বরিশাল অঞ্চলে আমন ধানের উৎপাদন রেকর্ড, বাজারে ধস: ন্যায্যমূল্য না পেয়ে হতাশ কৃষক

0
90
বরিশালের কৃষি অঞ্চলে চলতি মৌসুমে আমন ধানের উৎপাদন প্রায় ২৩.৬৫ লাখ টন / ছবি - এই বাংলা

বরিশাল ব্যুরো :

 

বরিশাল কৃষি অঞ্চলে চলতি মৌসুমে আমন ধানের উৎপাদন রেকর্ড ছুঁয়েছে। প্রায় ২৩.৬৫ লাখ টন আমন চাল কৃষকের ঘরে উঠলেও বাজারে ধানের দরপতনে কৃষকদের মুখে হাসি নেই। উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় বাজারদর কম থাকায় চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন এ অঞ্চলের কৃষকেরা।

সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে এবারই প্রথম রোপণের পর বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছাড়াই বরিশাল অঞ্চলে নির্বিঘ্নে আমন ধান ঘরে তোলা সম্ভব হয়েছে। যদিও বীজতলা তৈরির সময় ও রোপণ শুরুর প্রাক্কালে কয়েক দফা অতিবর্ষণ ও বর্ষণজনিত প্লাবনে কিছু বীজতলা ও জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে অতিরিক্ত বীজতলা প্রস্তুত এবং দুর্যোগ-পরবর্তী দ্রুত পুনঃচাষের ফলে আবাদ কার্যক্রমে বড় ধরনের প্রভাব পড়েনি।

চলতি মৌসুমে বরিশাল কৃষি অঞ্চলে মোট ৮ লাখ ৮৫ হাজার ৩৪ হেক্টর জমিতে আমনের আবাদ হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করেছে। এতে গত বছরের ২৩ লাখ ২২ হাজার ৯৫৮ টনের তুলনায় এবছর উৎপাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৩.৬৫ লাখ টনে। এছাড়া প্রায় সাড়ে ৩ হাজার টন বোনা আমনও ইতোমধ্যে কৃষকের ঘরে উঠেছে।

তবে উৎপাদন বৃদ্ধি কৃষকদের কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি দিতে পারেনি। বর্তমানে বাজারে প্রতি মণ আমন ধান বিক্রি হচ্ছে ৯০০ থেকে ১ হাজার ৫০ টাকার মধ্যে। অথচ সদ্য সমাপ্ত মৌসুমে প্রতি মণ আমন ধানের উৎপাদন ব্যয় ছিল ১ হাজার টাকারও বেশি। ফলে ধান বিক্রি করে অনেক কৃষকই পুঁজি ফেরত পাচ্ছেন না।

কৃষিবিদদের মতে, বরিশাল অঞ্চলে এখনো প্রায় ৩৫ শতাংশ জমিতে সনাতন ও স্থানীয় জাতের আমনের আবাদ হওয়ায় গড় ফলন তুলনামূলকভাবে কম। বর্তমানে এ অঞ্চলে আমনের গড় ফলন হেক্টরপ্রতি প্রায় ২.৯২ টন, যা দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় কম।

দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) জানিয়েছে, উচ্চ ফলনশীল জাতের বীজ ও আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তি মাঠ পর্যায়ে সরবরাহের মাধ্যমে গত দুই দশকে এ অঞ্চলে আমনের উৎপাদন বেড়েছে। ডিএই’র বরিশাল অঞ্চলের প্রধান নির্বাহী ও অতিরিক্ত পরিচালক ড. মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম সিকদার বলেন, উফশী ও হাইব্রিড জাতের আবাদ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে মাঠ পর্যায়ে বীজ ও প্রযুক্তি সরবরাহ কার্যক্রম আরও জোরদার করা হচ্ছে।
তবে কৃষকদের দাবি, কেবল বীজ নয়—উৎপাদন প্রযুক্তি বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও মাঠ পর্যায়ে সহায়তা না থাকায় কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া যাচ্ছে না। মাঠ পর্যায়ের কৃষিবিদদের মতে, বরিশাল অঞ্চলে আবাদকৃত আমনের অন্তত ৮০ শতাংশ জমিতে উফশী এবং ২০ শতাংশ জমিতে হাইব্রিড জাতের আবাদ নিশ্চিত করা গেলে মোট উৎপাদন ৩০ লাখ টনে উন্নীত করা সম্ভব। এতে এ অঞ্চলের উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্যের পরিমাণ বর্তমান ১৪ লাখ টন থেকে বেড়ে ২০ লাখ টনে পৌঁছাতে পারে।

বর্তমানে বরিশাল অঞ্চলে হাইব্রিড জাতের আবাদ এখনো সীমিত। সদ্য সমাপ্ত মৌসুমে ৮ লাখ ৮৫ হাজার হেক্টর আমন জমির মধ্যে মাত্র ২২ হাজার ৫০০ হেক্টরে হাইব্রিড জাতের ধান আবাদ হয়েছে। এসব জমিতে গড় উৎপাদন হেক্টরপ্রতি ৩.৯৭ টন হলেও তিন লক্ষাধিক হেক্টর জমিতে চাষ হওয়া স্থানীয় জাতের আমনের গড় উৎপাদন মাত্র ১.৭৩ টন।

কৃষিবিদরা মনে করছেন, উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে কৃষকের আগ্রহ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। তারা দ্রুত সরকারি ক্রয় কার্যক্রম জোরদার ও বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। তবে এ বিষয়ে এখনো পর্যন্ত বরিশাল অঞ্চলে প্রশাসনিক পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।

মাঠ পর্যায়ের কৃষিবিদদের ভাষ্য, উৎপাদিত ধান বিক্রি করে যদি কৃষকের মূলধনই ফিরে না আসে, তবে ভবিষ্যতে এই প্রধান দানাদার খাদ্যশস্য আবাদে কৃষকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে।

এই বাংলা/এমএস

টপিক 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here