কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি :
কুড়িগ্রামের উলিপুর পৌর শহরে প্রায় ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পানি সরবরাহ প্রকল্প পাঁচ বছর ধরে অচল পড়ে রয়েছে। প্রকল্পের আওতায় শত শত বাড়িতে সংযোগ দেওয়া হলেও আজ পর্যন্ত এক ফোঁটা পানিও পাননি গ্রাহকরা। এতে প্রকল্পের বাস্তবায়ন ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
জানা গেছে, পৌরবাসীর নিরাপদ সুপেয় পানির সংকট নিরসনে বাংলাদেশের ২৩টি পৌরসভার পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি)-এর অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে চারটি গভীর নলকূপ ও পাম্প হাউস এবং প্রায় ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩৩ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়। প্রকল্পের মাধ্যমে ২ হাজার ৬৫০টি পরিবারকে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের পরিকল্পনা ছিল।
২০২২ সালে কুড়িগ্রামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স আদিল এন্টারপ্রাইজ প্রকল্পের কাজ শুরু করে। ২০২৩ সালে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনো প্রকল্পটি চালু হয়নি।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের দাবি, নিম্নমানের কাজ ও বিভিন্ন কারিগরি ত্রুটির কারণে পরীক্ষামূলকভাবে পাম্প চালু করলেই পাইপলাইনের বিভিন্ন স্থানে লিকেজ দেখা দেয়। তাই ত্রুটি সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়নি। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দাবি, অধিকাংশ ত্রুটি ইতোমধ্যে সংশোধন করা হয়েছে।
এদিকে প্রায় ৭০০ গ্রাহকের বাড়িতে সংযোগ দেওয়া হলেও তারা এখনও কোনো পানি পাননি।
সরেজমিনে পাম্প হাউসগুলো ঘুরে দেখা যায়, দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় যন্ত্রপাতিতে মরিচা ধরেছে, কক্ষজুড়ে ধুলাবালি জমেছে এবং প্রকল্প এলাকা আগাছায় ছেয়ে গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিম্নমানের নির্মাণকাজ ও তদারকির অভাবেই কোটি টাকার প্রকল্পটি অকার্যকর হয়ে রয়েছে।
দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন
নারিকেলবাড়ী খামার এলাকার বাসিন্দা মো. কামরুজ্জামান বলেন, “কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেও মানুষ এক ফোঁটা পানিও পেল না। বিষয়টি তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত।”
জোদ্দারপাড়া এলাকার বাসিন্দা তপন কুমার রায় বলেন, “সংযোগ পাওয়ার আশায় আবেদন করে চার বছর আগে বাড়িতে পাইপলাইন বসানো হয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত এক ফোঁটা পানিও পাইনি।” একই ধরনের অভিযোগ করেছেন তন্ময় সরকার, আশরাফুল আলম, বিপ্লব সরকার, শফিকুল ইসলাম ও আবুল কালাম মণ্ডল।
উলিপুর পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহবুবুল আলম বলেন, ব্যবহৃত পাইপের মান ভালো না হওয়ায় পানির চাপ সহ্য করতে না পেরে বিভিন্ন স্থানে পাইপ ফেটে যাচ্ছে। এছাড়া প্রকল্পে ওভারহেড পানির ট্যাংক না থাকায় এবং অধিকাংশ বাড়িতে আন্ডারগ্রাউন্ড রিজার্ভ ট্যাংক না থাকায় সরাসরি পানি সরবরাহেও জটিলতা তৈরি হচ্ছে। তিনি জানান, ওভারহেড ট্যাংক নির্মাণের জন্য জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে আবেদন করা হবে।
উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আশরাফুল আলম বলেন, পাইপলাইনের ত্রুটি দূর না হওয়ায় প্রকল্পটি এখনো গ্রহণ করা হয়নি। তবে মূল নকশায় ওভারহেড ট্যাংক ছিল না। সেটি যুক্ত করা হলে প্রকল্পটি কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সহজ হবে।
মেসার্স আদিল এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. আমিনুর রহমান বলেন, অধিকাংশ ত্রুটি ইতোমধ্যে সংশোধন করা হয়েছে এবং দ্রুত বাকি কাজ শেষ করে প্রকল্পটি হস্তান্তর করা হবে। নিম্নমানের কাজের অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন। তার দাবি, অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয়রা বাড়িঘর নির্মাণের সময় পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত করায় নতুন করে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে।
উলিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও পৌর প্রশাসক এ টি এম আরিফ বলেন, বিষয়টি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হারুনুর রশিদ প্রথমে পরে কথা বলবেন বলে জানান। তবে পরবর্তীতে তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

