ঝালকাঠির নারী উদ্যোক্তা কল্পনা রানী: ছোট উদ্যোগ থেকে কোটি টাকার সফল ব্যবসা

ঝালকাঠির নারী উদ্যোক্তা কল্পনা রানী / ছবি - এই বাংলা

ঝালকাঠি প্রতিনিধি :

‎সমাজ ও অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ ক্রমেই বাড়ছে। নানা প্রতিকূলতা ও সামাজিক বাধা অতিক্রম করে অনেক নারী এখন উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছেন। নিজেদের স্বাবলম্বী করার পাশাপাশি অন্য নারীদের জন্যও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছেন তারা।

‎ঝালকাঠির নারী উদ্যোক্তা কল্পনা রানীর গল্পও তেমনই এক অনুপ্রেরণার উদাহরণ। মাত্র ১০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে ঘরে বসে প্যাকেট তৈরির কাজ শুরু করেছিলেন তিনি। দীর্ঘ ২০ বছরের পরিশ্রম, ধৈর্য আর সাহসিকতায় সেই ছোট উদ্যোগই এখন প্রায় কোটি টাকার প্যাকেজিং ব্যবসায় রূপ নিয়েছে।

‎কল্পনা রানী জানান, প্রায় দুই দশক আগে সংসারের অভাব-অনটন দূর করার চিন্তা থেকেই তিনি এই উদ্যোগ শুরু করেন। শুরুতে কোনো বড় পুঁজি ছিল না। স্থানীয় একটি এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে মাত্র ১০ হাজার টাকা দিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন। তখন নিজের ঘরেই হাতে তৈরি করতেন কাগজের প্যাকেট।

‎তিনি জানান, শুরুর সময়টা খুব কঠিন ছিল। বাসায় বসে প্যাকেট বানাতাম, তারপর নিজেই দোকানে দোকানে ঘুরে বিক্রি করতাম। তখন কেউ ভাবত না এই কাজ করে বড় কিছু করা সম্ভব। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি।

‎কল্পনা রানীর স্বামী বিমল দেবনাথ শুরু থেকেই তাকে সহযোগিতা করেছেন। স্বামীর সেই সমর্থন ও উৎসাহ তাকে সামনে এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে বলে জানান তিনি।

‎ধীরে ধীরে তার কাজের পরিধি বাড়তে থাকে। এখন ঝালকাঠি শহরের কলেজ রোডের একটি ভাড়া বাড়িতে গড়ে উঠেছে তার ছোট প্যাকেজিং কারখানা। ‘স্বর্ণা প্যাকেজিং’ নামে এই প্রতিষ্ঠানটি তিনি ছোট মেয়ের নামে করেছেন।

এই প্রতিষ্ঠানে মূলত বিভিন্ন ধরনের কাগজের প্যাকেট তৈরি করা হয়, যা বিরিয়ানি, মিষ্টি ও বিভিন্ন খাবার প্যাকেজিংয়ের কাজে ব্যবহার করা হয়। এখানে আধা কেজি, এক কেজি, দেড় কেজি এবং দুই কেজি ধারণক্ষমতার প্যাকেট তৈরি করা হয়।

‎তার তৈরি প্যাকেট শুধু ঝালকাঠির চার উপজেলাতেই নয়, আশপাশের জেলার বিভিন্ন উপজেলাতেও সরবরাহ করা হয়। বরগুনার বামনা ও বেতাগী পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া ও নৈকাঠি এলাকার বিভিন্ন দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে এসব প্যাকেট নিয়মিত যায়।

‎প্যাকেট তৈরির কাজ কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়। প্রথমে বড় কাগজ নির্দিষ্ট মাপে কাটা হয়। এরপর কাটিং প্রেস মেশিনে তা কেটে নেওয়া হয়। পরে ভাঁজ, আঠা ও স্টেপলার দিয়ে প্যাকেট তৈরি করা হয়।

কল্পনা রানী জানান, কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত কাগজ বরিশাল ও ঢাকা থেকে সংগ্রহ করা হয়। এরপর সেই কাগজ দিয়ে বিভিন্ন আকারের প্যাকেট তৈরি করা হয়। বাজারে এসব প্যাকেট ৪ টাকা থেকে ১৩ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হয়।

‎বর্তমানে তার কারখানায় একটি কাটিং মেশিন এবং একটি রোলার মেশিন রয়েছে। এসব মেশিন ব্যবহার করে প্যাকেটগুলো তৈরি করা হয়। তার এই কারখানায় বর্তমানে ছয়জন নারী কাজ করেন। এছাড়া আরও পাঁচজন নারী বাসায় নিয়ে প্যাকেট তৈরির কাজ করেন। পাশাপাশি তিনজন পুরুষ শ্রমিকও কাজ করছেন।

‎কর্মরত নারীদের প্রতিদিন প্রায় ৫০০ টাকা করে পারিশ্রমিক দেওয়া হয়। এই নারীদের মধ্যে দুইজন স্বামী পরিত্যক্ত। তাদের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করতে পেরে তিনি নিজেকে গর্বিত মনে করেন।

‎কল্পনা রানী বলেন, আমার এখানে যারা কাজ করে তাদের অনেকেই সংসার চালাতে কাজ খুঁজছিল। আমি চেষ্টা করেছি, তাদের একটা সুযোগ দিতে। তারা কাজ করে নিজেরাও আয় করছে, পরিবারেও সাহায্য করতে পারছে।

‎দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে এখন তার ব্যবসার লেনদেন প্রায় এক কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছেছে। তবে এতকিছুর পরও এখনও নানা সমস্যার মধ্যেই কাজ করতে হচ্ছে তাকে।

‎বর্তমানে যে ভাড়া বাড়িতে কারখানাটি চলছে, সেটির অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। বৃষ্টি হলে ঘরের ভেতরে পানি জমে যায়। এতে অনেক সময় কাগজ ও তৈরি পণ্য নষ্ট হয়ে যায়। আবাসিক এলাকায় কেউ সহজে ভাড়া দিতে চায় না বলে তিনি জানান।

‎কল্পনা রানী বলেন, আমরা যে ভাড়া বাড়িতে কাজ করি, সেটা নিচু জায়গায়। বৃষ্টি হলে পানি ঢুকে যায়। এতে মালামাল নষ্ট হয়। যদি একটু ভালো জায়গা পেতাম তাহলে কাজ করতে অনেক সুবিধা হতো।

‎এছাড়া আধুনিক মেশিনের অভাবেও উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না বলে জানান তিনি। ‎তিনি বলেন, আমাদের এখন আধুনিক মেশিন দরকার। একটি আধুনিক মেশিন কিনতে প্রায় সাত থেকে আট লাখ টাকা লাগে। যদি সেই সুযোগ পেতাম, তাহলে উৎপাদন আরও বাড়ানো যেত।

‎কল্পনা রানী জানান, এখন পর্যন্ত সরকারি কোনো সহায়তা তিনি পাননি। ব্যবসার জন্য মূলত বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিয়েই এগিয়ে যেতে হয়েছে।

‎তিনি বলেন, সরকার যদি আমাদের মতো ছোট উদ্যোক্তাদের একটু সহযোগিতা করত, তাহলে আরও বড় কিছু করা সম্ভব হতো। বিশেষ করে শিল্প এলাকায় জায়গা পেলে আমরা স্থায়ীভাবে কারখানা গড়ে তুলতে পারতাম।

‎এই কারণে তিনি শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন বিসিক শিল্প এলাকায় একটি প্লট পাওয়ার আশা প্রকাশ করেন। সেখানে জায়গা পেলে আধুনিকভাবে কারখানা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে তার।

‎কল্পনা রানী বলেন, আমি চাই আমার এই ছোট উদ্যোগটা আরও বড় হোক। আরও বেশি নারী এখানে কাজ করুক এবং নিজেদের আয় দিয়ে পরিবার চালাতে পারুক।

দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন

‎কল্পনা রানীর প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন সিমা দেবনাথ। তিনি বলেন, এখানে কাজ করে আমরা অনেক উপকার পাচ্ছি। প্রতিদিন কাজ করলে প্রায় ৫০০ টাকার মতো আয় হয়। এতে সংসারের খরচ চালাতে সুবিধা হয়।

‎তিনি আরও বলেন, আমাদের মতো অনেক নারীর জন্য এই কাজটা খুব দরকার। ঘরের কাজের পাশাপাশি এখানে কাজ করে আমরা নিজেরাও কিছু আয় করতে পারছি।

কল্পনা রানীর প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন লিপি আক্তার। তিনি বলেন, আমার বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছে। কোনো আয় ছিল না। এখানে কাজ করার সুযোগ পাওয়ার পর থেকে নিজে চলতে পারছি। প্রতিদিন প্রায় ৫০০ টাকার মতো পাই। সবচেয়ে ভালো লাগে যে নিজের পরিশ্রমে কিছু করতে পারছি।

আরেক কর্মী মিতালি রানী বলেন, আমিও বিবাহিত জীবনে এখন নেই, বাবার বাড়িতে থাকি। আমাদের মতো অনেক নারীর জন্য এই কাজটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ঘরের কাজ শেষ করে এখানে এসে প্যাকেট বানাই। এতে নিয়মিত কিছু আয় হয়। কল্পনা আপা আমাদের খুব সহযোগিতা করেন। তার জন্যই আমরা কাজ করে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করছি।

টিআইবি কর্তৃক পরিচালিত সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক)-এর সদস্য কবিতা হালদার বলেন, আমি অনেক দিন ধরেই কল্পনা রানীর এই উদ্যোগের কথা জানি এবং তার কাজ কাছ থেকে দেখেছি। খুব ছোট পরিসর থেকে তিনি প্যাকেজিং তৈরির কাজ শুরু করেছিলেন। ধীরে ধীরে নিজের পরিশ্রম আর চেষ্টা দিয়ে তিনি এই ব্যবসাকে বড় করেছেন। আমরা মাঝেমধ্যে তার কারখানা থেকে বিভিন্ন প্রোগ্রামের জন্য প্যাকেট নেই। তার প্রতিষ্ঠানে কয়েকজন নারীর কর্মসংস্থান হয়েছে, যা সত্যিই প্রশংসনীয়। কল্পনা রানীর মতো নারী উদ্যোক্তারা সমাজের অন্য নারীদেরও স্বাবলম্বী হওয়ার সাহস ও অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছেন।

ঝালকাঠি জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা দিলারা খানম বলেন, নারীরা এখন বিভিন্ন ক্ষেত্রে উদ্যোক্তা হিসেবে এগিয়ে আসছেন। তাদের দক্ষতা বাড়াতে সরকার বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও আর্থিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তিনি বলেন, কল্পনা রানীর মতো উদ্যোক্তারা অন্য নারীদের জন্য অনুপ্রেরণা। তারা প্রমাণ করে দিচ্ছেন, ইচ্ছাশক্তি ও পরিশ্রম থাকলে নারীরাও সফল উদ্যোক্তা হতে পারেন। ভবিষ্যতে তিনি যদি কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ বা সহযোগিতা চান, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।

এ বিষয়ে বিসিক জেলা কার্যালয়ের উপ-ব্যবস্থাপক আল আমিন বলেন, বিসিক শিল্প এলাকায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য প্লট বরাদ্দের সুযোগ রয়েছে। যোগ্য উদ্যোক্তারা নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় আবেদন করলে তা যাচাই-বাছাই করে বরাদ্দ দেওয়া হয়। কল্পনা রানীর মতো উদ্যোক্তারা আবেদন করলে বিসিকের নিয়ম অনুযায়ী বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। পাশাপাশি শিল্প খাতে নারী উদ্যোক্তাদের এগিয়ে নিতে বিসিক বিভিন্ন ধরনের সহায়তা ও পরামর্শ দিয়ে থাকে।

এই বাংলা/এমএস

টপিক 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here