টানা বৃষ্টিতে কুড়িগ্রামের বোরো চাষে শঙ্কা, মাঠে ডুবে অর্ধেক ধান

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি :

 

কৃষকের মুখে এখন হাসি থাকার কথা। ব্যস্ত সময় পার করার কথা ধান কাটা, মাড়াই ও শুকাতে। কিন্তু উত্তরের জেলা কুড়িগ্রামের কৃষকদের মুখের হাসি কেড়ে নিয়েছে বৃষ্টি। চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে শুরু হয়েছিল বৃষ্টি। টানা ছয় দিন পর সেই বৃষ্টি থেমে দুদিন পরে আবার শুরু হয়েছে। তাতেই মহাক্ষতি কৃষকের। নিচু জমির ধান নষ্ট হয়েছে জমিতেই। খড় গেছে পচে।

এদিকে, আবহাওয়া অধিদপ্তর আগামী ৭২ ঘণ্টার পূর্বাভাস দিয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে, কুড়িগ্রামে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। এমন পূর্বাভাসে কৃষকরা পড়েছেন আরও দুশ্চিন্তায়। কারণ মাঠে এখনো রয়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ ধান।

কুড়িগ্রাম জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, চলতি বোরো মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ১৭ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। প্রায় অর্ধেক পরিমাণ জমির ধান কাটা হলেও এখনো ৫০ ভাগ জমিতে পাকা ধান রয়ে গেছে। ভারী বৃষ্টিপাতে এসব জমির ধানের শীষ পর্যন্ত পানি জমে গেছে। বৃষ্টিপাতের কারণে খড় পচে যাওয়ারও আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

অধিদপ্তর জানায়, গত তিন দিনে কুড়িগ্রাম জেলায় ধান কাটার হার ভালো ছিল। কিন্তু জমিতে থাকা বেশিরভাগ ধান কাটার উপযুক্ত হলেও বৃষ্টিপাতের কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যের সঙ্গে কিছুটা মিল পাওয়া গেল কুড়িগ্রাম জেলার সদর উপজেলার আরডিআরিএস বাজারের কৃষক মোঃ মামুনুর রশিদ কাজলের কথার সঙ্গে। তিনি এবার তিন একর জমিতে বোরো ধান আবাদ করেছেন। তবে তার এখনো দেড় একর জমির ধান কাটা হয়নি। তিনি হতাশ হয়ে জানান, এবার মনে হয় এই দেড় একর জমির ধান পাচ্ছি না। কারণ ধান পানির নিচে।

তিনি বলেন, ‘যে ধান কেটেছি রোদের অভাবে সেটাও ভালোমতো শুকাতে পারছি না। আবহাওয়া ড্যাম থাকলে ধান থেকে গাছ বের হয়। ফলন ভালো পাওয়া যায় না।’

কথা হয় একই এলাকার কৃষক মোঃ জমির উদ্দিনের সঙ্গে। তার ভাষ্যমতে, দুই দিন তিনি ভালোই ধান কেটেছেন। তার জমিতে এখনো অর্ধেক ধান রয়েছে। তিনি বলেন, ‘এই বৃষ্টির জন্য কেমন করি আর ধান কাটি। যে ধান কাটছি তাও তো ভালোমত শুকাইতে পারছি না।’

দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন

ছাতা মাথায় নিজের খেত দেখতে এসেছেন কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার বাসিন্দা মোঃ ছবুর মিয়া। তিনি আরেক হতাশার কথা জানান। তার মতে আম- ছালা সবই গেল। ধানের সঙ্গে নষ্ট হয়ে গেল তার খড়ও। তারও এখন বাকি কাটা অর্ধেক ধান। তিনি হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘এই ধানের যে কী হবে আল্লাহ জানে! দামও পাই না, খাবারও পাই না।’

এই প্রতিবেদক জেলার অন্তত ২০ জন কৃষকের সঙ্গে কথা বলেন। তাদের প্রত্যেকর ভাষ্য প্রায় একই রকম। কুড়িগ্রাম জেলার সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের কৃষক মোঃ ময়নাল হোসেনের কিছু ধান খেত প্রায় পানির নিচে। গতকাল তিনি জমিতে নেমে দেখেছেন ইতোমধ্যে ধানের পচন ধরেছে। তিনি বলেন, ‘এক নৌকা ধান কাটি আনছি চর থাকি। আল্লাহ জানে বাকি গুলার কপালোত যে কী আছে? ধান আর পোয়াল (খড়) নিয়া বিপদে আছি। যেগুলা ধান কাটছি তার পোয়ালও শুকিবার পারছি না। এলাও জমিত পাকা ধান পড়ি আছে। এমন করি ঝড়ি হইলে কাটমো কেমন করি!’

সড়কের পাশে ধান শুকাতে ব্যস্ত মোছাঃ মরিয়ম খাতুন। তারও দুঃচিন্তার অন্যতম কারণ বৃষ্টি। তিনি বলেন, ‘দেওয়ার (আকাশ) কোনো ঠিক আছে, কহন যে নামে কে জানে। আইজ তিন দিন ধরি ধান শুকাই। এই বৃষ্টি আসে এই যায়। দুনিয়ার জ্বালা।’

সার্বিক বিষয়ে কথা হয় কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোঃ আব্দুল্লাহ আল মামুনের সঙ্গে। তিনি জানান, ‘ভারী বৃষ্টিতে ধানের জমিতে পানি জমে গেছে। গত তিন দিন ধরে অনেক ধান কাটা হলেও এখনো প্রায় অর্ধেক জমির ধান কাটা বাকি আছে।’

তিনি বলেন, ‘প্রায় সব জমির ধান পেকে গেছে। পানি নেমে গেলে সেসব কাটা যাবে। বৃষ্টি থেমে গেলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরুপণ করা যাবে। কিছু ক্ষয়ক্ষতি হয়ত হবে। আমরা প্রতিনিয়ত মাঠ পরিদর্শন করছি, অনেক কৃষকের অর্ধ শুকনো খড় আবার ভিজে গেছে। খড় পচে গেলে গবাদিপশুর খাদ্যের সংকট হতে পারে।’

কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার কৃষি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র সরকার জানান, ‘এই অঞ্চলে গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত ছিল গত বুধবার ১৮৪ মিলিমিটার। আর রোববার বৃষ্টিপাত ছিল ১১৫ মিলিমিটার। আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে এই অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে।’

এই বাংলা/এমএস

টপিক 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here