সংগ্রাম আর ত্যাগের স্বীকৃতি পেলেন লালপুরের কামনা রানী ঘোষ, ‘রত্নগর্ভা মা ২০২৫’ সম্মাননা অর্জন

নাটোর প্রতিনিধি :

 

নাটোরের লালপুর উপজেলার কামনা রানী ঘোষ ‘রত্নগর্ভা মা ২০২৫’ সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ ও সন্তানদের সুশিক্ষিত করে প্রতিষ্ঠিত করার স্বীকৃতি হিসেবে তাকে এ সম্মাননা দেওয়া হয়।

সম্মাননা পাওয়ার পর বৃহস্পতিবার (১৪ মে ২০২৬) কামনা রানী ঘোষ অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, মা হিসেবে এটি পরম প্রাপ্তি। তবে ছেলেমেয়েরা প্রকৃত মানুষ না হলে, কোনো স্বীকৃতিতেই সন্তুষ্টি এনে দিতে পারে না।

ঢাকা ক্লাবের স্যামসন এইচ চৌধুরী মিলনায়তনে গত সোমবার (১১ মে ২০২৬) ‘রত্নগর্ভা মা ২০২৫’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. সবুর খান, আজাদ প্রোডাক্টসের স্বত্বাধিকারী আবুল কালাম আজাদ, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ফরিদ আহমেদ রত্নগর্ভা মাদের হাতে সম্মাননা স্মারক ও সার্টিফিকেট তুলে দেন। অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন সংগীতশিল্পী মিমি আলাউদ্দীন ও রবি চৌধুরী।

জীবনে নানা সমস্যা মোকাবিলা করে সন্তানকে সুশিক্ষিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত করার স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৩ সাল থেকে আজাদ প্রোডাক্টস এ সম্মাননা দিচ্ছে।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, মহীয়শী নারী কামনা রানী ঘোষ ১৯৬০ সালে গ্রামে এক প্রত্যন্ত গ্রাম্য পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। উপজেলার উপজেলার চংধুপইল ইউনিয়নের আব্দুলপুরের করিমপুর গ্রামের বাবা নিতাই চন্দ্র ঘোষ ও মা চারুবালা ঘোষের একমাত্র সন্তান হওয়ার কারণে খুব আদরেই বেড়ে উঠেন। প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও শিক্ষাজীবনে বেশিদুর এগোতে পারেননি।

তখনকার সমাজ ব্যবস্থা ছিল নারীদের শিক্ষার বিরুদ্ধে। আর প্রত্যন্ত অঞ্চলে একমাত্র মেয়েকে নিয়ে মা-বাবা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতেন। তাই মাত্র ১৪ বছর বয়সে রাজশাহীর আড়ানীর নুরনগর ঘোষপাড়া গ্রামের সুবোধ চন্দ্র ঘোষের সঙ্গে বিয়ে দেন। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলাতে মাস্টার্স পাশ পরেও চাকরী না করে একমাত্র সন্তানের জামাই হিসেবে শ্বশুরবাড়িতে সংসার দেখাশুনা শুরু করেন।

দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন

বিয়ের কিছুদিন পরই কোল জুড়ে আসে একে একে পাঁচ সন্তান। কৃষিনির্ভর পরিবার হওয়াতে অর্থনৈতিক সংকট থাকার কারণে স্বামী পক্ষে একসঙ্গে পাঁচ সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালানো খুব কঠিন ছিল। তারপরও স্বামী সুবোধ চন্দ্র ঘোষ সন্তানদের লেখাপড়া করানোর ইচ্ছা পুরণে সমর্থন করেছিলেন। সেই সময়ের জীবনযাত্রা এতটাই সেকেলে ছিল যে বিদ্যুৎ বা গ্যাস সিলিন্ডরের কোনো ব্যবস্থাই ছিল না। যখন হারিকেন জ্বালিয়ে রান্না করতেন তখন সন্তানদেরও পড়াতে বসাতেন। ছেলেমেয়েরা মায়ের নির্দেশ মতো পড়াশোনা করতেন। মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত তিনিই ছিলেন সন্তানদের প্রধান শিক্ষক। আর সবকটি সন্তানই ছিলেন সেই স্কুলের সেরা শিক্ষার্থী।

ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার ক্ষেত্রে দারিদ্রকে উপেক্ষা করে নিজের সোনার গয়না বিক্রি করে সন্তানদের লেখাপড়া চালিয়ে গেছেন। প্রথম সন্তান সুব্রত কুমার ঘোষ, বালিতিতা ইসলামপুর আশরাফুল উলুম ফাজিল মাদ্রাসায় প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। দ্বিতীয় সন্তান দেব্রত কুমার ঘোষ, রুইগাড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। তৃতীয় সন্তান সুপ্রীতি রানী ঘোষ, (এমবিবিএস, ডিজিও, এফসিপিএস-গাইনী), বিআইএইচএস জেনারেল হাসপাতাল, ঢাকায় সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। চতুর্থ সন্তান সুদীপ্ত কুমার ঘোষ, বিএসসি (ইঞ্জিনিয়ারিং), রুয়েট, ৩৬তম বিসিএস (তথ্য), বগুড়ার কাহালু বাংলাদেশ বেতারের এইচপিটি-৫ এ ডেপুটি স্টেশন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত। পঞ্চম সন্তান দেবাশীষ ঘোষ, এমবিবিএস, সিসিডি, পিজিটি (মেডিসিন), সিনিয়র রেজিস্ট্রার ও ইনচার্জ, ইমার্জেন্সি বিভাগ, সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে কর্মরত।

লালপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জুলহাস হোসেন সৌরভ বলেন, ‘রত্নগর্ভা’ মায়ের সবকটি সন্তানই উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে মায়ের স্বপ্ন পূরণ করেছেন। সমাজে একজন সফল মানুষ হয়ে ওঠার জন্য মায়ের অসামান্য সমর্থন ও ধৈর্যের জন্য সন্তানেরা মায়ের কাছে সবসময় কৃতজ্ঞ। মায়ের জ্ঞান, মর্যাদা, অন্তর্দৃষ্টি, নৈতিকতা এবং সততাই সন্তানের জীবনের মূল শক্তি। এমন একজন মাকে ‘রত্নগর্ভা’ সম্মানা পাওয়ায় আমরা গর্বিত। আমি তাঁর সুদীর্ঘায়ু কামনা করছি।

এই বাংলা/এমএস

টপিক 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here