কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি :
কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলায় ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙন রোধে জরুরি মেরামতকাজে জিও ব্যাগে নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে প্রায় এক-চতুর্থাংশ কম বালু ভরার অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের দাবি, প্রায় এক কোটি আট লাখ টাকার প্রকল্পটি দায়সারাভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ফলে মাত্র তিন সপ্তাহের ব্যবধানে ব্রহ্মপুত্র নদের ডানতীর রক্ষা বাঁধের একই স্থানে আবারও ভয়াবহ ধস দেখা দিয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, চিলমারী উপজেলার রাণীগঞ্জ ইউনিয়নের কাঁচকোল সড়কটারী এলাকায় প্রায় ৩০ মিটার ব্লক ধসে রাস্তার একটি অংশ নদীতে বিলীন হয়েছে। এছাড়া প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকাজুড়ে অন্তত সাতটি স্থানে ধস ও ফাটল সৃষ্টি হয়েছে, যা পুরো এলাকাকে নতুন করে ভাঙনের ঝুঁকিতে ফেলেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জিও ব্যাগে নির্ধারিত ২৫০ কেজি বালুর পরিবর্তে অনেক ব্যাগে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কম বালু ভরা হয়েছে। পাশাপাশি নিম্নমানের জিও ব্যাগ ব্যবহার এবং প্যাকিংয়েও অনিয়ম করা হয়েছে। ফলে নদীর তীব্র স্রোতে এসব ব্যাগ কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারছে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ব্রহ্মপুত্র নদের ডানতীর রক্ষা প্রকল্পের প্রথম ধাপের কাজ শুরু হয় ২০০৭ সালে এবং শেষ হয় ২০০৯ সালে। দ্বিতীয় ধাপ ২০১২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত এবং তৃতীয় ধাপ ২০১৯ সালে শুরু হয়ে সংশোধিত মেয়াদ অনুযায়ী ২০২৩ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল। তৃতীয় ধাপের প্রকল্প ব্যয় ৩০২ কোটি ৬০ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪৪৮ কোটি ৩১ লাখ টাকা করা হয়। চিলমারী অংশের কাজ যৌথভাবে বাস্তবায়ন করছে অরিয়েন্ট ট্রেডিং অ্যান্ড বিল্ডার্স লিমিটেড এবং বি জে জিও-টেক্সটাইল লিমিটেড।
স্থানীয়রা জানান, তিন সপ্তাহ আগে কাঁচকোল সড়কটারী এলাকায় তিনটি স্থানে ভাঙন দেখা দিলে দুই দফায় ১৮ হাজার জিও ব্যাগ ডাম্পিংয়ের জন্য প্রায় ৮১ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। পরে আরও ছয় হাজার জিও ব্যাগ বরাদ্দ হওয়ায় মোট বরাদ্দ দাঁড়ায় ২৪ হাজার জিও ব্যাগ, যার ব্যয় প্রায় এক কোটি আট লাখ টাকা।
গত সোমবার রাতে একই এলাকায় প্রায় ৩০ মিটার তীররক্ষা বাঁধ ধসে পড়লে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে এলাকাবাসীকে ঘটনাস্থলে আসার আহ্বান জানানো হয়। পরে সহস্রাধিক মানুষ রাতভর জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করেন।
দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন
কাঁচকোল সড়কটারী গ্রামের বাসিন্দা ফেলানী বেওয়া (৯০) বলেন, “যখন ব্লক ভাঙে, তখন আত্মা ছাইড়া যায়। শুধু আল্লাহ আল্লাহ করি।”
একই এলাকার ফরজ উদ্দিন (ডেস্কা) ব্যাপারী বলেন, “প্রতি বছর জরুরি মেরামত করে লাভ হবে না। স্থায়ীভাবে ব্লক ডাম্পিং এবং নদীর মাঝের ডুবোচর ড্রেজিং করতে হবে।”
স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম, আবুল হোসেন, নূরজাহান বেগম, মিজানুর রহমান, ফুল বাবু, মতিয়ার রহমান, খতিব উদ্দিন ও মঞ্জু মিয়াসহ অনেকেই অভিযোগ করেন, ডানতীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের পর কয়েক বছর স্বস্তিতে থাকলেও এখন প্রতি বর্ষায় নতুন করে ভাঙনের আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে। তারা জিও ব্যাগে নির্ধারিত পরিমাণ বালু ভরা হয়েছে কি না এবং কাজের মান যথাযথ ছিল কি না, তা স্বাধীনভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিবুল হাসান বলেন, “ওই এলাকায় নতুন করে ছয় হাজার জিও ব্যাগ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। চলতি মাসে মোট ২৪ হাজার জিও ব্যাগ ডাম্পিংয়ের কাজ চলছে। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি ব্যাগে ২৫০ কেজির বেশি বালু থাকার কথা। অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি আবারও যাচাই করা হবে।”
তবে চিলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, “জিও ব্যাগের প্যাকিং পরীক্ষা করার সময় আমাদের কোনো প্রতিনিধিকে ডাকা হয়নি। বিষয়টি আমি খতিয়ে দেখছি।”
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে কুড়িগ্রাম-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. মোস্তাফিজুর রহমানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
এই বাংলা/এমএস
টপিক

