মামার দীক্ষায় ভাগনে এস. আলম বিশ্বের আলোচিত ব্যাংক ডাকাত

ইসলামী ব্যাংক এবং এস আলম গ্রুপের - প্রতিকী ছবি
মোহাম্মদ মোশার্রাফ হোছাইন খান :
বিশ্বের সর্ববৃহৎ ও অভিনব কৌশলের ব্যাংক ডাকাতির ঘটনা ঘটে বাংলাদেশে। তৎকালীন সরকার প্রধানের নেপথ্য ছত্র-ছায়ায় সাইফুল আলম মাসুদ (এসআলম) কে সফলভাবে এ ঘটনা ঘটাতে প্রশাসনিক ও আইনগত সব সহযোগিতা দেওয়া হয়। সরকার প্রধানের নেপথ্য প্রশাসনিক ও আইনি সহযোগিতায় এস আলম প্রথমে দেশের সর্ববৃহৎ বাণিজ্যিক ব্যাংক ইসলামি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি দখল করে। এরপর একে একে আরো পাঁচটি ইসলামিক ধারার ব্যাংক দখল করে নেয়। এস আলম চট্টগ্রামের আর্থিক ও রাজনৈতিক মাফিয়া আখতারুজ্জামান চৌধূরী বাবুর ভাগনে।

দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন

ভাগনে সাইফুল আলম মাসুদ (এসআলম) নানামুখী অপকর্ম, ব্যাংক দখল ও লুটতরাজ এবং বিভিন্ন দেশে নিরাপদে আর্থ পাচারের দক্ষতা অর্জন করেন মামা আখতারুজ্জামান চৌধূরী বাবুর কাছে। মামার কাছ থেকে প্রাপ্ত দীক্ষায় শান্ত মেজাজে পরিকল্পনামাফিক স্থির লক্ষ্যে ব্যাংকের ঋণের অঙ্ক বাড়াতে থাকেন। ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারিতে প্রায় তিন যুগের ব্যবধানে এস আলমের সে লক্ষ্য বাস্তবায়িত হয়। বিশ্বের ইতিহাসে দেশের প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রীয় সংশ্লিষ্ট সব বিভাগ এবং প্রভাশালী গোয়েন্দা সংস্থার কতিপয় দুর্বৃত্তদের কর্মকর্তা সহযোগে সর্ববৃহৎ বাণিজ্যিক ব্যাংক ইসলামি ব্যাংক পিএলসি যে অভিনব কৌশলে দখল করে, বিশ্বব্যাপী ব্যাংকিং এর ইতিহাসে এটিই সর্ব প্রথম বিরল ঘটনা। এ দখল দায়িত্বের পর মাত্র সাড়ে সাত বছরে এস.আলম ব্যাংক ডাকাতি লুটতড়াজে যে মডেল প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তার গুরু ও মামা আখতারুজ্জামান চৌধূরী বাবুর কোনো দিন তা স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেননি। এস. আলম ইসলামি ব্যাংক দখলের পরপরই অপর আরো ৭টি ইসলামি ধারার ব্যাংক তার দখলদারিত্বে দিয়ে দেওয়া হয়। এ ব্যাংকগুলো দখল করে মাত্র সাড়ে সাত বছরে ডাকাতি ও পাচারের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির যে ধস নামিয়েছেন, তা আগামী কয় বছরের মধ্যে অথবা আদৌ কাটিয়ে উঠা সম্ভব হবে কিনা এ নিয়ে অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার, বিশ্লেষক ও ব্যাংকাররা কষসে বিভিন্ন হিসাব নিকাশ। এ নিয়ে ব্যবসায়ী ও আমানতকারীদের মধ্যে এখনো বিরাজ করছে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা। ইসলামি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি যদিও শেখ পরিবার সিন্ডিকেটের এস আলমীয় ডাকাতি ও লুটতরাজের ধকল সামলে উঠার সন্ধিক্ষণে রয়েছে তবে অপর ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোর ভাগ্য এখনো অনিশ্চিত রয়েছে।

মামার দীক্ষায় ভাগনে

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে সর্বপ্রথম ও সর্ববৃহত্তর খেলাপি ছিল চট্টগ্রামের ডন ও ওই অঞ্চলের রাজনীতির রহস্য পুরুষ খ্যাত আখতারুজ্জামান চৌধুরি বাবুর আরামিট গ্রুপ। নব্বই দশকের শুরুতে এ গ্রূপটির দেশের প্রথম প্রজন্মের ব্যাংক ইউসিবিএলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২০ কোটি টাকা। “বাবু কি খেয়েছে তা বলতে মানা, তবে ব্যাংক খেয়েছে এটি সবার জানা“ অখতারুজ্জামান চৌধুরীকে বাবুকে নিয়ে এমন একটি কথা বিভিন্ন মহলে প্রচলিত আছে। ১৯৯৬ সালে এই বাবু তার বড়ো ছেলে সাইফুজ্জামান চৌধুরি জাবেদের (পরবর্তীতে ভূমিমন্ত্রী ও টাকা পাচারের আলোড়ন র্সৃস্টিকারী এক কুখ্যাত চরিত্র ) নেতৃত্বে ইউনাইটেড কমার্সিয়াল ব্যাংকের বোর্ড মিটিং চলাকালে এর চেয়ারম্যান ও পরিচালকদের চরম নির্যাতন করে ব্যাংকটি দখলে নেয়। দেশের ব্যাংক খাতে প্রথম হত্যাকাণ্ডের শিকার ইউসিবিএলের তৎকালীন ‌চেয়ারম্যান হুমায়ূন জহির। এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে আখতারুজ্জামান চৌধুরি বাবুর হাত ছিল বলেও অনেকে মনে করছেন। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ইউসিবিএল থেকে আন্তর্জাতিক বড়ো কয়েকটি ব্যাংক তাদের ব্যাবসা গুটিয়ে নেয় বলেও জানা যায়। দেশের রাজনৈতিক ও আর্থিক দুর্বৃত্ত আখতারুজ্জামান চৌধূরী বাবুর ভাগনে সাইফুল আলম মাসুদ বা এস. আলম।

এস. আলমের কর্ম জীবনের হাতেখড়ি হয় মামা আখতারুজ্জামানের হাত ধরে। মামার হাতে ব্যাবসায়িক ধারা পাঠ শেষে তার কোম্পানির টিনের এজেন্সির ব্যাবসার মাধ্যমে স্বাধীনভাবে পথ চলা শুরু হয় তার। এরপর তাকে আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। ১৯৮৫ সালে ইসলামি ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখায় অ্যাকাউন্ট খুলে ব্যাংকটির সাথে যুক্ত হয় এস. আলম। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে ব্যাংকটি থেকে ৩৬ শত কোটি টাকা লোন গ্রহণ করে সর্ববৃহৎ গ্রাহকের মর্যাদায় উন্নীত হন। ব্যাংকের টাকায় একের পর এক শিল্প প্রতিষ্ঠান গঠনের নামে মামা বাবুর কাছে প্রাপ্ত কৌশলে ব্যাংক দখলের প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হতে থাকেন। শেখ হাসিনার নির্দেশনায় ডিজিএফআই’র হাসিনা ঘনিষ্ঠ কয়েকজন দুর্বৃত্ত কর্মকর্তার তত্ত্বাবধায়নে, ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি পরিচালকদের জিম্মি করে পদত্যাগে বাধ্য করে এস. আলমের নিয়োগকৃতদের দেশের সর্ববৃহৎ বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক ইসলামি ব্যাংক পিএলসিতে পরিচালক পদে বসানো হয়। এছাড়া এস আলম গ্রুপের হাতে ইসলামি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগীর ভূমিকা পালন করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একদল সিনিয়র কর্মকর্তা। এদেরই একজন এবং মূল সহযোগী ছিলেন তৎকালীন ডেপুটি গভর্নর এসকে সুর চৌধুরী। তার বিরুদ্ধে এনআরবি, গ্লোবাল ব্যাংক ও রিলায়েন্স ফাইন্যান্স লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক পি.কে হালদারকে চারটি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ১০ হাজার ২০০ কোটি টাকা পাচারে সহযোগিতা করার অভিযোগও আছে। রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের সম্পূর্ণ মালিকানা এস আলম গ্রুপের। এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকেও ছিল তাদের একচেটিয়া প্রভাব। এদিকে,এস.আলমের নিয়োগ পরিচালক ও এমডি আব্দুল হামিদ মিয়া, মাহবুবুল আলম ও মনিরুর মাওলাসহ ব্যাংকটির ঊর্ধ্বতন কয়েক জন কর্মকর্তা এস আলমের লুটপাটের সহযোগী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এদের কেউ কেউ গুরুত্বপূর্ণ পদে এখনো বহাল রয়েছেন।নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ

বলা হয়ে থাকে হরিণের নিজের সুস্বাদু গোস্তই এর প্রধান শত্রু। প্রতিষ্ঠার অল্প কয়েক বছরের ব্যবধানে ইসলামি ব্যাংকের আকাশছোঁয়া সফলতাই এর জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠার পর অধিকাংশ অর্থনীতিবিদ, বিশ্লেষক ও ব্যবসায়ীদের অনেকের ধারণা ছিল মাদ্রাসায় পড়ুয়া অথবা ইসলাম জানা লোকরা কি আর ব্যাংক পরিচালনা করবে। কয়েক বছরের মধ্যেই তাদের ধারণাটি মিথ্যা প্রমাণিত হয়। গ্রাহক সেবা, বিশ্বস্ততা, জন আস্থায় ইসলামি ব্যাংক দেশের শীর্ষ ব্যাংক হিসাবে প্রতিষ্ঠা পায়। এর সাথে বাড়তে থাকে ইসলামি ধারার সামাজিক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান।

এসকল প্রতিষ্ঠানগুলোর সফলতাই গাড়ি চোরের পেট্রনাইজার, জনতা ব্যাংক খেকো আবুল বারাকাতের মতো তথাকথিত অর্থনীতিবিদদের চরমভাবে আঘাত হানে। ২০০৯ সালে স্বৈরাচার হাসিনার ক্ষমতা গ্রহণের পর জনতা ব্যাংক, খেকো এই তথাকথিত অর্থনীতিবিদ এক লাখ কোটি টাকার জঙ্গি অর্থায়ন সংক্রান্ত কাল্পনিক বয়ান তৈরি করেন ও বাংলাদেশে ইসলামি অর্থ ব্যবস্থার মূল উৎপাটন করে দিতে বেশ কয়েকটি প্ল্যান গ্রহণ করা হয়। এ কাজটি শুরু করা হয় সপরিবারে দুর্নীতিবাজ আ.লীগের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকুর মাধ্যমে। ২০১০ সালের ৫ ডিসেম্বর, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জঙ্গি দমন বিষয়ক উচ্চ পর্যায়ের এক বৈঠক শেষে ইচ্ছাকৃতভাবে ইসলামি ব্যাংকের জাকাত খাতের ব্যায়কে জংগী অর্থায়ন হিসেবে উপস্থাপন করে বক্তব্য দেন। একইভাবে ২০১৩ সালেও একটি বৈঠকের পরেও জনসম্মুখে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি দাবি করেন, ইসলামি ব্যাংকের ৮ শতাংশ অর্থায়নই সন্ত্রাসবাদ সংশ্লিষ্ট। এর প্রতিক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর আতিউর রহমান প্রধান প্রধান বিদেশি ব্যাংকগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক জরুরি সভা আয়োজন করে, তার কথায় কান না দিয়ে– সবাইকে আইবিবিএলের সাথে তাদের ব্যাবসা চালু রাখার অনুরোধও জানান। এছাড়া ২০১২ সাল থেকে ব্যাংকটির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে একের পর এক মামলার জাল তৈরি করে হাসিনার সরকার। নানা অজুহাতে কয়েক হাজর নিরীহ কর্মকর্তাকে মামলার জালে আবদ্ধ করে ব্যাংকটির ঊর্ধ্বগতি থামিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা নেয়া হয়।ইসলামি ব্যাংকসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান নিয়ে জঙ্গীবাদের বয়ানে আরো জোরালোভাবে উপস্থাপন করা হয়। এই বয়ান তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (সাবেক) ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. এ কে আজাদ চৌধুরি, সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও কূটনীতিক ওয়ালিউর রহমান, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (সাবেক) উপাচার্য অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (সাবেক) অধ্যাপক ড. এম ওয়াহিদুজ্জামান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। ড. আনোয়ার হোসেন, অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ, অধ্যাপক ড. জিনাত হুদা, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর আব্দুল মান্নান, ড. হাফিজুর রহমান কার্জন, রাশেদা রওনক জাহান, মেজর জেনারেল (অব.) মো. আব্দুর রশীদ, ইসলামি ব্যাংকের ইসলামিক ফাউন্ডেশনের (সাবেক) মহাপরিচালক সামীম মোহাম্মদ আফজাল, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির, সাংবাদিক প্রণব সাহা, শাবান মাহমুদ ও দীপু মালাকারসহ আ.লীগিয় বুদ্ধিজীবীরা। এ বয়ান জনসাধারণের কাছে গ্রহণযোগ্য করার দায়িত্ব পালন করে প্রভাবশালী কিছু বাংলা ও একটি ইংরেজি দৈনিক এবং কয়েকটি টিভি চ্যানেল। তবে এ বয়ান বাস্তবে প্রমাণ করতে প্রমাণ করতে তারা ব্যর্থ হন।

এ প্ল্যান ব্যর্থ হওয়ায় ইসলামি ব্যাংককে জামাআত মুক্ত করার নামে ব্যাংক দখলের প্ল্যান শুরু করা হয়। এই পরিকল্পনার দায়িত্ব দেওয়া হয় শেখ পরিবারের বিশ্বস্ত তৎকালীন ইফার ডিজি সামিম মোহাম্মদ আফজালকে। এ বিষয়ে তিনি প্রায় তিন বছর ব্যাপক গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ করে একটি রূপরেখা শেখ হাসিনাকে তৈরি করে দেন। ২০১৬ সালের মে মাসের প্রথম সপ্তাহে, আইবিবিএল এর স্বাধীন চার পরিচালক নিয়োগের অনুমোদন দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নতুন পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন– এম আজিজুল হক, অধ্যাপক সৈয়দ আহসানুল আলম, হেলাল আহমেদ চৌধুরি, শামীম মোহাম্মদ আফজাল। এই পরিচালকদের একজন– ব্যাংকের অডিট বা নিরীক্ষার প্রতিবেদনগুলো নিয়ে শত শত আপত্তি তুলতে থাকেন, এর মধ্যে দিয়েই ব্যাংকটি দখল প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা হয়।এস. আলমকে কেন হাসিনার পছন্দ

সংশ্লিষ্ট কয়েকজন বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, শেখ হাসিনার সাড়ে পনেরো বছরের শাসন আমলে ইসলামি ব্যাংকসংক্রান্ত ডিলটি ছিল সব চেয়ে বড়ো ডিলের একটি। এ ডিল নিরাপদ ও বিশ্বস্ততার সাথে বাস্তবায়ন করতে এমন একজনকে প্রয়োজন ছিল যার বহুমাত্রিক প্রতিভা রয়েছে। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর বাংলাদেশে বড়ো ব্যবসায়ীদের মধ্যে একমাত্র এস আলমের মাঝে এ বহুমাত্রিকতা খুঁজে পাওয়া যায়। এস আলম স্ব পরিবারে ছিলেন পীর ভক্ত, আখতারুজ্জামান চৌধুরীর বাবুর ভাগনে, বিএনপি-জামাতের দীর্ঘদিনের সাহায্যকারী, ইসলামি ব্যাংকের প্রায় তিন যুগের বিশ্বস্ত সহযোগী, বিশ্বের প্রায় দেশে টাকা পাচারের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। এমন আলাদিনের দৈত্ত বাংলাদেশে বিরল। হাসিনা অনুগত অনুসন্ধানী দলের নিখুঁতভাবে দীর্ঘ জাস্টিফিকশন শেষে এস আলমকে এ ডিল বাস্তবায়নের দাত্ব দেওয়া হয়। এস আলম অত্যন্ত নিখুঁতভাবে এ ডিল বাস্তবায়নে সক্ষমতার পরিচয় দেন। বরং এমন কিছু কারিশমা দেখান যা হাসিনা বা তার অনুগতরা কখনো কল্পনাও করতে পারেননি। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, আর মাত্র তিন থেকে ছয় মাস সময় হাতে পেলে দেশে ইসলামি ব্যাংক নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যেত না।

২০১৬-এর ডিসেম্বরে ইসলামি ব্যাংক

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে ২০১৬ সাল পর্যন্ত একটি আইকনিক ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল ইসলামি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। ইসলামি ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালে মোট ডিপোজিট ছিল প্রায় ৬৮ হাজার ১৩৫ কেটি ২০ লাক টাকা, মোট বিনিয়োগ ছিল ৬৭ হাজার ৬৭৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা, এ সময় মোট সম্পদ ছিল ৭৯ হাজার ৭৯২ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। মোট ক্যাপিট্যাল (ইকিইউটি ) ছিল ৫০৫৫৬.৪ মিলিয়ন টাকা, প্রফিট আর্নিং এসেট ছিল ৬২৩৫৪৫.১৯ মিলিয়ন টাকা, বিনিয়োগ থেকে আয় ছিল ৫৪১৫৫.১ মিলিয়ন টাকা। এ সময় ব্রাঞ্চ সংখ্যা ছিল ৩১৮ টি, জনবল সংখ্যা ছিল ১৩৫৬৯ জন। সিআরআর ছিল ৮.৩৮ শতাংশ, এসএলআর ছিল ১২.৫৯, শেয়ারের সর্বোচ্চ বাজার মূল্য ছিল ৩৪.৮০ টাকা। অন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে প্লেসম্যান্ট ছিল ৩০০ কোটি টাকা। অন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্লেসম্যান্ট ছিল ১৬৯২.০৯ কোটি টাকা। জাকাত ব্যয় ছিল ৪৯.৪৯ কোটি টাকা। বেতন খাতে ব্যয় ছিল ১২৭৮.৯৩ টাকা। ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বেতন ছিল ১.১১ কোটি টাকা।

ইসলামি ব্যাংক দখল

প্রতিষ্ঠার লগ্ন থেকে ইসলামি ব্যাংক একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ড রক্ষা করে জনবল নিয়োগ করা হয়। মানদণ্ড মাফিক যোগ্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কোনো রকম ছাড় দেওয়া হয়নি। বিপুলসংখ্যক মেধাবী ও আত্মত্যাগী কর্মীরা ব্যাংকটিকে একটি বিশ্বাস ও আস্থার জায়গা পরিণত হয়। হাজার হাজার ডেডিকেটেড কর্মীদের একটি ব্যাংক খুব সহজে কেউ সুনাম নষ্ট করে দেওয়া কিংবা দখলে নিয়ে নেয়া খুব একটা সহজ কাজ ছিল না। ২০০৯ সালে আ. লিগ ক্ষমতারোহনের পর ভবিষ্যৎ ইসলামি ব্যাংকিং ও ইসলামি অর্থ ব্যবস্থার ঊর্ধ্বমুখী জনপ্রিয়তা ও সফলতার বিষয়টি সেক্যুলার ইসলাম বিদ্বেষী গোষ্ঠীর সামনে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হিসেবে দাঁড়ায়। এতে ইসলাম ফিক ও তথাকথিত আর্থনীতি বিদ, কাল্পনিক গবেষক ড. আবুল বারাকাত ও ইফার সাবেক লেবাসি ডিজি শামিম মোহাম্মদ আফজাল ইসলামি আর্থনীতি ও ইসলামি ব্যাংকিং নিয়ে সরকারি টাকা খরচ করে জঙ্গি অর্থনীতির বয়ান তৈরি করে প্রচার করতে থাকে। এ বয়ান প্রচারের বিশাল বাজেটের সিংহভাগ অর্থই তারা আত্মসাৎ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ইসলামি অর্থনীতির ঊর্ধ্বগতি থামিয়ে দিতে স্বৈরাচার হাসিনা ও বিশ্বস্ত অনুচররা ২০১০ সাল থেকে একের পর এক কৌশল প্রয়োগ করা অব্যাহত রাখে। ২০১৩ সালে, গণজাগরণ মঞ্চের নেতৃত্ব দিয়ে ইতিহাসের দুই কুখ্যাত সন্তানকে লেলিয়ে দেওয়া হয় ইসলামি ব্যাংকিং ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সমূহে তাণ্ডব চালানোর জন্য। সে সময় তারা ইসলামি ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় ও এটিএম বুথে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। সে সময় রহস্যজনকভাবে পুলিশ ও বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। এমন সব কৌশলও ইসলামি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ সফলভাবে মোকাবিলা করে। হাসিনা সরকারের কাছে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয় যে, দুর্বল কোনো কৌশল প্রয়োগ করে ইসলামি অর্থ ব্যবস্থা ধ্বংস করা সম্ভব নয়। সর্বশেষ প্রশাসনিক ও আইনি এবং বল প্রয়োগের মাধ্যমে ব্যাংকটির পরিচালকদের জিম্মি করে ২০১৭ সালের পাঁচ জানুয়ারি ইসলামি ব্যাংক এস.অলমের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এস আলম-এ ব্যাংকটি দখলদারিত্ব গ্রহণের পরপরই আরো ছয়টি ব্যাংক দখলে নিয়ে নেয়। একটানা সাড়ে সাত বছর-এ ব্যাংকগুলোতে লুটতরাজ চালায়। এ লুটতরাজের পরও ইসলামি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, অপর ছয় ব্যাংকের আল আরাফাহ, বাকী ছয়টির কী পরিণাম হবে তা কারো জানা নেই। চলবে-
এই বাংলা/এমএস
টপিক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here