কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি :
কুড়িগ্রামে বন্যার পানি কমতে না কমতেই শুরু হয়েছে নতুন দুর্যোগ। জেলার নাগেশ্বরী উপজেলায় দুধকুমার নদের তীব্র ভাঙনে গত এক সপ্তাহে অন্তত ২০টি বসতবাড়ি, অসংখ্য ফসলি জমি, সুপারি বাগান ও বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙনের তীব্রতায় নদীতীরবর্তী মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনেক পরিবার ঘরবাড়ি খুলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেও অনেকেই শেষ সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন।
রোববার (৫ জুলাই) সরেজমিনে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বন্যার পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে দুধকুমার নদের প্রবল স্রোতে নদীর তীর ভাঙতে শুরু করেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নাগেশ্বরী উপজেলার কেদারের মণ্ডলপাড়া, কচাকাটার ধনিরামপুর, মধ্য ধনিরামপুর, বল্লভেরখাসের মাঝিপাড়া, রামদত্ত মাঝিপাড়া, ইসলামপুর, রায়গঞ্জের হাজীর মোড় বাজার এলাকা, বেরুবাড়ীর খেলারভিটা, খামার নকুলা, বামনডাঙ্গার মুড়িয়াহাট, তেলিয়ানীর কুটি, মালিয়ানীসহ বেশ কয়েকটি এলাকা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, মাত্র পাঁচ থেকে ছয় দিনের ব্যবধানে দুধকুমার নদ রায়গঞ্জ রতনপুর হাজীপাড়া সংলগ্ন আন্ধারীঝাড় ইউনিয়নের কুটিপাড়া ও কমলারকুটি গ্রামের প্রায় ২০টি বসতবাড়ি গিলে ফেলেছে। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে মো. আব্দুল মোত্তালেব, মো. আব্দুল খালেক, মো. আমজাদ হোসেন, মো. আশরাফ আলী, মো. শহীদ মিয়া, মো. আব্দুর রশিদ, মো. আশরাফুল আলম, মো. সাইফুর রহমান, মো. রশিদুল ইসলাম, মো. পন্টিত আলী, মো. জালাল হোসেন, মো. আব্দুল হক, মো. চাঁদ মিয়া, মো. সাদ্দাম আলী, মো. খলিল মিয়া, মো. আয়নাল হক, মো. আমাল উদ্দিন, মো. মজাহার আলী, মো. মোজ্জাম্মেল হক, মো. কয়েদ ভান, মোছা. আমিনা বেগমসহ অনেকের ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও ফলের বাগান।
ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, ভাঙনের গতি এতটাই ভয়াবহ যে অনেকেই ঘর খুলে সরিয়ে নেওয়ার আগেই নদীর গর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে সবকিছু। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিচ্ছেন। তবে অধিকাংশ মানুষেরই মাথা গোঁজার নিরাপদ কোনো জায়গা নেই।
কমলারকুটি গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দা মো. আব্দুল মোত্তালেব বলেন, “দুধকুমারের ভাঙনে আমার সব চইলা গেল। সুপারির বাগান, ফসলি জমি আগেই খাইছে নদে। এবারে শেষ সম্বল ভিটাটাও চইলা গেল। এখন কই যাইয়া থাকুম, কী খাইয়া বাঁচুম—আল্লাহই জানে।”
কুটিপাড়া গ্রামের আমিনা বেগম বলেন, “স্বামীর রেখে যাওয়া শেষ ভিটাটাও নদীতে চলে গেছে। এখন অন্যের জায়গায় কোনো রকমে ঘর তুলে আছি। আল্লাহ ছাড়া আমাদের দেখার কেউ নেই।”
দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন
স্থানীয় বাসিন্দা মো. রশিদ মণ্ডল, মো. জিয়াউর রহমান, মো. শামছুল হক, মো. জাকিউল ইসলাম ও মো. আবুল কাশেম বলেন, বন্যার ধাক্কা কাটতে না কাটতেই ভয়াবহ ভাঙন শুরু হওয়ায় তারা চরম উদ্বেগে রয়েছেন। দ্রুত স্থায়ী নদীশাসনের মাধ্যমে ভাঙন প্রতিরোধের দাবি জানান তারা।
রায়গঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, “বন্যার পানি নামতেই দুধকুমার নদের ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিষয়টি জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানানো হলেও এখন পর্যন্ত কেউ সরেজমিনে আসেনি।”
ভূরুঙ্গামারী উপজেলার বামনডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আসাদুজ্জামান রনি জানান, বন্যার পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ইউনিয়নেরও বেশ কয়েকটি এলাকায় নদীভাঙন শুরু হয়েছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
এদিকে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিবুল হাসান বলেন, ভাঙনের বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। খুব দ্রুত সরেজমিনে পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে দুধকুমারের অব্যাহত ভাঙনে আরও বহু পরিবার গৃহহীন হবে এবং বিস্তীর্ণ ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে। তাই স্থায়ী নদীশাসন প্রকল্প গ্রহণের পাশাপাশি জরুরি ভিত্তিতে ভাঙনরোধী ব্যবস্থা বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন নদীপাড়ের মানুষ।

