সিডরের ১৭ বছর পরও উপকূলবাসীর মনে ভয়াল স্মৃতি

0
162
২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বরের প্রলয় আজও দগদগে ক্ষত উপকূলে / ছবি - সংগৃহীত

বরিশাল প্রতিনিধি :

১৫ নভেম্বর— দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের কাছে আজও এক দুঃসহ স্মৃতির দিন। ২০০৭ সালের এই তারিখে উপকূলে আঘাত হেনেছিল ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড় সিডর, যার আঘাতে মুহূর্তেই লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় পটুয়াখালী, বরগুনা, বাগেরহাটসহ বিস্তীর্ণ জনপদ। ঘণ্টায় প্রায় ২৪০ কিলোমিটার বেগের ঝড় ও তীব্র জলোচ্ছ্বাসে নিশ্চিহ্ন হয় অসংখ্য ঘরবাড়ি, ফসল, গবাদিপশু ও জনজীবন।

দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন

দুর্যোগের আগের দিনও যে গ্রামগুলো ছিল মানুষের হাঁসিখুশি জীবনে মুখর, পরদিন সেগুলো পরিণত হয় নিস্তব্ধ মৃত্যুপুরীতে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২২টি জেলায় এই ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় ১৫ হাজার মানুষ প্রাণ হারান, নিখোঁজ হন আরও বহু মানুষ। ক্ষতির পরিমাণ ছাড়িয়ে যায় কয়েক হাজার কোটি টাকা।

গলাচিপা ও আশপাশের সাত ইউনিয়ন— চরকাজল, চরবিশ্বাস, চরমোন্তাজ, রাঙ্গাবালী, ছোটবাইশদিয়া, বড়বাইশদিয়া ও চালিতাবুনিয়া— ছিল সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলোর একটি। এখানে ফসলি জমির প্রায় ৭০ শতাংশ নষ্ট হয়; বাড়িঘরের ৯৯ শতাংশ ধ্বংস হয়ে যায়। শতাধিক চরের মানুষের বসতি ভেঙে পড়ে মুহূর্তেই।

চরআন্ডা গ্রামের ধলন মৃধার কান্নায় আজও ভেসে ওঠে সেই রাতের স্মৃতি।
তিনি বলেন, “ঘুম ভাঙতেই সাগরের গর্জন। মুহূর্তে সব ভেসে গেল— মা, স্ত্রী, দুই ছেলে আর শ্যালক। এখনো বাবাকে আর তিন মাসের মেয়ে ময়নাকে খুঁজে পাইনি।”

মির্জাগঞ্জ উপজেলায় মারা যান ১১৫ জন। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১০ হাজার ঘর, আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয় আরও ১৪ হাজার। মারা যায় ২ হাজার ৫০০ গবাদিপশু ও ১ লাখ ৩০ হাজার হাঁস-মুরগি। ধ্বংস হয় প্রায় ১২ হাজার একর জমির ফসল। সবশেষে নষ্ট হয় ৮০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ২৪০টি মসজিদ।

দেউলী সুবিদখালী ইউনিয়নে নিহতের সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ— ৮৫ জন। চরখালী গ্রামের ২৪টি কবরস্থানে একসঙ্গে সমাহিত ৩৩টি লাশ এখনও পড়ে আছে অযত্নে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসেন জানান, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য ঘর নির্মাণ প্রকল্প চলছে। প্রথম ধাপে ২৮২টি পরিবার নতুন ঘর পাচ্ছে।

বরগুনার আমতলী উপজেলাতেও সিডরের আঘাতে মারা যায় ৩৮৬ জন। ভেঙে পড়ে হাজারো বাড়িঘর, নষ্ট হয় কৃষিজমি ও অবকাঠামো। জলোচ্ছ্বাসে ৭০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ পুরোপুরি ধ্বংস হয় এবং আরও ১৫৫ কিলোমিটার ওয়াপদা বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এখনো এই দিনে আমতলীর স্বজনহারারা মিলাদ, দোয়া ও কোরআনখানির আয়োজন করে হারানো প্রিয়জনদের স্মরণ করে থাকেন।

বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ৩০০ কোটি টাকার সিইআইপি প্রকল্প ২০১৬ সালে শুরু হলেও শরণখোলা–মোরেলগঞ্জ অঞ্চলের বেড়িবাঁধের অর্ধেক কাজও এখনো শেষ হয়নি। মোট ৬৩.২ কিলোমিটার বাঁধ তিন বছরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ধীরগতির কারণে তা হয়নি।

পাউবোর প্রকৌশলী শ্যামল কুমার দত্ত জানান, পর্যাপ্ত নদীশাসনের ব্যবস্থা না থাকায় বারবার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রকল্পে ১৫টি ড্রেনেজ স্লুইসগেট, ১৭টি ফ্লাশিং স্লুইসগেট ও আরও ৫টি স্লুইসগেট নির্মাণের কথা থাকলেও কাজ এগোচ্ছে ধীরগতিতে।

সিডরের ১৭ বছর পেরিয়ে গেলেও উপকূলীয় মানুষের নিরাপত্তা এখনও নিশ্চিত নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বেড়েছে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি। কিন্তু টেকসই বেড়িবাঁধ, আশ্রয়কেন্দ্র ও পুনর্বাসন–ব্যবস্থা অনেক জায়গায় এখনো অপর্যাপ্ত।

আকাশে কালো মেঘ দেখলেই তাই উপকূলের মানুষের হৃদয়ে ফিরে আসে সেই ভয়াল রাত— যে রাতে প্রকৃতি দক্ষিণাঞ্চলকে ডুবিয়ে দিয়েছিল অবর্ণনীয় দুঃখ–বেদনার সাগরে।

এই বাংলা/এমএস
টপিক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here