কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি :
উত্তরের সীমান্তবর্তী জেলা কুড়িগ্রাম। এক সময় এই অঞ্চলের কৃষকদের ভাগ্য কেবল ধান, পাট আর আলুর ওপরই নির্ভরশীল ছিল। জলবায়ু পরিবর্তন ও অনিয়মিত আবহাওয়ার নিষ্ঠুর প্রভাবে গত কয়েক বছরে প্রচলিত এসব ফসলে লোকসানের বোঝা ভারী হয়েছে।
এ অবস্থায় কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলায় পেঁয়াজের বীজ উৎপাদন এক নতুন আশার আলো দেখিয়েছে। প্রথমবারের মতো এই অঞ্চলে শুরু হওয়া পেঁয়াজ বীজ উৎপাদন স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিতে খুলে দিচ্ছে সম্ভাবনার নতুন এক দুয়ার।
কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার সদর ইউনিয়নের ছাটমাধাই গ্রামের কৃষক মোঃ রাসেল আহমেদ দীর্ঘদিন ধরে কৃষি কাজের সঙ্গে যুক্ত। এক সময় তিনি কেবল ধান ও আলু চাষ করতেন। কিন্তু বিরূপ আবহাওয়ার কারণে যখন লোকসান ধারাবাহিকভাবে বাড়ছিল, তখন তিনি বিকল্প ফসলের খোঁজে নামেন। সেই সাহসী উদ্যোগ থেকেই এবার তিনি প্রথমবারের মতো ‘পলিক্রস’ জাতের পেঁয়াজের বীজ উৎপাদনে হাত দেন।
গত ডিসেম্বরে প্রায় ৬০ শতক জমিতে পেঁয়াজের কদম বা চারা রোপণ করেন রাসেল। শুরু থেকেই তিনি সজাগ ছিলেন পরিচর্যায়। সম্প্রতি ছাটমাধাই গ্রামে সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, মাঠজুড়ে শুধু পেঁয়াজের সবল ও সুস্থ কদম। সাদা ফুলে ঢেকে গেছে মাঠ, যা থেকে বেরিয়ে আসবে বীজ।
শ্রমিক, সার ও কীটনাশকসহ এই প্রকল্পে রাসেলের মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় দুই লাখ টাকা। তিনি আশা করছেন, এই ক্ষেত থেকে প্রায় ২০০ কেজি মানসম্মত বীজ উৎপাদিত হবে। বর্তমানে বাজারে ভালোমানের পেঁয়াজ বীজের যে দাম, তাতে এই বীজের বাজারমূল্য দাঁড়াতে পারে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা। ইতোমধ্যে পরিকল্পনা অনুযায়ী সাড়ে তিন মাসের মাথায় বীজ সংগ্রহ শুরু করেছেন রাসেল।
কৃষক মোঃ রাসেল আহমেদ বলেন, কুড়িগ্রামে এই প্রথম বেশি দামে সার ও কীটনাশক কেনার পরও এই বীজটা আমি উৎপাদন করেছি। আল্লাহর রহমতে ফলন মোটামুটি ভালো হয়েছে। আশা করি সব খরচ বাদ দিয়ে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত মুনাফা আসবে। যদি এখান থেকে ভালো কিছু হয়, তাহলে আগামীতে আরও বড় পরিসরে বীজ উৎপাদন করব।
দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন
রাসেলের এই পেঁয়াজ বীজের চাষ স্থানীয় শ্রমবাজারেও প্রাণ সঞ্চার করেছে। প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ জন নারী-পুরুষ শ্রমিক মাঠের পরিচর্যা থেকে শুরু করে বীজ সংগ্রহের কাজ করছেন। নারী শ্রমিক কহিনুর বেগম কাজ করতে করতে বলেন, সাড়ে তিন মাসে এই ক্ষেতের কাজে অনেক মানুষের কাজের ব্যবস্থা হয়েছে। পাশাপাশি কৃষক রাসেল আহমেদও পেঁয়াজ বীজ থেকে ভালো লাভ পাবেন।
স্থানীয়রা জানান, এই এলাকার শ্রমিকরা আগে মৌসুমি কাজের অপেক্ষায় থাকতেন। এখন পেঁয়াজ বীজের এই নতুন খামারে তারা দৈনিক ৩০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি পাচ্ছেন।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উত্তরের এই জেলায় বর্তমানে বৃষ্টিপাত কিছুটা কমেছে এবং তাপমাত্রা বেড়েছে। অদ্ভুত শোনালেও, এই পরিবর্তিত আবহাওয়া পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। আগে কুড়িগ্রামের চাষিদের বীজের জন্য ফরিদপুর বা দেশের অন্য প্রান্তের ওপর নির্ভর করতে হতো। এতে পরিবহন খরচ বাড়ত এবং প্রায়ই নিম্নমানের বীজ পাওয়ায় কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হতেন। এখন স্থানীয়ভাবে মানসম্মত বীজ উৎপাদন শুরু হওয়ায় সেই আমদানিনির্ভরতা কমবে।
কুড়িগ্রামের খামারবাড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক কৃষিবিদ মোঃ তানভীর আহমেদ সরকার বলেন, ‘কুড়িগ্রাম জেলার অনেক জায়গায় পেঁয়াজ উৎপাদন হলেও বীজ উৎপাদনকারী নেই বললেই চলে। তবে স্থানীয় কৃষি অফিসের সার্বিক সহযোগিতায় কৃষক রাসেল আহমেদের জমিতে এবার পেঁয়াজ বীজের ভালো ফলন হয়েছে।’
এই বাংলা/এমএস
টপিক

