কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি :
কুড়িগ্রামে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ট্রাইকো কম্পোস্ট জৈব সার। এ সার ব্যবহারে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার কমছে, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পাচ্ছে এবং নিরাপদ ফসল উৎপাদনের পাশাপাশি মাটির উর্বরতাও বাড়ছে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।
সরেজমিনে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের মীরের বাড়ি গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, কৃষক দম্পতি মিনতী রাণী ও কানাই চন্দ্র নিজ উদ্যোগে ট্রাইকো কম্পোস্ট সার উৎপাদন করছেন। নিজেদের জমিতে ব্যবহারের পাশাপাশি স্থানীয় কৃষকদের কাছেও তারা এ সার বিক্রি করছেন।
ট্রাইকো কম্পোস্ট হলো উপকারী ছত্রাক ট্রাইকোডার্মা সমৃদ্ধ পরিবেশবান্ধব জৈব সার। গোবর, হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা, কচুরিপানা, খড়, কাঠের গুঁড়া, ছাই, চা পাতা, ডিমের খোসা, মেহগনির ফলের খোসা, নালী গুড় ও ট্রাইকোডার্মা মিশিয়ে প্রায় ৪৫ দিনে এ সার উৎপাদন করা হয়। একই সঙ্গে উৎপাদিত হয় ট্রাইকো লিচেট, যা তরল জৈব বালাইনাশক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাইকো কম্পোস্ট মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি, উপকারী অণুজীবের সংখ্যা বাড়ানো, পানি ধারণক্ষমতা উন্নত করা এবং শিকড় পচা, ঢলে পড়া ও উইল্ট রোগের মতো মাটিবাহিত রোগ দমনে কার্যকর ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি রাসায়নিক সারের চাহিদা প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে সহায়তা করে।
কৃষক কানাই চন্দ্র জানান, বছরে প্রায় ১০ হাজার কেজি ট্রাইকো কম্পোস্ট উৎপাদন করেন তারা। নিজেদের জমিতে ব্যবহার করার পাশাপাশি প্রতি কেজি ১০ থেকে ১৫ টাকা দরে স্থানীয় কৃষকদের কাছে বিক্রি করেন।
কৃষাণী মিনতী রাণী বলেন, “জৈব সার উৎপাদনের মাধ্যমে নিজেদের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাড়তি আয় হচ্ছে। স্থানীয় কৃষকদের মধ্যেও এর চাহিদা বাড়ছে।”
দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন
ধরলা ট্রাইকো কম্পোস্টের উদ্যোক্তা মো. মাসুম মিয়া জানান, আরডিআরএস বাংলাদেশ ও পিকেএসএফের সহযোগিতায় তিনি ট্রাইকো কম্পোস্ট উৎপাদন শুরু করেন। চলতি মৌসুমে ১২০ মেট্রিক টন সার উৎপাদন হয়েছে। আগামী মৌসুমে ৪০০ মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
জৈব সার উৎপাদন কেন্দ্রের শ্রমিক বিধান চন্দ্র ও বুলবুলি বলেন, এ উদ্যোগের ফলে এলাকায় ২০ থেকে ৩০ জন নারী-পুরুষের নিয়মিত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তারা প্রতিদিন প্রায় ৫০০ টাকা মজুরি পাচ্ছেন।
কৃষক মো. সবুজ মিয়া বলেন, “রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারে খরচ বাড়ে এবং মাটির উর্বরতা কমে যায়। ট্রাইকো কম্পোস্ট ব্যবহারের পর ভালো ফলন পাচ্ছি এবং উৎপাদন ব্যয়ও কমেছে।”
আরডিআরএস বাংলাদেশের কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. সজিব আহমেদ বলেন, জেলায় ট্রাইকো কম্পোস্টের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। পরিবেশবান্ধব কৃষি সম্প্রসারণে আরডিআরএস ও পিকেএসএফ যৌথভাবে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহায়তা এবং উদ্যোক্তা তৈরির কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
রাজারহাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোছা. সাইফুন্নাহার সাথী বলেন, “ট্রাইকো কম্পোস্ট ও লিচেট ব্যবহারে কৃষকেরা লাভবান হচ্ছেন। এতে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের পাশাপাশি মাটির উর্বরতাও বাড়ছে। সরকারি ও বেসরকারিভাবে কৃষকদের এ জৈব সার ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।”

