মোহাম্মদ মোশার্রাফ হোছাইন খান :
এক সময়ে বাংলাদেশের জাতীয় বাজেট অধিবেশনের আগে অর্থমন্ত্রীকে ওয়াশিংটনের আইএমএফ (IMF) সদর দপ্তর কিংবা ‘প্যারিস কনসোর্টিয়াম’-এর দরজায় ঋণের আশায় অপেক্ষা করতে হতো। তখন রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কূটনীতি ছিল মূলত ‘সহায়তা সংগ্রহের কূটনীতি’ (Aid-seeking Diplomacy)—যার মূল চালিকাশক্তি কোনো সার্বভৌম মর্যাদা বা কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ছিল না, বরং ছিল তীব্র অর্থনৈতিক পরনির্ভরশীলতা। দর-কষাকষির কেন্দ্রে ঢাকার কোনো স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ছিল না।
২০২৫-২৬ ও ২০২৬-২৭ অর্থবছরের সমসাময়িক ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি উদীয়মান জিডিপি (GDP), বিশাল ও কর্মক্ষম জনসংখ্যাকে লজিস্টিক জনশক্তিতে রূপান্তর এবং তৈরি পোশাকের (RMG) বিশ্ববাজারে দ্বিতীয় শীর্ষ শক্তিশালী অবস্থান ধরে রাখার কারণে বাংলাদেশ এখন একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে। গত দেড় দশকের রাজনৈতিক পরাধীনতা ও কূটনৈতিক পরনির্ভরশীলতার বৃত্ত কাটিয়ে উঠে, বাংলাদেশের শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের মাঝে এক নতুন অর্থনৈতিক আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। তবে এই আত্মবিশ্বাসের মধ্যেই ঢাকাকে এক গভীর, বহুমাত্রিক ও ঝুঁকিপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে, যেখানে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নিজের অবস্থান টিকিয়ে রাখতে রাষ্ট্রটিকে প্রতিনিয়ত বহুমূখী সক্ষমতার পরিচয় দিতে হচ্ছে।
তাত্ত্বিক কাঠামো
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে জেমস রোজেনাওয়ের ১৯৬৯ সালের মৌলিক গ্রন্থ ‘লিংকেজ পলিটিক্স’-এর মূল তত্ত্ব অনুযায়ী, ‘ডমেস্টিক-ফরেন পলিসি নেক্সাস’ (Domestic-Foreign Policy Nexus) বা অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতির আন্তঃসংযোগ অত্যন্ত স্পষ্ট ও রৈখিক (Linear)। একটি দেশের অভ্যন্তরীণ শাসন ব্যবস্থার মান, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতাই নির্ধারণ করে আন্তর্জাতিক দর-কষাকষির টেবিলে সেই রাষ্ট্রের আসল সক্ষমতা বা ‘বার্গেনিং পাওয়ার’।
এই তত্ত্বেরই প্রায়োগিক রূপ পাওয়া যায় হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রবার্ট পুটনামের বিখ্যাত ‘টু-লেভেল গেম থিওরি’ (Two-Level Game Theory, 1988)-তে। পুটনামের মতে, একজন রাষ্ট্রনায়ককে একই সাথে দুটি আলাদা দাবার বোর্ডে খেলতে হয়: লেভেল ১ (আন্তর্জাতিক স্তর), যেখানে কূটনীতিবিদরা অন্য পরাশক্তি বা আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে দর-কষাকষি করেন; এবং লেভেল ২ (অভ্যন্তরীণ স্তর), যেখানে দেশের সংসদ, আমলাতন্ত্র এবং জনগণ সেই চুক্তির অনুসমর্থন (Ratification) দেয়। পুটনামের এই থিয়োরির মূল ভিত্তি হলো ‘উইন-সেট’ (Win-Set), যা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির দ্বারা গৃহীত হতে পারে এমন সম্ভাব্য চুক্তির পরিধিকে নির্দেশ করে। যখন একটি দেশের সরকার অভ্যন্তরীণ স্তরে তীব্র রাজনৈতিক বৈধতার সংকটে ভোগে, তখন তার আন্তর্জাতিক ‘উইন-সেট’ মারাত্মকভাবে সংকুচিত ও নমনীয় হয়ে পড়ে। এর ফলে নিউ ইয়র্ক, বেইজিং কিংবা দিল্লির কূটনৈতিক টেবিলে বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর কতটা দৃঢ় হবে, তা আসলে নির্ধারিত হয় ঢাকার ভেতরের রাজনীতির অভ্যন্তরীণ সমীকরণের মাধ্যমে। এখানেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের সবচেয়ে বড়ো কাঠামোগত দুর্বলতা।
অভ্যন্তরীণ ক্ষত
একটি রাষ্ট্র যখন ভেতরে গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা, আইনের শাসন এবং রাজনৈতিক বৈধতার সংকটে ভোগে, তখন আন্তর্জাতিক টেবিলে তার অবস্থান ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। ‘ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্ট’ (WJP) ২০২৫-এর আইনের শাসন সূচকের (Rule of Law Index) ফ্যাক্টর-ভিত্তিক উপাত্ত বাংলাদেশের এই প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়ের এক নির্মম চিত্র উঠে আসে। সামগ্রিক সূচকে বাংলাদেশ ১৪৩টি দেশের মধ্যে ১২৫তম অবস্থানে থাকলেও, এর ভেতরের উপাত্তগুলো আরও বেশি আশঙ্কাজনক :
মৌলিক অধিকার (Factor 4: Fundamental Rights): আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে যে উপাদানটি একটি দেশের দর-কষাকষির নৈতিক ভিত্তিকে সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী করে, সেই মৌলিক অধিকার ফ্যাক্টরে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বের ১৪৩টি দেশের মধ্যে ১৩৩তম—যা একে বৈশ্বিক তলানির মাত্র ১০টি দেশের কাতারে এনে দাঁড় করিয়েছে। এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার ৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ এখানে ৫ম (কেবল আফগানিস্তানের ওপরে)।
দেওয়ানি বিচার (Factor 7: Civil Justice): দেশের দেওয়ানি বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতার কারণে বাংলাদেশ এখানে ১৩২তম অবস্থানে রয়েছে।
দুর্নীতির অনুপস্থিতি (Factor 2: Absence of Corruption): এই গুরুত্বপূর্ণ পরিমাপকে বাংলাদেশের অবস্থান ১১৪তম।
পুটনামের ‘টু-লেভেল গেম’-এর পরিভাষায়, মৌলিক অধিকারের এই চরম বিপর্যয় এবং বিচারহীনতার প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষত ঢাকার অভ্যন্তরীণ ‘উইন-সেট’ (Win-Set)-কে আন্তর্জাতিক পরাশক্তিদের সামনে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত ও অরক্ষিত করে দেয়। যখন একটি দেশের সরকার নিজের মানবিক মৌলিক অধিকার রক্ষায় ১৩৩তম হয় এবং অভ্যন্তরীণ বৈধতাহীনতার গভীর ‘আস্থার ঘাটতি’ (Trust Deficit) তৈরি করে, তখন আন্তর্জাতিক টেবিলে পরাশক্তিদের চাপের সামনে সে কোনো ‘কৌশলগত প্রতিরোধ’ (Strategic Defiance) গড়ে তুলতে পারে না। সংসদ ও জনসম্পৃক্ততাহীন এই অভ্যন্তরীণ প্রাতিষ্ঠানিক সংকট এক গভীর ‘অনুসমর্থন সংকট’ বা ‘র্যাটিফিকেশন ক্রাইসিস’ (Ratification Crisis) তৈরি করে। এর ফলে, আন্তর্জাতিক প্রতিপক্ষের সামনে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে কোনো শর্ত প্রত্যাখ্যান বা কৌশলগত দর-কষাকষির সুযোগ ঢাকার থাকে না। পরিণামে, পররাষ্ট্রনীতি তখন দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের বদলে ক্ষমতার তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক রক্ষাকবচে পরিণত হয়, যার দ্বিমুখী ফল হয়—বাইরে কৌশলগত অবিশ্বাস এবং ভেতরে তীব্র জন-্আস্থার সন্দেহ।
ব্লু-ইকোনমিতে কৌশলগত চাল
এই প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের সমান্তরালেই রয়েছে বাংলাদেশের এক বিশাল ভূ-কৌশলগত সম্পদ—বঙ্গোপসাগর। প্রফেসর এমএ রশীদের ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ এবং ২০১২ ও ২০১৪ সালের যথাক্রমে আইটিএলওএস (ITLOS) ও পিসিএ (PCA)-এর ঐতিহাসিক রায়ের যৌথ উপাত্ত স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ভারত ও মিয়ানমারের প্রস্তাবিত ‘ইকুইডিসট্যান্স’ (সমদূরত্ব) পদ্ধতিকে আইনি লড়াইয়ে পরাস্ত করে ‘ইকুইটি’ (ন্যায্যতা) মেথডের মাধ্যমে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরে ১,১৮,৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্রসীমা এবং ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন (EEZ) জয় করেছিল।
এই ঐতিহাসিক আইনি বিজয় ঢাকাকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে একটি প্রাকৃতিক ‘Pivot State’ বা অক্ষ-রাষ্ট্র এবং একটি স্বাধীন ‘Blue Economy Powerhouse’ হওয়ার সুবর্ণ সুযোগ করে দেয়। ২২ লাখ বর্গকিলোমিটারের এই বিশাল বঙ্গোপসাগর কেবল বাংলাদেশের জন্য নয়, বরং মলাক্কা প্রণালীর বিকল্প রুট খোঁজা চীন, নিরাপত্তা বলয় ধরে রাখতে চাওয়া ভারত এবং ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি (IPS) নিয়ে কাজ করা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের মূল লাইফলাইন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তাত্ত্বিক পরিভাষায়, বাংলাদেশ এখন পরাশক্তিদের তীব্র দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে একটি ক্লাসিক ‘হেজিং স্ট্র্যাটেজি’ (Hedging Strategy) বা ঝুঁকিমুক্ত ভারসাম্য নীতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। শ্রীলঙ্কার শীর্ষস্থানীয় থিংক-ট্যাংক লক্ষ্মণ কাদিরগামার ইনস্টিটিউট (LKI) ২০২৫-এর একটি তুলনামূলক ভূরাজনৈতিক গবেষণা অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ বর্তমানে ড. কুয়িক চিয়েন চ্যাং (Kuik Cheng-Chwee)-এর বিখ্যাত ‘থ্রি-ফিচার হেজিং ফ্রেমওয়ার্ক’ অনুসরণ করছে। এই নীতি অনুযায়ী, ঢাকা কোনো স্থায়ী বা কঠোর জোটে (Binding Alliance) না গিয়ে, পরাশক্তিদের সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে একই সাথে বিপরীতমুখী পদক্ষেপ (Mutually-counteracting measures) নিচ্ছে। বাংলাদেশ একদিকে বেইজিংয়ের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI)-এর মেগা প্রজেক্টের সাথে অর্থনৈতিকভাবে যুক্ত হচ্ছে, অন্যদিকে বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর গভীর নির্ভরতা বজায় রাখছে। তীব্র অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সত্ত্বেও, নেপাল, ভূটান, বা শ্রীলঙ্কার তুলনায় আন্তর্জাতিক দর-কষাকষিতে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতা—যা আইআর-এর ভাষায় ‘Small-State Agency’ (ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের স্বাধীন প্রভাব)—এখনও অনেক বেশি শক্তিশালী।
ত্রিমুখী ‘পোর্ট পলিটিক্স’
তবে এই ‘Small-State Agency’ এবং ‘Strategic Ambiguity’ (কৌশলগত অস্পষ্টতা)-র নীতিকে আন্তর্জাতিক দর-কষাকষির টেবিলে রূপান্তর করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বঙ্গোপসাগরের তীব্র অবকাঠামোগত রাজনীতি বা ‘ইনফ্রাস্ট্রাকচারাল জিও পলিটিক্স’। ভূ-রাজনৈতিক গবেষক শোহিনী বোসের সাম্প্রতিক গবেষণা (Ports and Geopolitics) অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগর এখন মূলত চীন ও ভারতের এক চরম ‘পোর্ট ডিপ্লোম্যাসি’ বা বন্দর কূটনীতির প্রধান আকর্ষণের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে ।
চীনের কাছে এই সমুদ্রসীমা কেবল তেল বা খনিজ সম্পদের উৎস নয়, বরং বেইজিংয়ের অন্যতম প্রধান ভূকৌশলগত দুর্বলতা—’মালাক্কা ডিলিমা’ (Malacca Dilemma)—দূর করার প্রধান ট্রানজিট রুট। চীনের প্রায় ৮০ শতাংশ জ্বালানি আমদানি যে অতি-ব্যস্ত ও সংকীর্ণ মলাক্কা প্রণালী দিয়ে হয়, তা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে মার্কিন নৌবাহিনী ব্লক করে দিতে পারে। এই ঝুঁকি এড়াতে বেইজিং তার বিশাল তহবিল এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কর্পোরেশনের (যেমন CHEC, CCCC এবং CMPH) একটি একীভূত ও সমন্বিত প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির জোরে শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা, মিয়ানমারের কিয়াউকপিউ (Kyaukphyu) থেকে শুরু করে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরের আধুনিকায়নে গভীর অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তার করতে চাইছে। এর মূল লক্ষ্য হলো স্থলবেষ্টিত পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ ইউনান ও তিব্বতকে সরাসরি ভারত মহাসাগরের সমুদ্র-লাইনের সাথে যুক্ত করা।
এর বিপরীতে, নয়া দিল্লি তীব্র অর্থনৈতিক ও রিসোর্স সীমাবদ্ধতা এবং এক ধরনের ‘কৌশলগত সতর্কতা’ (Strategic Caution)-র কারণে এই অঞ্চলের পোর্ট-ডিপ্লোম্যাসিতে কিছুটা ধীরগতির। তবে ভারত এখন তার ‘Neighborhood First’ এবং ‘Act East’ নীতির অধীনে তার নিজের পূর্ব উপকূল এবং আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের ভৌগোলিক সুবিধা কাজে লাগিয়ে একটি ‘কাউন্টার-ব্যালেন্স’ বা ভারসাম্য তৈরি করছে। সম্প্রতি ভারত তার সমুদ্র-নিরাপত্তা জোরদার করতে ‘MAHASAGAR’ (Mutual and Holistic Advancement of Security and Growth Across Regions) উদ্যোগ এবং মেরিটাইম ডোমেন অ্যাওয়ারনেস-কে জোরদার করেছে।
পরাশক্তিদের এই গভীর পোর্ট-পলিটিক্সের মাঝখানে পড়েই ঢাকাকে প্রতিবেশী ভারতের প্রচ্ছন্ন ‘ভূরাজনৈতিক ভেটো’ (Geopolitical Veto)-র চাপও সামলাতে হচ্ছে। ভারতের তীব্র কৌশলগত নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণেই, বেইজিংয়ের ১ বিলিয়ন ডলারের তিস্তা নদী ব্যাপক ব্যবস্থাপনা প্রকল্প এবং কক্সবাজারের গভীর সমুদ্রের সোনাদিয়া বন্দর (Sonadia Port) প্রকল্প থেকে ঢাকাকে তীব্র মার্কিন ও ভারতীয় ভূ-রাজনৈতিক চাপে পিছিয়ে আসতে হয়েছিল। পরবর্তীতে যা জাপানের (JICA) অর্থায়নে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরে রূপান্তরিত হয়। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বৈধতা এবং সমুদ্র-কূটনীতির সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপের এই জটিলতায় বাংলাদেশ এখন ভারতের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ব্লকেড ভাঙার বিকল্প উপায় খুঁজতে হচ্ছে।
একই সমীকরণ দেখা যায় রোহিঙ্গা সংকটের ক্ষেত্রে। ১২ লাখের বেশি আশ্রিত রোহিঙ্গার এই মানবিক সংকটে চীন ভূ-কৌশলগত কারণে মিয়ানমারের সামরিক জান্তাকে আন্তর্জাতিক আদালতে প্রচ্ছন্ন ভেটো দিয়ে রক্ষা করে আসছিল, এবং সংকট সমাধানে নিজেদের মধ্যস্থতায় একটি কৃত্রিম ‘ত্রিপক্ষীয় পাইলট প্রজেক্ট’ চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু মিয়ানমারের ভেতরের সাম্প্রতিক গৃহযুদ্ধ, জান্তা বাহিনীর উপর্যুপরি পতন এবং আরাকান আর্মির (AA) মাধ্যমে রাখাইন ও কিয়াউকপিউ বন্দরের চারপাশের অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা বেইজিংয়ের সেই পাইলট প্রজেক্টকে সম্পূর্ণ ব্যর্থ ও অকার্যকর করে দিয়েছে। ঢাকা তার ‘হেজিং’ কূটনীতির কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ব্যবহার করে কোনো পরাশক্তিকেই এই সংকট সমাধানে বাধ্য করার মতো diplomatic চাতুর্য (Diplomatic Agility) দেখানোর ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ছে।
বাণিজ্যিক ও ঋণগ্রস্ততার অসমতা
সামষ্টিক অর্থনীতির স্তরে বাংলাদেশের এই নতুন কৌশলগত পদক্ষেপ এক গভীর গাণিতিক অসমতা ও কাঠামোগত ঋণের ঝুঁকির মুখে দাঁড় করিয়েছে। এই আর্থিক গাণিতিক ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবেলার পদক্ষেপকে চারটি সুনির্দিষ্ট ভাগে ভাগ করা যায়:
পশ্চিমা বাণিজ্যিক লাইফলাইন এবং ২০২৯-এর ডেডলাইন
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) এবং ওটেক্সা (OTEXA)-এর জুলাই ২০২৬-এর সর্বশেষ উপাত্ত অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত অর্থবছর শেষে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (RMG) রপ্তানি এক শক্তিশালী অবস্থান বজায় রেখে মোট ৩৮.৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করেছে। এর মধ্যে একক বৃহত্তম বাজার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ৭.৭৪ বিলিয়ন ডলারে [OTEXA]।
সহজ গাণিতিক হিসাবে, বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির ঠিক পাঁচ ভাগের এক ভাগ (বা নিখুঁত ২০.০০%) একাই গ্রাস করে মার্কিন বাজার। এই ২০ শতাংশ মার্কিন বাজারের সাথে যখন যুক্তরাজ্যের ৪.৩৯ বিলিয়ন ডলার (১১.৩৪%) এবং কানাডার ১.৩৪ বিলিয়ন ডলার (৩.৪৬%) যোগ করা হয়, তখন এই তিন পশ্চিমা বাজার মিলেই মোট পোশাক রপ্তানির ৩৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। অপরদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) একাই বাংলাদেশের পোশাকের প্রায় অর্ধেক বা ৪৯.২৫ শতাংশ (১৯.০৬ বিলিয়ন ডলার) আমদানি করে। অর্থাৎ, বাংলাদেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রায় ৭০ শতাংশ (সুনির্দিষ্টভাবে ৬৯.২৫ শতাংশ) সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারের ওপর নির্ভরশীল, যা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির আসল লাইফলাইন।
দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন
কিন্তু ২০২৬ সালের এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের (LDC Graduation) পর, ২০২৯ সাল পরবর্তী ইউরোপীয় বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা টিকিয়ে রাখার মূল শর্তই হলো, ইইউ-এর অত্যন্ত কঠোর ‘জিএসপি প্লাস’ (GSP+) বিধিমালার অধীনে মৌলিক মানবাধিকার ও শ্রম অধিকারের ২৭টি আন্তর্জাতিক কনভেনশন পরিপালন নিশ্চিত করা। ঠিক এখানেই ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্ট (WJP) সূচকে মৌলিক অধিকারে বাংলাদেশের ১৩৩তম অবস্থান কেবল একটি আইনি বা নৈতিক বিপর্যয় নয়, বরং তা ২০২৯ সালের পর দেশের ১৯.০৬ বিলিয়ন ডলারের ইউরোপীয় রপ্তানি বাজার আক্ষরিক অর্থেই ধূলিসাৎ হয়ে যাওয়ার এক অবধারিত অর্থনৈতিক পূর্বাভাস।
চীনের সাথে গভীর বাণিজ্য অসমতা
পশ্চিমা বাজারের এই লাইফলাইনের বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়েছে চীনের সাথে ঢাকার এক প্রকট ও দানবীয় বাণিজ্যিক অসমতা। ওইসি ওয়ার্ল্ড (OEC World) গ্লোবাল ইকোনমিক ডেটা অনুযায়ী, চীন থেকে বাংলাদেশে বার্ষিক আমদানির পরিমাণ প্রায় ২২.৮০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর বিপরীতে বেইজিংয়ের বাজারে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি মাত্র ১.১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
সহজ হিসাবে, চীনের সাথে বাংলাদেশের বার্ষিক প্রকৃত বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২১.৬৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার—যা বাংলাদেশ যত দেশের সাথে বাণিজ্য করে তার মধ্যে একক দেশ হিসেবে সর্বোচ্চ। দুই দেশের এই কাঠামোগত ও প্রযুক্তিগত অসমতা আরও করুণভাবে ফুটে ওঠে যখন দেখা যায়— আমেরিকার বাজারে বিলিয়ন ডলারের উচ্চ-মূল্যের তৈরি পোশাক পাঠানো বাংলাদেশের চীনের বাজারে শীর্ষ রপ্তানি পণ্য হলো মাত্র ১১৮ মিলিয়ন ডলারের ‘প্রক্রিয়াজাত চুল’ (Processed Hair)। ‘দ্য অবজারভেটরি অব ইকোনমিক কমপ্লেক্সিটি’ (OEC) মানদণ্ডে ইকোনমিক কমপ্লেক্সিটি সূচকে (ECI) ১৩০টি দেশের মধ্যে ১২০তম (ECI Score: -১.১৯) অবস্থানে থাকা বাংলাদেশের মতো একটি প্রাথমিক ও কম উৎপাদন-জটিলতাসম্পন্ন অর্থনীতির পক্ষে বেইজিংয়ের এই বিশাল বাণিজ্যিক ও প্রযুক্তিগত আধিপত্যের চাপ সামলানো অত্যন্ত দুরূহ।
মেগা প্রজেক্টের ঋণফাঁদ ও কস্ট ওভার রান
বাংলাদেশের ঋণ-নির্ভর মেগা প্রজেক্টগুলোর প্রাক্কলিত লক্ষ্য এবং বাস্তব আয়ের মধ্যকার ব্যবধান এখন সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য আরেকটি গাণিতিক দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। সরকারের শ্বেতপত্র এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের আইএমইডি (IMED) এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ত্রুটিপূর্ণ পরিকল্পনা ও প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার কারণে দেশের প্রধান প্রধান মেগা প্রজেক্টগুলোর বাজেট নির্ধারিত মূল খরচের চেয়ে গড়ে ৭০.৩৪ শতাংশ বৃদ্ধি (Cost Overrun) পেয়েছে।
চীনের ঋণে নির্মিত কর্ণফুলি টানেলটি থেকে প্রতি মাসে গড়ে টোল আদায় হচ্ছে মাত্র ৩.৩৭ কোটি টাকা। অথচ আন্ডার-রিভার এই টানেলটি সচল রাখতে (সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ, ভেন্টিলেশন ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ) প্রতি মাসে রক্ষণাবেক্ষণ খরচই হচ্ছে ৬.৯৫ কোটি টাকা। সহজ হিসাবে, ঋণের বার্ষিক কিস্তির বিশাল অঙ্ক বাদ দিলেও, টানেলটি সচল রাখতে প্রতি মাসে সরাসরি ৩.৫৮ কোটি টাকা সরকারি তহবিল থেকে লোকসান দিতে হচ্ছে। কারণ এখানে প্রাক্কলিত লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ১৪% যানবাহন চলাচল করছে। একই সংকট দেখা যায় ৩৯,২৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ের ‘পদ্মা সেতু রেল লিংক’ প্রকল্পে। যেখানে, চীনের কাছ থেকে নেওয়া প্রায় ২১,০০০ কোটি টাকার চড়া সুদের বাণিজ্যিক ঋণের বার্ষিক কিস্তি সাধারণ ট্রেন ও যাত্রীদের টিকিট বিক্রির সরাসরি আয় দিয়ে শোধ করা গাণিতিকভাবে অসম্ভব।
সামষ্টিক অর্থনীতির প্রতিরোধ এবং আসন্ন ঋণ সংকট
ঋণ-নির্ভর মেগা প্রজেক্টগুলোর কারণে জাতীয় বাজেটের ওপর যে ঋণের পাহাড় তৈরি হয়েছে, তা মেটাতে হচ্ছে সরাসরি জনগণের ট্যাক্সের টাকা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে। চলতি ২০২৬ সালে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের দায় (Debt Service Liability) যেখানে ৪.৯৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, আগামী ২০২৭ সালে তা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৭.৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে [IMF]। এর ফলে বর্তমানে সরকারের মোট সংগৃহীত অভ্যন্তরীণ রাজস্বের প্রতি ৫ টাকার মধ্যে ১ টাকাই (নিখুঁত ২০%) চলে যাচ্ছে কেবল ঋণের সুদ মেটাতে (আসল টাকা বাদে), যা দেশের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিকে (ADP) মারাত্মকভাবে সংকুচিত করছে। সামষ্টিক অর্থনীতির পরিভাষায়, এই মেগা প্রজেক্টগুলোর ফলে সৃষ্ট পরোক্ষ জিডিপি (GDP) প্রবৃদ্ধি দিয়ে সরাসরি ‘বৈদেশিক ডলারের ঋণ’ তাৎক্ষণিকভাবে শোধ করা যায় না, যতক্ষণ না দেশের কর-জিডিপি অনুপাত এবং রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বৈপ্লবিকভাবে বৃদ্ধি পায়।
অবশ্য বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি এই মধ্যমেয়াদি ধাক্কা সামলানোর মতো কিছু অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। আইএমএফের BPM6 পদ্ধতি অনুযায়ী, এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (ACU) ১.৪৮ বিলিয়ন ডলারের আমদানি বিল পরিশোধের পরও বিশ্বব্যাংক থেকে ৬৬৭.১ মিলিয়ন ডলার এবং এডিবির ১ বিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা এবং সদ্য সমাপ্ত জুনে রেকর্ড ২.৮০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্সের কল্যাণে বাংলাদেশের প্রকৃত নিট আন্তর্জাতিক রিজার্ভ (NIR) ২৭.৯২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে (গ্রস রিজার্ভ ৩১.৭২ বিলিয়ন ডলার) সুসংহত রয়েছে। এই নিট রিজার্ভ দিয়ে বাংলাদেশের পরবর্তী সাড়ে ৪ মাসেরও বেশি সময়ের আমদানি ব্যয় অনায়াসে মেটানো সম্ভব, যা সাময়িকভাবে স্বস্তিদায়ক হলেও ২০২৭ সালের ৭.৬ বিলিয়ন ডলারের ঋণের ধাক্কা সামলানোর স্থায়ী সমাধান নয়।
আগামী দিনের কৌশলগত রোডম্যাপ ও রূপান্তর
বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। পুরোনো সাহায্যনির্ভর কূটনীতি থেকে বেরিয়ে এসে মর্যাদাভিত্তিক অংশীদারত্বের কূটনীতি গড়ার এই যাত্রায় ঢাকাকে কেবল কাগজে-কলমে ‘আমরা কারও বিরুদ্ধে নই, আমরা আমাদের পক্ষে’—এই স্লোগান দিলেই চলবে না। বাস্তবমুখী ভূ-রাজনৈতিক শক্তি হতে হলে ঢাকাকে তার ভূ-কৌশলগত ‘Pivot State’ অবস্থানের পূর্ণ সুবিধা নিতে হবে। এই লক্ষ্যে তিনটি সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রে দ্রুত গ্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক রোডম্যাপ (Grand Strategic Roadmap) বাস্তবায়ন করতে হবে :
দেশীয় জ্বালানি ও খনিজ নিরাপত্তা (বাপেক্স শক্তিশালীকরণ) : বঙ্গোপসাগরের বিশাল সামুদ্রিক ব্লকে (EEZ) নিজস্ব গ্যাস ও খনিজ অনুসন্ধান সক্ষমতা বাড়াতে বাপেক্স (BAPEX)-কে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী করতে হবে। এটি পরাশক্তিদের ওপর জ্বালানি ও ক্যাপিটাল নির্ভরতা কমাবে এবং সমুদ্র-কূটনীতিকে টেকসই করবে।
বিনিয়োগের বহুমাত্রিকতা ও বার্গেনিং চিপস: ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত ‘ভারত পোর্টস গ্লোবাল’ (BPG) কিংবা আদানির মতো ব্যক্তিগত মেরিটাইম ইনভেস্টমেন্টকে দেশের সার্বভৌম স্বার্থে অন্যতম ‘বার্গেনিং চিপস’ (Bargaining Chips) হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। মংলা, চট্টগ্রাম ও মাতারবাড়ীর মতো কৌশলগত টার্মিনালগুলোর বাণিজ্যিক ব্যবহার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট পরাশক্তির একচেটিয়া আধিপত্য রোধে এই বহুমাত্রিক বিনিয়োগকারীদের সমান্তরালে ব্যবহার করার কূটনৈতিক চাতুর্য দেখাতে হবে।
আঞ্চলিক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও ‘বে অব বেঙ্গল কমিশন’ : বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও নীল অর্থনীতিকে সুসংহত করতে একটি স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত ‘বে অব বেঙ্গল কমিশন’ (Bay of Bengal Commission) গঠনের উদ্যোগ নিতে হবে। একই সাথে বিমসটেক (BIMSTEC) কিংবা আইওআরএ (IORA)-এর মতো আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মগুলোতে ঢাকাকে প্রথাগত নিষ্ক্রিয় অবস্থান ভেঙে সক্রিয় নেতৃত্ব গ্রহণ করতে হবে।
কৌশলগত ফাঁদ বনাম সার্বভৌম স্বায়ত্তশাসন
ঢাকাকে শেষ পর্যন্ত বুঝতে হবে— ওয়াশিংটন, বেইজিং বা দিল্লির কূটনৈতিক টেবিলে কণ্ঠস্বরের দৃঢ়তা কোনো উচ্চকণ্ঠ যৌথ বিবৃতিতে অর্জন হয় না; তা অর্জিত হয় দেশের ভেতরের মানুষের আস্থার মাধ্যমে। রবার্ট পুটনামের ‘টু-লেভেল গেম’ এবং জেমস রোজেনাওয়ের ‘ডমেস্টিক-ফরেন পলিসি নেক্সাস’-এর মূল শিক্ষা এটাই যে, অভ্যন্তরীণ স্তরে (Level 2) রাজনৈতিক বৈধতা, নাগরিক অধিকার এবং আইনের শাসন পুনর্গঠন না করে যদি এই তীব্র অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যহীনতা বজায় রাখা হয়, তবে পরাশক্তিদের প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের এই ‘হেজিং’ কূটনীতি শেষ পর্যন্ত একটি বড়ো বৈশ্বিক কৌশলগত ফাঁদে (Strategic Trap) পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে।
অভ্যন্তরীণ প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষত নিরাময়, মৌলিক অধিকারের সূচকে মর্যাদাপূর্ণ উত্থান এবং সুশাসনের মজবুত ভিত্তিই কেবল আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক দাবার বোর্ডে ঢাকার যোগ্য ‘Small-State Agency’ ও প্রকৃত কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন (Strategic Autonomy) নিশ্চিত করতে পারে। পরনির্ভর কূটনীতির অবসান ঘটিয়ে একটি প্রকৃত, সার্বভৌম ও টেকসই রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার এটাই বাংলাদেশের জন্য চূড়ান্ত সময়।