চরম শিডিউল বিপর্যয়ে ভোগান্তিতে কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসের যাত্রীরা

শিডিউল বিপর্যয়ই যেন কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসের দৈনন্দিন নিয়তি

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি :

 

উত্তরাঞ্চলের বহুল কাঙ্ক্ষিত আন্তঃনগর ট্রেন ‘কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস’। দীর্ঘদিন ধরে ট্রেনটির শিডিউল বিপর্যয়ের কারণে প্রতিনয়ত ভোগান্তিতে পড়ছেন যাত্রীরা। প্রতিদিন গড়ে এক থেকে সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত বিলম্বে চলাচল করায় যাত্রীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এছাড়া সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারায় ট্রেনটির প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলছেন এ অঞ্চলের মানুষ।

কুড়িগ্রাম রেলস্টেশন ঘুরে ও যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নির্ধারিত সময়ে খুব কমদিনই স্টেশন ত্যাগ করে কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস। একইভাবে গন্তব্যে পৌঁছাতেও নিয়মিত বিলম্ব হচ্ছে। এতে বিশেষ করে কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী ও রোগীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন। জরুরি কাজ, পরীক্ষা বা চিকিৎসার প্রয়োজনে যাত্রা করে অনেকে সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হচ্ছেন।

রেলওয়ের একটি সূত্র জানায়, কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসের জন্য নির্ধারিত ইঞ্জিনগুলোর সক্ষমতা কমে যাওয়ায় ট্রেনটি স্বাভাবিক গতি বজায় রাখতে পারছে না। পুরোনো ইঞ্জিন দিয়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে গিয়ে মাঝপথেই গতি কমে যায়। ফলে সময়সূচি ধরে রাখা সম্ভব হয় না ও বিলম্ব বাড়তে থাকে।

কুড়িগ্রাম রেল স্টেশন সূত্রে জানা গেছে, কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস কুড়িগ্রাম প্ল্যাটফর্মে পৌঁছানোর কথা সকাল ৫টা ১০ মিনিটে এবং ঢাকার পথে রওনা হওয়ার কথা ৭টা ১০ মিনিটে। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ২০ এপ্রিল ট্রেনটি সকাল ৫টা ১০ মিনিটে পৌঁছানোর কথা থাকলেও পৌঁছায় বেলা সাড়ে ১১টায়। পরে সেটি দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে ছেড়ে যায়। এদিন ট্রেনটির বিলম্ব হয় ৬ ঘণ্টা ১০ মিনিট। পরবর্তী দিনগুলোর চিত্রও একই। ২৫ এপ্রিল ট্রেনটি কুড়িগ্রাম স্টেশনে পৌঁছায় সকাল ১১টা ১৫ মিনিটে এবং ছেড়ে যায় ১২টা ৫ মিনিটে। ২৬ এপ্রিল পৌঁছায় দুপুর ১টা ২০ মিনিটে, ছেড়ে যায় বিকেল ৩টা ১০ মিনিটে। ২৭ এপ্রিল পৌঁছায় দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে ও ছেড়ে যায় ২টা ২০ মিনিটে।

এছাড়া ১ মে ট্রেনটি স্টেশনে পৌঁছায় সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে, ছেড়ে যায় ১০টা ২৫ মিনিটে। ২ মে পৌঁছায় সকাল ৯টা ৩০ মিনিটে এবং ছেড়ে যায় ১০টা ৩০ মিনিটে। ৩ মে কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস স্টেশনে পৌঁছায় সকাল ১১টা ২০ মিনিটে, ছেড়ে যায় ১২টা ১০ মিনিটে। সর্বশেষ ৪ মে ট্রেনটি পৌঁছায় দুপুর ১২টা ৩৫ মিনিটে এবং ছেড়ে যায় ১টা ২৫ মিনিটে।

‘ঢাকার উত্তরায় বাসা হওয়ায় ট্রেনে নিয়মিত যাতায়াত করি। কিন্তু দুয়েকদিন জাস্ট টাইমে ট্রেন ছাড়লেও এমন কোনো দিন নেই শিডিউল বিপর্যয় হয়নি। শিডিউল বিপর্যয়ের কারণে নানা ভোগান্তিতে পড়তে হয়। অথচ বাসে অনেক কম সময় লাগে। মাঝে মধ্যে বিরক্ত লাগে, কিন্তু কোনো উপায় না থাকায় এভাবেই ট্রেনে যাতায়াত করতে হচ্ছে।’

এভাবে দীর্ঘদিন ধরে নির্ধারিত সময়সূচি ভেঙে এক থেকে সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার বেশি বিলম্বে চলাচল করছে কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস। ট্রেনটি ঢাকা যাওয়ার পথে নয়টি স্টেশনে যাত্রাবিরতি করে। এ সময় যাত্রী ওঠানামা ও ক্রসিং জটিলতার কারণে বিলম্ব আরও বাড়ে। এছাড়া গন্তব্যে পৌঁছানোর পর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও জ্বালানি সংগ্রহেও অনেকটা সময় ব্যয় হয়। এতে ট্রেনটি একবার দেরি করলে পুরো সপ্তাহে তার প্রভাব পড়ে বলে সূত্রটি জানিয়েছে।

যাত্রীদের অভিযোগ, কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস পরিচালনায় কার্যকর তদারকির ঘাটতি রয়েছে। সময়সূচি মেনে চলার বিষয়ে কঠোর নজরদারি না থাকায় বিলম্ব যেন স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে। ফলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। অভিযোগ রয়েছে, সেবার মান কমে যাওয়ায় অনেকেই ধীরে ধীরে ট্রেনবিমুখ হয়ে পড়ছেন। এতে বিকল্প হিসেবে বাসের ওপর নির্ভরতা বাড়ায় রেলসেবার ওপর আস্থা হারাচ্ছে মানুষ।

একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করেন মোছাঃ নিলুফা ইয়াসমিন। তিনি বলেন, ‘ঢাকার উত্তরায় বাসা হওয়ায় ট্রেনে নিয়মিত যাতায়াত করি। কিন্তু দু-একদিন জাস্ট টাইমে ট্রেন ছাড়লেও এমন কোনো দিন নেই শিডিউল বিপর্যয় হয়নি। শিডিউল বিপর্যয়ের কারণে নানা ভোগান্তিতে পড়তে হয়। অথচ বাসে অনেক কম সময় লাগে। মাঝে মধ্যে বিরক্ত লাগে, কিন্তু কোনো উপায় না থাকায় এভাবেই ট্রেনে যাতায়াত করতে হচ্ছে।

মোঃ আব্দুল মমিন, মোছাঃ মনিরা খাতুন ও মোঃ আব্দুল কাদেরসহ কয়েকজন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আগে কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস ছিল সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। কিন্তু এখন সময়মতো পৌঁছানোই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রেল আন্দোলনের সংগঠক খন্দকার মোঃ আরিফ বলেন, ‘কুড়িগ্রাম একটি অবহেলিত জেলা। বহু আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে কুড়িগ্রামবাসী একটি আন্তঃনগর ট্রেন পেয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ট্রেনটি নিয়মিত ও সময়মতো চলাচল করতে পারছে না, যার পেছনে বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষ জড়িত।’

দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন

তিনি আরও বলেন, ‘যে দলই ক্ষমতায় আসুক, সেই দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা বাস মালিক সমিতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। কুড়িগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা থেকে প্রতিদিন ২২৬টি দিবা ও নৈশকোচ ঢাকা রুটে চলাচল করে। এখানে বাস ব্যবসা খুবই ভালো। কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস যদি সময়মতো চলে, তবে যাত্রীরা স্বাভাবিকভাবেই ট্রেনমুখী হবে, যা বাস ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। এই কারণেই যাত্রীদের ট্রেনবিমুখ করতে পরিকল্পিতভাবে কৃত্রিম বিলম্ব সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে আমরা মনে করি।’

‘কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসে শিডিউল বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হলো ইঞ্জিনের সক্ষমতা কম ও ইঞ্জিন অপ্রতুল। এ কারণে একদিন ট্রেন লেট করলে এটার ধারাবাহিকতা চলতেই থাকে। নতুন ইঞ্জিন সরবরাহ করা হলে এই সমস্যা নিরসন হবে।’

খন্দকার মোঃ আরিফ অভিযোগ করেন, ‘কখনও কোচ ড্যামেজ বা ক্রসিংয়ের অজুহাতে ট্রেন স্টেশনে দীর্ঘ সময় বসিয়ে রাখা হয়। আবার কখনও বাস মালিকদের সঙ্গে গোপন সমঝোতার মাধ্যমে ট্রেন চলাচলে বিঘ্ন ঘটানো হয়। ফলে দারিদ্র্যপীড়িত কুড়িগ্রামের মানুষ কাঙ্ক্ষিত সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।’

এ বিষয়ে লালমনিরহাট রেলওয়ের বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ধীমান ভৌমিক বলেন, ‘ঈদের পর চিলাহাটি এক্সপ্রেস সান্তাহার স্টেশন অতিক্রম করার সময় একটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। এরপর নিরাপত্তাজনিত কারণে সান্তাহার থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত ট্রেনের গতি কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস মিটারগেজ লাইনের ট্রেন হওয়ায় ব্রডগেজ ট্রেনগুলোর সঙ্গে ক্রসিংয়ের সময় প্রায়ই বিলম্ব ঘটে। এছাড়া সিঙ্গেল লাইন ও ইঞ্জিনের সক্ষমতা কম থাকাও ট্রেন বিলম্বে বড় কারণ।’

রেলওয়ের ডিভিশনাল ট্রান্সপোর্ট অফিসার (ডিটিও) মোঃ ফেরদৌস বলেন, ‘কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসে শিডিউল বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হলো ইঞ্জিনের সক্ষমতা কম ও ইঞ্জিন অপ্রতুল। এ কারণে একদিন ট্রেন লেট করলে এটার ধারাবাহিকতা চলতেই থাকে। নতুন ইঞ্জিন সরবরাহ করা হলে এই সমস্যা নিরসন হবে।’

কুড়িগ্রাম রেল স্টেশনের ইনচার্জ মোছাঃ কনিকা আক্তার বলেন, ‘বাস মালিকদের সঙ্গে আঁতাত বা যা বলা হয় এসব ভিত্তিহীন অভিযোগ। মূলত ইঞ্জিন সংকটের কারণেই শিডিউল বিপর্যয় ঘটে।’

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে লালমনিরহাট বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ তসলিম আহমেদকে মুঠোফোনে কয়েকদিন কল করেও পাওয়া যায়নি।

এই বাংলা/এমএস

টপিক 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here