কুড়িগ্রামের এক বিদ্যালয়ে চার শিক্ষার্থী, মাসে ব্যয় ৩ লাখ টাকা

কুড়িগ্রামের এক বিদ্যালয়ে নথিতে ১১০ শিক্ষার্থী, উপস্থিত মাত্র ৪ জন

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি :

 

সরকারি নথিতে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১১০ জন, কর্মরত রয়েছেন আটজন শিক্ষক ও একজন অফিস সহকারী। প্রতি মাসে বেতন-ভাতাসহ ব্যয় হয় প্রায় তিন লাখ টাকা।

অথচ বাস্তবে শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত পাওয়া গেছে মাত্র দুজন শিক্ষার্থী। এমন চিত্র দেখা গেছে কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার নাজিমখান ইউনিয়নের তালতলায় অবস্থিত বিদ্যানন্দ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে।

ঈদুল আজহার ছুটির আগে টানা দুই দিন সরেজমিনে গিয়ে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হয়। সেখানে দেখা যায়, একটি সরকারি স্বীকৃত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলেও শ্রেণিকক্ষ প্রায় ফাঁকা। ফলে বিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নিয়মিত উপস্থিত থাকেন না। কেউ দেরিতে আসেন, আবার কেউ নির্ধারিত সময়ের আগেই চলে যান। অনেক সময় পাঠদানের পরিবর্তে আড্ডা ও গল্পগুজবেই সময় কাটে। পরিদর্শনের দুই দিনের মধ্যে মাত্র এক দিন প্রধান শিক্ষক লোকনাথ বর্মণকে বিদ্যালয়ে পাওয়া গেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার না করলেও শিক্ষার্থী সংকটের পেছনে ভিন্ন কারণ দেখিয়েছেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক।

তিনি বলেন, বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত দুর্বলতা, আশপাশের নুরানী মাদ্রাসার প্রভাব এবং অভিভাবকদের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি আগ্রহের কারণে শিক্ষার্থী সংখ্যা কমেছে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লোকনাথ বর্মণের দাবি, বিদ্যালয়ে বর্তমানে ১০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে, যার মধ্যে নিয়মিত উপস্থিত থাকে ছয়জন। তবে উপবৃত্তি সুবিধাভোগী শিক্ষার্থীর সংখ্যা জানতে চাইলে তিনি ১২ থেকে ১৩ জনের কথা বলেন, যা বিদ্যালয়ে উপস্থিত শিক্ষার্থীর সংখ্যার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে এখানে আটজন শিক্ষক কর্মরত থাকলেও আরও চারটি শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে। পাশাপাশি গত দুই বছর ধরে বিদ্যালয়টির পরিচালনা কমিটিও নেই।

শিক্ষার্থীদের বক্তব্যেও উঠে এসেছে বিদ্যালয়ের বাস্তব চিত্র। অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মোছাঃ নিলুফা আক্তার জানায়, তাদের শ্রেণিতে মোট চারজন শিক্ষার্থী রয়েছে। সপ্তম শ্রেণিতে কোনো শিক্ষার্থী নেই। একই শ্রেণির আরেক শিক্ষার্থী মোঃ বাঁধন হাসান জানায়, মোট শিক্ষার্থী ছয়জন হলেও শিক্ষকরা নিয়মিত ক্লাস নেন না।

ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী মোঃ নিরব হোসেনের ভাষ্য, তার শ্রেণিতে সে এবং মোঃ সাব্বির আহমেদ নামে আরেকজন শিক্ষার্থী ছাড়া আর কেউ নেই। সপ্তম শ্রেণিতে কোনো শিক্ষার্থী না থাকার বিষয়টিও সে নিশ্চিত করেছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে শৃঙ্খলা ও তদারকির অভাব রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা মোঃ রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটিতে শুরু থেকেই শিক্ষার্থী সংকট ছিল। কিন্তু পরিস্থিতি এখন আরও খারাপ হয়েছে।’

স্থানীয় বাসিন্দা মোছাঃ পারুল বেগমের অভিযোগ, বিভিন্ন সময় মনিটরিং বা পরিদর্শনের সময় বাইরের শিক্ষার্থী এনে উপস্থিতি দেখানো হয়। অন্যদিকে মোস্তাফিজার রহমান জানান, নিয়মিত পাঠদান না হওয়ায় তিনি তার নাতিকে বিদ্যালয় থেকে সরিয়ে অন্য একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করিয়েছেন।

রাজারহাট উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যালয়টির ষষ্ঠ শ্রেণিতে ৪০, সপ্তম শ্রেণিতে ৪০ এবং অষ্টম শ্রেণিতে ৩০ জন শিক্ষার্থীর নাম নথিভুক্ত রয়েছে। অর্থাৎ সরকারি হিসাবে মোট শিক্ষার্থী ১১০ জন। কিন্তু সরেজমিনে দুই দিনে মোট উপস্থিতি পাওয়া গেছে মাত্র চারজন।

নথিভুক্ত শিক্ষার্থী ও বাস্তব উপস্থিতির মধ্যে এত বড় ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে স্থানীয়দের মধ্যে। তারা বিদ্যালয়ের এই বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে রাজারহাট উপজেলা অতিরিক্ত মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ কামরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি এখনো বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করিনি। খুব শিগগিরই প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here