কুড়িগ্রামে গবাদিপশুর মধ্যে খুরারোগের প্রাদুর্ভাব, মারা গেছে অন্তত ১০ গরু

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি :

কুড়িগ্রাম জেলায় গবাদি পশুর মধ্যে খুরারোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে আক্রান্ত অন্তত ১০টি গরু মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা, রাজারহাট উপজেলা এবং ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় শত শত গবাদি পশুর মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে বলে খামারি, এলাকাবাসী এবং প্রাণিসম্পদ বিভাগ সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ অবস্থায় কোরবানির ঈদের আগেই জেলাজুড়ে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

কোরবানির ঈদের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে খুরারোগের সংক্রমণ খামারি ও গবাদি পশু মালিকদের দুশ্চিন্তায় ফেলেছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় আক্রান্ত এলাকায় মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করেছে প্রাণিসম্পদ বিভাগ। তবে ভাইরাসবাহিত রোগ হওয়ায় সংক্রমণ ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না।

কুড়িগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্যমতে, কোরবানি ঈদ সামনে রেখে কুড়িগ্রাম জেলায় এ বছর ১ লাখ ১৬ হাজার গরু এবং ১ লাখ ৮০ হাজার ছাগল-ভেড়া প্রস্তুত করা হয়েছে।

কুড়িগ্রাম জেলার সদর উপজেলার কাঁঠালবাড়ী ইউনিয়নের হরিশ্বর জোৎগোবরধন এলাকায় খুরারোগে আক্রান্ত হয়ে গত এক সপ্তাহে একটি গর্ভবতী গাভিসহ দুটি গরু মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ওই এলাকায় অন্তত ২০ থেকে ২৫ টি গরু খুরায় আক্রান্ত হয়েছে।

কুড়িগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ বলছে, কুড়িগ্রাম জেলার তিনটি উপজেলায় অন্তত ৩০০ গরু খুরারোগে আক্রান্ত হয়েছে। ভাইরাসজনিত রোগ হওয়ায় সহসাই সংক্রমণ ঠেকানো যাচ্ছে না। জেলার অন্যান্য উপজেলায়ও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে।

কুড়িগ্রাম জেলার সদর উপজেলার কাঁঠালবাড়ী ইউনিয়নের জোৎগোবরধন গ্রামের মোঃ আলতাফ হোসেন বলেন, ‘আমার ফ্রিজিয়ান জাতের একটি গাভি খুরারোগে আক্রান্ত হয়ে গত সপ্তাহে মারা গেছে। গাভিটি গর্ভবতী ছিল। চিকিৎসা করেও কোনও লাভ হয় নাই। আমার অন্তত দেড় লাখ টাকা লোকসান হলো। গ্রামে আরও গরু খুরায় আক্রান্ত হয়েছে।’

এই ইউনিয়নের হরিশ্বর গ্রামের বাসিন্দা কৃষক মোঃ আবু হোসেন বলেন, ‘প্রতি বছর ঈদে বিক্রির জন্য দুই-একটা গরু পালন করি। গরু বিক্রির টাকায় সংসারের প্রয়োজন মেটাই। কিন্তু এবার যখন গরু বিক্রির সময় হলো তখনই খুরারোগে আমার সব শেষ করে দিলো। গরুটা খুব অসুস্থ। বিক্রিতো করতে পারবো না, বাঁচবে কিনা তাও জানি না।’

দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন

গরুর খুরারোগের ভুক্তভোগী ওই গ্রামের আরেক ক্ষুদ্র খামারি মোঃ একরামুল হক। তার খামারে তিনটি গরু খুরারোগে আক্রান্ত। তার মধ্যে দুগ্ধবতী একটি গাভির জিহ্বায় খুরায় আক্রান্ত হয়ে খসে গেছে। দুশ্চিন্তায় অন্ধকার দেখছেন মোঃ একরামুল হক। তিনি বলেন, ‘খামারের গরুর দুধ বিক্রি করে আমার আয় হয়। এখন সেই আয় বন্ধ। চিকিৎসা করাচ্ছি। কিন্তু গরু-বাছুর বাঁচবে কি না সেটাই বুঝতে পারছি না।’

কুড়িগ্রাম জেলার সদর উপজেলার বেলগাছা ইউনিয়নের পল্লী প্রাণী চিকিৎসক মোঃ আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘প্রচুর গরু খুরারোগে আক্রান্ত হচ্ছে। চিকিৎসায় সুস্থও হচ্ছে। তবে ঈদের আগে এই রোগের সংক্রমণ খামারি ও গৃহস্থদের লোকসানের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে রোগাক্রান্ত গরু বিক্রি করতে পারবে না। অপর দিকে সুস্থ হওয়া গরুর স্বাস্থ্যহানি হওয়ায় দাম কম পাবে।’

রোগ ছড়ানোর কারণ উল্লেখ করে এই পল্লী প্রাণী চিকিৎসক বলেন, ‘রোগপ্রতিরোধে সরকারিভাবে পর্যাপ্ত ভ্যাকসিনেশন হয়নি। আবার বাজারে ভ্যাকসিনের দাম বেশি হওয়ায় রোগাক্রান্ত হওয়ার আগে গরুর মালিকরা ভ্যাকসিন কিনতে চান না। ফলে রোগ ছড়িয়ে পড়ে। তবে এবার চিকিৎসায় আক্রান্ত গরু সুস্থ হওয়ার হার বেশি।’

কুড়িগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ বলছে, খুরারোগ ভাইরাসবাহিত। দ্রুত এক গরু হতে আরেক গরুতে ছড়িয়ে পড়ে। গত কয়েক সপ্তাহে কুড়িগ্রাম জেলায় প্রায় আড়াই থেকে ৩০০ গরু আক্রান্ত হয়েছে। কিছু মারাও গেছে। আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। এ অবস্থায় বিপর্যয়ের আশঙ্কা না করলেও চিকিৎসার পাশাপাশি সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে প্রাণিসম্পদ বিভাগ।

কুড়িগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ মোঃ হাবিবুর রহমান বলেন, ‘তিনটি উপজেলায় সংক্রমণের মাত্রা বেশি হলেও অন্য উপজেলাতেও রোগ দেখা যাচ্ছে। এ পর্যন্ত শুধু গরুর মধ্যে এই রোগ ছড়িয়েছে। আমরা মাঠপর্যায়ে থেকে আক্রান্ত পশুর চিকিৎসা দিচ্ছি।’

চিকিৎসা ও প্রতিরোধের উপায় নিয়ে এই প্রাণী চিকিৎসক বলেন, ‘রোগ প্রতিরোধে রিং ভ্যাকসিনেশন অর্থাৎ আক্রান্ত এলাকার চারপাশে সকল গবাদিপশুকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনতে হয়। এই রোগের ভ্যাকসিন কিছুটা ব্যয়বহুল। সরকারিভাবে ভ্যাকসিন সরবরাহ থাকলেও পরিমাণ কম। আবার বাজারে দাম একটু বেশি। রোগাক্রান্ত পশুকে অন্য পশু থেকে আলাদা করে চিকিৎসা দিতে হবে। সর্বোপরি গবাদি পশু পালনকারীদের সচেতনতা বাড়াতে হবে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’

কুড়িগ্রাম জেলার উ‌লিপু‌র উপজেলার চরাঞ্চ‌লেও গবা‌দি পশুর ম‌ধ্যে খুরারো‌গের সংক্রমণ দেখা দি‌য়ে‌ছে ব‌লে জা‌নি‌য়ে‌ছেন কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপ‌জেলার বেগমগঞ্জ ইউ‌নিয়‌নের পল্লি প্রাণী চি‌কিৎসক মোঃ স‌ফিকুল ইসলাম। তি‌নি ব‌লেন, ‘মোল্লারহাট এলাকাসহ ব্রহ্মপুত্র চরাঞ্চ‌লে ব্যাপক হা‌রে খুরারোগ দেখা দি‌য়ে‌ছে।

মঙ্গলবারও অন্তত ৩০টি আক্রান্ত গরু দে‌খে‌ছি। বি‌শেষ ক‌রে ঈদ উপল‌ক্ষে মোটাতাজা করা গরুগু‌লো আক্রান্ত হওয়ায় পালনকারীরা অ‌নেক ক্ষ‌তির মু‌খে প‌ড়ে‌ছেন।’

এই বাংলা/এমএস

টপিক 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here