তিস্তার ভাঙনরোধে অসমাপ্ত কাজ, আতঙ্কে কুড়িগ্রামের চার গ্রামের মানুষ

কুড়িগ্রামের পশ্চিম বজরা এলাকায় তিস্তার বামতীর ভাঙনরোধে প্রকল্পের কাজ শুরু না হওয়ায় ভাঙন আতঙ্কে তিস্তাপারের মানুষ

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি :

‘গেলবার নদী ভাঙনে বাড়িটা ভাসি নিয়া গেল। সেই শোকে মোর স্বামীর ব্রেন স্টক (স্ট্রোক) করিল। সেই থাকি বিছানায় পড়ি আছে। মানষের জাগাত (জায়গা) ঘর তুলি আছি। নদী বাঁধবো (পার বাঁধাই) বলে মাপজোক করি নিয়া গেল। নদী বাঁধলে ওই ২ শতক জাগাত ঘরটা তুলি থাকমো। এ্যালা শুনি কাজ হবার নয়। ঘর তুলাও বুঝি আর হবার নয়। আল্লাহ কি হামারগুলার প্রতি দয়া করবার নয়!’ এভাবে বিলাপ করতে করতে কথাগুলো বলছিলেন উলিপুরের পশ্চিম বজরা মসজিদের ইমাম আব্দুল খালেকের স্ত্রী জরিনা বেগম।

শুধু জরিনা বেগম নয়, গ্রামটির বাসিন্দা মোঃ ফরিদুল ইসলাম, মোঃ রহিজল হক, মোঃ নুর আলম, মোছাঃ আম্বিয়া বেওয়াসহ সবার একই কথা ‘নদী বাঁধার’ কাজ দেখে সবাই আশায় বুক বেঁধেছিলেন। সে আশা পূরণ না হওয়ার আশঙ্কায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন পূর্ব বজরা, পশ্চিম বজরা, ধামইরহাট ও থেতরাই হোকডাঙ্গার বাসিন্দারা। ভাঙন আতঙ্কে থাকা মানুষজন বলছেন, সরকার নদীর পার বাঁধাইর টাকা দিয়েছে, উজানে ও ভাটিতে কাজও হলো কিন্তু অজানা কারণে মধ্যখানের এই চার গ্রামের নদীপারে কোনো কাজ হচ্ছে না।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, কুড়িগ্রাম বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নিষ্কাশন প্রকল্পের (দক্ষিণ ইউনিট) আওতায় থেতরাই ও বজরা ইউনিয়নের তিস্তা নদীর বামতীর ভাঙনরোধে পূর্ব সতর্কতামূলক প্রকল্পের আওতায় নদীপারের উপরের অংশে সিমেন্ট-বালুর মিশ্রণে জিও ব্যাগের স্লোপ কাটিং এবং নিচে অংশে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ডাম্পিং করার কথা। প্রকল্পের প্রথম ফেজে তিন কিলোমিটারের ১৩টি প্যাকেজে বরাদ্দ ২০ কোটি টাকা এবং দ্বিতীয় ফেজে ২ দশমিক ৫ কিলোমিটারের জন্য ছয়টি প্যাকেজে বরাদ্দ ছিল ১৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে কাজ শুরু হয়। মেয়াদ ছিল ওই বছরের ১৮ জুন পর্যন্ত।

ওই সময় নদীর পানি বাড়ায় কাজ শেষ করা যায়নি। পরে ঠিকাদাররা আবেদন করলে চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়। এ হিসেবে হাতে আছে মাত্র ১১ দিন। নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে প্রকল্পের অন্যান্য প্যাকেজের সব কাজ প্রায় শেষ হলেও ৩টি প্যাকেজের কাজ শুরুই হয়নি। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হলে বরাদ্দকৃত সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা ফেরত যাবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ।

দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন

গত ১৪ এপ্রিল পশ্চিম বজরা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, পাকা রাস্তার মাথায় তিস্তার বামতীর ভাঙনরোধে পূর্ব সতর্কতামূলক কাজের (৩০০ মিটার) নদীর পারে শুধু স্লোপ কাটিং করে ঠিকাদার চলে গেছেন। নদীর পানি বাড়ায় নিচের অংশে জিও ব্যাগ ১৮ ফুট ডাম্পিং করা হয়নি বলে জানান স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ, নদীর এই এলাকাটি অনেক গভীর ও ভাঙনপ্রবণ। গতবার এই স্থানে ভাঙনে দুটি গ্রামের ৫০টি পরিবারের বাড়িঘর ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নদীতে বিলীন হয়। একটি নৌকা ডুবে একই পরিবারের সাতজনের মৃত্যু হয়।

জানা গেছে, পশ্চিম বজরা এলাকার ৩০০ মিটার করে দুটি প্যাকেজ এবং থেতরাই হোকডাঙ্গা এলাকায় ২০০ মিটারের একটি, মোট তিনটি প্যাকেজের কাজ শুরু হয়নি। নদীতে পানি যেভাবে বাড়ছে তাতে শেষ মুহূর্তে এসব প্যাকেজের কাজ করার নামে নয়ছয় করে চলে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধি মোঃ এনামুল হক।

পশ্চিম বজরা গ্রামের পাকা রাস্তার মাথায় ৩০০ মিটারের একটি প্যাকেজের মূল ঠিকাদার মোঃ হাসিবুল হাসান হলেও হাতবদল হয়ে কাজের দায়িত্ব পেয়েছেন মোঃ রজব আলী নামের কুড়িগ্রাম জেলা যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক। তিনি বলেন, আমি অসুস্থ ছিলাম, তাই কাজ করতে পারিনি। দু-চার দিনের মধ্যে কাজ শুরু করব। এ ব্যাপারে জানতে মূল ঠিকাদার মোঃ হাসিবুল হাসানের মোবাইল ফোনে কল দিলেও তিনি ধরেননি।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী মোঃ আব্দুল কাদের কাজগুলো হাতবদল হওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, কাজগুলো শুরু ও শেষ করার জন্য জোর চেষ্টা ও চাপ দেওয়া হচ্ছে। হঠাৎ পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় কিছুটা অসুবিধা হয়েছে।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ রাকিবুল হাসান বলেন, ওই তিনটি কাজের জিও বালুর বস্তা ডাম্পিং করা হয়েছে। বাকি কাজও দ্রুত শেষ করা হবে। রাজনৈতিক চাপে কাজগুলো কুড়িগ্রাম জেলা যুবদল নেতাকে দেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, নির্ধারিত সময়ে কাজ না হলে টাকা ফেরত যাবে।

এই বাংলা/এমএস

টপিক 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here