নাটোর প্রতিনিধি :
নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের গড়মাটি গ্রামে দীর্ঘদিন ধরে ব্যতিক্রমী এক সামাজিক রীতি প্রচলিত রয়েছে। সেখানে বিয়ের পর অনেক জামাই স্ত্রী-সন্তান নিয়ে শ্বশুরবাড়ির গ্রামেই স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। বর্তমানে গ্রামটিতে প্রায় ৪০০ জামাইয়ের বসবাস রয়েছে। এ কারণে স্থানীয়দের কাছে গ্রামটি ‘জামাইদের গ্রাম’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, প্রায় ৫০ বছর ধরে এ রীতি চলে আসছে। দেশের অধিকাংশ এলাকায় বিয়ের পর মেয়েরা স্বামীর বাড়িতে বসবাস করলেও গড়মাটি গ্রামে এর উল্টো চিত্র দেখা যায়।
ইউনিয়ন পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, গোপালপুর ইউনিয়নে মোট ১৩টি গ্রাম রয়েছে। এর মধ্যে আটটি গ্রামে নারীর সংখ্যা পুরুষের তুলনায় বেশি। গড়মাটি গ্রামের মোট জনসংখ্যা ৬ হাজার ৭৫৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৩ হাজার ১২০ জন এবং নারী ৩ হাজার ৬৩৬ জন।
গ্রামটিতে একটি কলেজ, তিনটি উচ্চবিদ্যালয়, আটটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১০টি মাদরাসা, ৪৫টি মসজিদ, ১১টি মন্দির ও একটি গির্জা রয়েছে। মুসলিম, হিন্দু ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষ সম্প্রীতির সঙ্গে বসবাস করছেন। পাশাপাশি প্রবাসী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, কৃষক, মৎস্যজীবীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের বসবাস রয়েছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেক পরিবারের প্রথম সন্তান মেয়ে হওয়ায় বাবা-মায়ের সঙ্গে মেয়েদের সম্পর্ক তুলনামূলক বেশি ঘনিষ্ঠ থাকে। অন্যদিকে অনেক ছেলে বিয়ের পর আলাদা সংসার গড়ে তোলায় মেয়েদের প্রতিই অভিভাবকদের নির্ভরতা বাড়ে। ফলে মেয়েদের বাবার বাড়ির জমিতে বাড়ি নির্মাণ করে স্বামী-স্ত্রী বসবাসের প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন
স্থানীয় ইউপি সদস্য নূরজাহান খাতুন বলেন, অনেক মেয়ের স্বামী বিদেশে থাকেন। সেসব ক্ষেত্রে মেয়েরা বাবার বাড়িতে থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। স্বামীরা দেশে ফিরে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে শ্বশুরের দেওয়া জমিতে বাড়ি নির্মাণ করে বসবাস শুরু করেন। আবার অনেক নারী শ্বশুরবাড়ির নানা সমস্যার কারণে স্বামীকে নিয়ে বাবার দেওয়া জমিতে নতুন সংসার গড়ে তুলেছেন। এছাড়া এলাকায় পেঁয়াজ, রসুনসহ লাভজনক কৃষিপণ্যের আবাদ হওয়ায় কৃষিজীবী পরিবারগুলোরও সেখানে বসবাসে আগ্রহ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, গ্রামটিতে প্রচলিত অর্থে ‘ঘরজামাই’ খুবই কম। অধিকাংশ জামাই নিজস্ব বাড়ি নির্মাণ করে আলাদাভাবে বসবাস করছেন। তাদের প্রতি স্থানীয়দের দৃষ্টিভঙ্গিও ইতিবাচক। কেউ তাদের কটাক্ষ করেন না; বরং আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা জানান, গ্রামে প্রায় ৪০০ জামাই থাকলেও অধিকাংশই নিজেদের বাড়িতে বসবাস করেন। তাদের সন্তান-সন্ততিরাও এই গ্রামকেই নিজেদের স্থায়ী আবাস হিসেবে মনে করে।
ইউপি সদস্য জামিরুল ইসলাম জামে বলেন, গড়মাটি গ্রামের মানুষ শান্তিপ্রিয় ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করেন। এখানে শ্বশুর-জামাই, আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সহযোগিতার সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে বজায় রয়েছে।

