গ্রাম থেকেই অপকর্মের হাতেখড়ি সোহেলের,বাবা নিজেই চান ছেলের বিচার

নাটোর প্রতিনিধি :

 

 

রাজধানীতে আলোচিত রামিসা ধর্ষণ ও হত্যার প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানার কঠোর শাস্তির দাবিতে সোচ্চার সারা দেশ। সাধারণ এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া সোহেল কী করে এমন ভয়াবহ নৃশংস ঘটনায় জড়িত হলেন, তা নিয়ে চলছে নানা আলোচনা।

সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখা গেছে, ছোট ছোট অপরাধ ধীরে ধীরে নৃশংস চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে সোহেলকে। কয়েক বছর ধরে জন্মভূমির সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। যোগাযোগ নেই জন্মদাতা মা-বাবারও সঙ্গেও।

গ্রামের জীবনের পাট চুকিয়ে দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকায় আসা সোহেলের ভয়ংকর অপরাধের তথ্য জানার পর স্তম্ভিত নিজ এলাকার মানুষ। মা-বাবাসহ স্বজনরাও চাইছেন নৃশংস ঘটনার কঠোর বিচার। সবাই বলছেন, শিশু রামিসা ধর্ষণ-হত্যার ঘটনায় তারা লজ্জিত।

সোহেলের নিজ গ্রাম নাটোরের সিংড়া উপজেলার মহেশচন্দ্রপুর দক্ষিণপাড়া।

গ্রামের বাসিন্দাদের বেশির ভাগই কৃষিজীবী। এখন ভীষণ ব্যস্ত তারা। উঠানে উঠানে বোরো ধান মাড়াই চলছে। মিষ্টি গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। সাধারণ এই গ্রামটি হঠাৎ করে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

এলাকার একজন মানুষের এমন ভয়ংকর অপরাধে জড়িত হওয়ার লজ্জা, অন্যদিকে একটি নিষ্পাপ শিশুর ওপর পাশবিক নির্যাতন ও হত্যার জন্য গভীর শোক। গ্রামের এক তরুণ বললেন, ‘আমরা চাই, রামিসার পরিবার ন্যায়বিচার পাক। যেন আর কোনো শিশু এমন পরিণতির শিকার না হয়। আর যারা অপরাধ করে, তারা যেন জানে শেষ পর্যন্ত তাদের শাস্তি পেতেই হবে।

গ্রামের ষাটোর্ধ্ব নারী সুফিয়া বেগম বলেন, ‘সোহেল গাঁয়ের সাধারণ যুবক আছিল। ভাঙা সাইকেল সারার কাজ করত, আয়-রুজি কম হলেও খায়া-পইরা চলছিল। কিন্তু এমন ধারার হবি, ভাবতি পারিনি। জুয়া, মদ আর চুরি-ছ্যাছরামির অব্যাস (অভ্যাস) ছাওয়ালডাক শেষ করে দিল।

দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন

গ্রামের আরেক বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, ‘ওর (সোহেল) বাপও অনেক চেষ্টা করছিল ছেলেডাক ঠিক পথে আনতে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত হলো না। ঋণের চাপে পড়ে যখন পরিস্থিতি খারাপ হলো, তখন তাকে বাড়ি থেকেও বের করে দিল।

বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে যা জানা গেল, ব্যক্তিগত জীবনে টানাপোড়েন, সংসার ভাঙন এবং ঘনিষ্ঠ এক স্বজনের সঙ্গে বিয়েবহির্ভূত সম্পর্কের অভিযোগ—সব মিলিয়ে সোহেলের জীবন ধীরে ধীরে অন্ধকারের দিকে গড়িয়েছে। জুয়ায় জড়িয়ে হয়ে পড়েন নিঃস্ব। বিচ্ছেদ ঘটে প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে। এরপর নিজ উপজেলার স্বপ্না আক্তারকে বিয়ে করার কিছুদিন পর গ্রাম ছেড়ে পাড়ি জমান ঢাকায়। রাজধানীতে প্রায় তিন বছর সোহেলের ঠিকানা কী ছিল, কী করতেন—কিছুই জানা নেই পরিবার ও গ্রামবাসীর।

গ্রামে সোহেলদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে সুনসান নীরবতা। টিনের ঘরের বারান্দায় বিমর্ষ মুখে বসে ছিলেন ছোট বোন জলি বেগম। ভেতরের কষ্ট বেরিয়ে আসে চোখে-মুখে আর অভিব্যক্তিতে। ঢাকায় যাওয়ার পর থেকে তাদের সঙ্গে সোহেলের যোগাযোগ ছিল না জানিয়ে বললেন, ‘আমরা জানতাম, সে (সোহেল) খারাপ পথে গেছে। কিন্তু এমন ভয়ংকর কিছু করবে, ভাবতেও পারিনি।’

পরিবারের সদস্যরা জানান, তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে সোহেল দ্বিতীয়। গ্রামের স্কুলে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। প্রথম বিয়ে করেন পাশের গ্রামে। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে জুয়া ও একটি বিয়েবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ায় সেই বিয়ে টেকেনি। জুয়া খেলতে গিয়ে ঋণগ্রস্তও হয়ে পড়েন। মাদকগ্রহণের পাশাপাশি জড়িয়ে পড়েন চুরিসহ নানা অপকর্মে। ২০২৩ সালে উপজেলা সদরের স্বপ্নাকে বিয়ে করেন। এর কিছুদিন পরই দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে চলে যান ঢাকায়। তখন থেকে পরিবারের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ ছিল না সোহেলের।

সোহেল রানার বৃদ্ধ বাবা জাকির আলী ছেলের ঘটনায় যেন লজ্জায় মাটিতে মিশে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘তাকে (সোহেল) নিয়ে পরিবারে সব সময় অশান্তি হতো। বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার পর সে দ্বিতীয় বিয়ে করে কিছুদিন সিংড়ায় বসবাস করে। এরপর ঢাকায় চলে যায়। এই তিন বছরে সোহেলের সঙ্গে আমাদের কোনো যোগাযোগ ছিল না।

রামিসার মতো নিষ্পাপ শিশুকে সোহেল হত্যা করেছেন তা এখনো মেনে নিতে পারছেন না জাকির আলী। তিনি বলেন, ‘এমন ঘটনা আমার কপালে ছিল, ভাবতেও পারিনি। এই ঘটনায় আমাদের পুরো পরিবার লজ্জিত। আমার দুঃখের কথা আপনাদের কাছে প্রকাশ করতে পারছি না। আমার বুক ফেটে যাচ্ছে।’

ঢাকায় রামিসাকে ধর্ষণ-হত্যার সঙ্গে সোহেলের জড়িত থাকার তথ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পেয়েছে গ্রামবাসী। তা নিয়ে এখন সারা গ্রামে বিস্ময়। স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. আফতাব আলী বললেন, ‘তার (সোহেল) পরিবারের অন্য সদস্যরা নির্দোষ। অপরাধ করেছে সোহেল, তার বিচারই আমরা চাই।’

রাজধানীর পল্লবীতে ৮ বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে গত মঙ্গলবার হত্যা করা হয়। গ্রেপ্তার আসামি সোহেল রানার জবানবন্দি অনুযায়ী, হত্যার আগে রামিসাকে ধর্ষণ করা হয়।

 

বুধবার রাত ৯টার দিকে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখান উপজেলার ইছাপুরা ইউনিয়নের মধ্যম শিয়ালদী গ্রামে তার জানাজা হয়। পরে পারিবারিক কবরস্থানে দাদা-দাদির কবরের পাশে সমাহিত করা হয় শিশু রামিসাকে।

 

রামিসা হত্যাকাণ্ডে মামলা করেছেন তার বাবা। ঘটনার দিন সন্ধ্যায় সোহেল রানাকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরদিন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাঈদের আদালতে ধর্ষণ-হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেন আসামি। পরে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

 

এ ছাড়া ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন ঢাকার আরেক মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. আশরাফুল হকের আদালত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here