লাগিয়ে দেওয়া হয়। পরিকল্পিতভাবে কেউ দোষ দিতে চাইলে আমি কী করতে পারি। মিটিংয়ে আমাকে তারা জিজ্ঞাসা করেছে ওই ছাত্র আমার ঘরে ঢুকেছিল কিনা? আমি বলেছি ঢুকেছিল। আমি তো মিথ্যা বলিনি। কিন্তু তার মানে তো এই নয় আমি ধর্ষণ করেছি।’

মুহতামিম আরও বলেন, ‘সুমন নামে স্থানীয় এক ব্যক্তির নেতৃত্বে মিটিং করা হয়। তারা আমার কাছে দুই লাখ টাকা দাবি করে। তারা টাকা চাইবে কেন? আমি এতদিন ধরে মাদ্রাসাটি চালিয়ে আসছি। কিন্তু আমাকে অপবাদ দিয়ে বিদায় করা হলো। আপনাদের যা খুশি লেখেন। আল্লাহ সব দেখেছেন, তিনি সব জানেন। তিনিই বিচার করবেন।’

স্থানীয় কুড়িগ্রাম জেলার সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান ও মাদ্রাসা কমিটির সভাপতি মোঃ আব্দুল গফুর বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয়েছে মুহতামিমকে ফাঁসানো হয়েছে। তার সঙ্গে শত্রুতা ছিল। ওই ছাত্রের বাবা আমাকে ফোন করে বলেছেন তার ছেলেকে দিয়ে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া হয়েছে। আমাকে মিটিংয়ে ডাকা হয়েছিল। কিন্তু আমি যাইনি। স্থানীয় কিছু লোক মিলে মিটিং করে হুজুরকে বিদায় করেছে। যদি হুজুরের দোষ থাকে তাহলে তার শাস্তি হোক। যদি অভিযোগ মিথ্যা হয়ে থাকে তাহলে যারা তাকে মিথ্যা অভিযোগ দিলো তাদেরও আইনের আওতায় আনা হোক। এগুলোর সঠিক তদন্ত হওয়া উচিত। ছাত্রের বাবাও তা চেয়েছেন আমাদের কাছে।’

এই বাংলা/এমএস

টপিক 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here