কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি :
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অনিয়মিত বৃষ্টি, অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতির মুখে পড়ছেন কুড়িগ্রামের কৃষকরা। তবে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তারা এখন জলবায়ু অভিযোজন প্রযুক্তি ব্যবহার করে বারোমাসি তরমুজ চাষে সফলতা পাচ্ছেন। এতে উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি কৃষকদের আয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সরেজমিনে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের ঝাড়খোলা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, কৃষক জামান মিয়া ২৫ শতক জমিতে পলিটানেল পদ্ধতিতে সাড়ে তিন শতাধিক বারোমাসি তরমুজের চারা রোপণ করেছেন। জমির চারপাশে নাইলনের জালের বেড়া, পলিথিনের সুড়ঙ্গাকৃতির পলিটানেল, বাঁশ ও জিআই তারের মাচা এবং ফেরোমন ফাঁদ, হলুদ ফাঁদ ও বিষটোপ ব্যবহার করছেন তিনি। এ প্রযুক্তি অতিবৃষ্টি, অতিরিক্ত তাপ, শীত, পোকামাকড় ও পাখির আক্রমণ থেকে গাছ ও ফলকে সুরক্ষা দিচ্ছে।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা জানান, পলিটানেল প্রযুক্তি ছত্রাকজনিত রোগের প্রকোপ কমায়, মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখে এবং সেচের পানির অপচয় কমায়। ফলে কম খরচে উন্নতমানের ফলন পাওয়া সম্ভব হচ্ছে।
এদিকে, কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার কাঁঠালবাড়ি ইউনিয়নের খালিশা কালোয়া গ্রামের কৃষক মো. জিয়াউর রহমান ১৫ শতক জমিতে ৩০০টির বেশি বারোমাসি তরমুজ চাষ করেছেন। ছোট আকারের, ডিম্বাকার ও কালো খোসার এসব তরমুজের ভেতর টকটকে লাল। অমৌসুমে উৎপাদিত হওয়ায় বাজারে ভালো দাম মিলছে, যা কৃষকদের আরও উৎসাহিত করছে।
কৃষি বিভাগ জানায়, বর্তমানে হাইব্রিড, চায়না, থাইল্যান্ড, সুইট বেবি ও সুইট কর্নসহ বিভিন্ন জাতের বারোমাসি তরমুজের বীজ দেশে পাওয়া যাচ্ছে। মার্চের মাঝামাঝি থেকে জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত চারা রোপণের উপযুক্ত সময়। প্রতি বিঘা জমিতে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০টি চারা রোপণ করা যায়।
বারোমাসি তরমুজ চাষে প্রতি বিঘা জমিতে ২০০ কেজি জৈব সার বা ভার্মি কম্পোস্ট, ৪০ কেজি ইউরিয়া, ৪০ কেজি টিএসপি, ৪০ কেজি এমওপি, ২০ কেজি জিপসাম, ১ কেজি জিংক সালফেট এবং দেড় কেজি বোরণ সার ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে কৃষি বিভাগ।
দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন
কৃষক গোলজার বলেন, “মে মাসের শুরুতে তরমুজের চারা লাগিয়েছি। বাঁশের মাচা, সার ও শ্রমিকসহ প্রায় ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রথম দফায় ৭০টি তরমুজ বিক্রি করেছি। সামনে আরও দুই দফা ফলন পাওয়া যাবে। একই জমিতে বছরে তিনবার তরমুজ ও একবার সবজি চাষ করা সম্ভব হওয়ায় ভালো লাভ হচ্ছে।”
কৃষক জামান মিয়া বলেন, “অনিয়মিত বৃষ্টি ও অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে আগের মতো চাষাবাদ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই প্রথমবারের মতো পলিটানেল প্রযুক্তি ব্যবহার করছি। এতে ফসল সুরক্ষিত থাকছে এবং ফলনও ভালো হচ্ছে।”
কৃষাণী মোছাঃ জেসমিন আরা ও মোছাঃ খাদিজা বলেন, “বারোমাসি তরমুজ চাষের মাধ্যমে বছরে তিন থেকে চারবার ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে। এতে পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে অতিরিক্ত উৎপাদন বাজারে বিক্রি করে বাড়তি আয় করা যাচ্ছে।”
আরডিআরএস বাংলাদেশের রংপুর বিভাগীয় ব্যবস্থাপক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “আরডিআরএস ও পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)-এর সহায়তায় জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। কৃষকদের সারা বছর উৎপাদনে রাখতে এ কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করা হবে।”
কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. মেহেদী হাসান জানান, জেলার সদর, রাজারহাট, ভূরুঙ্গামারী ও উলিপুর উপজেলায় বর্তমানে প্রায় ৩৫ একর জমিতে বারোমাসি তরমুজ চাষ হচ্ছে। লাভজনক হওয়ায় কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে এবং কৃষি বিভাগ নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।
এই বাংলা/এমএস
টপিক

