মোহাম্মদ মোশার্রাফ হোছাইন খান :
আল্লামা ইকবালের জাতীয়তাবোধ চেতনা, নজরুল বিদ্রোহী প্রেরণা ও রুমির জাতীয় প্রেমের জীবন্ত এক কিংবদন্তি হয়ে উঠেছিলেন শরীফ ওসমান হাদী। ভারতীয় আধিপত্যবাদ ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিকল্প হিসেবে বাংলাদেশের মানুষের সহস্র বছরের লালিত সাংস্কৃতিক নেরেটিভ তৈরি করতে দাড় করান ইনকিলাব মঞ্চ। হাদীর বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব ও কণ্ঠস্বর, যৌক্তিক বক্তব্যে অতি অল্প সময়ের মধ্যে সর্ব মহলে বিরল সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত হয়ে উঠেন। জুলাই পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনৈতিক ও আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপটে ১৭ কোটি বাংলদেশি জনগনের রাগ, দুঃখ, ক্ষোভ, আশা, আকাঙ্খা, পাওয়া না পাওয়া এক কথায় আপামর মানুষের মনের কথাগুলো অনায়াসে এবং অকপটে বলে ফেলতেন হাদি। এতে কে খুশি হবে আর কে রাগ হবে সেটা পরোয়া করতেন না। এটাই তার জীবনের কাল হয়ে উঠেছে। আর এটাও তিনি জানতেন যে, এমন কঠিন সত্য উচ্চারণে পরিনতি কী হতে পারে। আর হয়েছেও তা-ই।
দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন
ওসমান হাদীর পরিচয়
শরীফ ওসমান হাদী ৩০ জুন ১৯৯৩ সালে ঝালকাঠি জেলার নলসিটি উপজেলার একটি সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতা মাওলানা শরীফ আব্দুল হাদী নলসিটির সুনামধন্য একজন মাদ্রাসা শিক্ষক, নলসিটির খাসমহল মসজিদের ঈমাম ও স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন সামাজকি সংগঠনের একজন সংগঠকও ছিলেন। যার আদর্শ ও নৈতিক শিক্ষা হাদির জীবন গঠনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি কনিষ্ঠ।
শরীফ ওসমান হাদীর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন শুরু হয় নলছিটি ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা থেকে, সেখান থেকে তিনি তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে চতুর্থ শ্রেণিতে ঝালকাঠি এন এস কামিল মাদ্রাসায় ভর্তি হন, সেখান থেকে তিনি আলিম পাশ করে পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত এই প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স ও মাস্টাস ডিগ্রি অর্জন করেন। একটি শিক্ষক পরিবারে বেড়ে উঠা শরীফ ওসমান হাদী ছাত্রজীবন শেষে জ্ঞান বিতরণের মহান পেশা শিক্ষকতাকে বেছে নেন। একটি স্বনামধন্য কোচিং সেন্টারে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে তার কর্মজীবন শুরু হয়। যেখানে তিনি শিক্ষার্থীদের মাঝে বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। এরপর তিনি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। শরিফ ওসমান হাদি এক সন্তানের জনক। পরিবার, শিক্ষকতা, জ্ঞানচর্চা ও সামাজিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ঘিরেই তার প্রাত্যহিক জীবন আবর্তিত হতো।
রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড
ছোট বেলা থেকেই হাদি ছিলেন রাজনৈতিক সচেতন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর থেকে তিনি রামপুরা এলাকায় বসবাস করতে শুরু করেন। জুলাই আন্দোলনের সময় তিনি স্থানীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন এবং রামপুরা এলাকার সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার দাবিতে হওয়া আন্দোলনে হাদিকে অন্যতম তরুণ নেতৃত্বদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ইনকিলাব মঞ্চ ও দাবি
২০২৪ এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর শরিফ ওসমান হাদির হাত ধরে গড়ে ওঠে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘ইনকিলাব মঞ্চ’। সংগঠনটির ঘোষিত লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়—সব ধরনের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ। ইনকিলাব মঞ্চ গঠনের পর জুলাই অভ্যুত্থানের স্মৃতি রক্ষা, অপরাধীদের বিচার, আহত-নিহতদের স্বীকৃতি এবং জুলাই চার্টার ঘোষণার দাবি তুলেন তিনি। যা তাকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
জুলাই অভ্যুত্থানে পরবর্তী পরিস্থিতিতে ইনকিলাব মঞ্চ সরকারের কাছে ৩ টি দাবি তোলে। দাবিগুলো হলো-গণহত্যাকারী দল আওয়ামী লীগের নিবন্ধন অবিলম্বে বাতিল করা, সন্ত্রাসী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের গুপ্ত হত্যা থেকে দেশ প্রেমিক ছাত্রজনতাকে বাঁচাতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্র থেকে ইউনিয়ন পর্যন্ত কমিটিতে থাকা সব সন্ত্রাসীকে অবিলম্বে গ্রেফতার করা ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সব জুলাই-যোদ্ধাদের জীবনের সম্পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
আওয়ামীলীগ নিষিদ্ধ করণের আন্দোলন
২০২৫ সালে আওয়ামী লীগকে সন্ত্রাসী ও রাষ্ট্রদ্রোহী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করার দাবিতে “ন্যাশনাল অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট ইউনিটি” ব্যানারের অধীনে যে দেশব্যাপী আন্দোলন গড়ে ওঠে, সেখানে ইনকিলাব মঞ্চ অন্যতম অংশগ্রহণকারী সংগঠন হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। ইনকিলাব মঞ্চের মাধ্যমে হাদি আওয়ামী লীগের দমন-পীড়ন ও হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী করে নিষেধাজ্ঞার দাবি তুলে ধরেন এবং দাবি না মানলে সচিবালয় ঘেরাওয়ের হুমকি দেন। হাদি তার বক্তব্যে বলেছিলেন, ১৪-১৫ বছর ধরে বাংলাদেশে এই ফ্যাসিবাদ কায়েম হয়েছে। বিচার চাই না ফাঁসি চাই বলে হাজার হাজার আয়নাঘর কায়েম করা হয়। রোজা ভাঙিয়ে আমার বোনকে ধর্ষণ করা হয়। বাংলাদেশে বেগম জিয়ার বিনা চিকিৎসায় হাত বাঁকা করে ফেলা হয়েছে। আল্লামা সাঈদীকে মেডিক্যালে চিকিৎসার নামে এখানে এনে হত্যা করা হয়। মোশতাককে জেলের মধ্যে হত্যা করা হয়। মাইকেল চাকমার জীবন শেষ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। সর্বশেষ হেলিকপ্টার থেকে গুলি করে আমাদের ভাই-বোনদের কলিজা ছিন্নভিন্ন করে দেওয়া হয়। অন্য বক্তব্যগুলোতে হাদি নিজেকে ও তার সংগঠনকে “ফ্যাসিবাদের” আপোশহীন বিরোধীশক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেন। একই সঙ্গে তিনি যুক্তি দেন যে জুলাইয়ের আন্দোলনকারীদের উচিত আওয়ামী লীগকে আবার রাজনৈতিক বৈধতা ফিরে পেতে না দেওয়া।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের ঘোষণা দিলে ওসমান হাদি ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে দল ও ব্যক্তির বিচার করার জন্য পৃথক ট্রাইব্যুনাল গঠন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নিরপরাধ কর্মীদের প্রায়শ্চিত্তের জন্য কমিশন গঠন এবং ৫ আগস্ট ২০২৫ সালের মধ্যে জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র প্রকাশ করার প্রস্তাব দেন।
বিএনপি ও পুরোনো ধারার রাজনীতি নিয়ে মতামত
২০২৫ সালের জুলাইয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শরিফ ওসমান হাদি বলেন, বিএনপি যদি “পুরোনো ধারায়” রাজনীতি করে ক্ষমতায় আসে, তবে তারা দুই বছরও ক্ষমতায় টিকতে পারবে না। তিনি সেখানে জনগণকেন্দ্রিক রাজনৈতিক ধারা গড়ে তোলার উপর গুরুত্বারোপ করেন এবং সতর্ক করেন যে শুধু সংসদে বসে “দেশবিরোধী আইন” করলে জনগণ তা মেনে নেবে না।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সমালোচনা
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাঠামোগত দুর্বলতা এবং দৃশ্যমান পরিবর্তনের ঘাটতির সমালোচনা করে হাদি সব দলের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান করে একটি জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব করেন।
ঢাকা-৮ আসন থেকে প্রার্থিতা
২০২৫ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন (মতিঝিল, শাহবাগ, রমনা, পল্টন ও শাহজাহানপুর নিয়ে গঠিত) থেকে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেন শরিফ ওসমান হাদি। মতিঝিল, শাহবাগ, রমনা, পল্টন ও শাহজাহানপুর নিয়ে গঠিত এই আসনে তিনি প্রচলিত রাজনীতির বাইরে গিয়ে এলাকাবাসীর সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় ও “চা-সিঙ্গারা” আড্ডার আয়োজনের কথা জানান। এছাড়া তিনি জনগণের পরামর্শ অনুযায়ী তার নির্বাচনি ইশতাহার ঠিক করবেন বলে ঘোষণা দেন। তার এই ভিন্নধর্মী প্রচারণা নাগরিক সমাজে ব্যাপক প্রশংসিত হয় এবং গণমাধ্যমে তুমুল আলোচনার জন্ম দেয়।
নির্বাচনি প্রচারণায় কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে মুড়ি-বাতাসা বিতরণের ছবি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় আসেন তিনি। এছাড়া ফজর নামাজের পর মসজিদের সামনে লিফলেট বিতরণ, ডোনেশনের মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহ এবং সংগৃহীত অর্থের হিসাব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করায় তার জনপ্রিয়তা ক্রমশ বৃদ্ধি পায়। সম্প্রতি নির্বাচনি প্রচারণার সময় ওসমান হাদির পকেটে একজন টাকা ঢুকিয়ে দিচ্ছেন—এমন একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোড়নের সৃষ্টি হয়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের রায় নিয়ে অবস্থান
২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের বিরুদ্ধে প্রদত্ত মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পর আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে শরিফ ওসমান হাদি মন্তব্য করেন, এই রায় “পুরো পৃথিবীর জন্য নজির স্থাপন করেছে” এবং কোনো স্বৈরাচার দীর্ঘকাল মানুষের ওপর নিপীড়ন চালিয়ে যেতে পারে না।
সৃষ্টিকর্ম
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর তিনি জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও এর পূর্বে তিনি শিল্প-সাহিত্য, পাঠচক্র এবং অন্যান্য এক্টিভিজমে সক্রিয় ছিলেন। ‘সীমান্ত শরিফ’ ছদ্মনামে ২০২৪ সালের একুশে বইমেলায় দুয়ার প্রকাশনী থেকে লাভায় লালশাক পুবের আকাশ নামে একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেন।
কর্মসূচি
ইনকিলাব মঞ্চ জুলাই বিপ্লবের সাথে সংহতি রেখে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে। এর মধ্যে অন্যতম হলো, দেশব্যাপী গ্রাফিতি ও স্লোগান পুনর্লিখন কর্মসূচি, শহীদি সপ্তাহ পালন, দাবি আদায়ে অনশন, স্বাধীনতা সংগ্রামের ছবি প্রদর্শনী, ভিডিও ডকুমেন্টেশন, শহীদি স্মৃতিকথা, গণসেজদা ও দ্রোহের গান কর্মসূচি।
স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে আ.লীগের নেতৃত্বে ভারতীয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসন বিরোধী কোন পক্ষ দাড় হতে পারে নি। ২০২৪ জুলাই পরবর্তী বাংলাদশে ভারতীয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের প্রতিপক্ষ হয়ে দাড়ায় শরীফ ওসমান হাদী।তার এই একটিভিজম হুমকির মূখে পড়ে ভারত ও ভারত ঘেষা সম্প্রদায়। এ কারনে শরীফ ওসমান হাদীকে টার্গেটে পরিনত করা হয়। আধিপত্যবাদ বিরোধী নেরেটিভ তৈরী করায় প্রাণ দিতে হয়েছে হাদীকেেএমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের অনেকে।
এই বাংলা/এমএস
টপিক

