কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি :
কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলার তিস্তার চরাঞ্চল সহ বিভিন্ন এলাকায় পেঁয়াজ, রসুন ও আলুর ফলন ভালো হলেও দাম নিয়ে চিন্তিত এসব এলাকার কৃষকেরা। এছাড়া বৈরি আবহাওয়ায় বৃষ্টির কারণে পেঁয়াজ, রসুন ও আলুর পঁচন শুরু হয়েছে।
এতে করে উৎপাদন খরচ উঠাতে না পারায় বিপাকে পড়েছেন চরাঞ্চল সহ বিভিন্ন এলাকার চাষিরা। এ ভাবে প্রতিবছর দামে ধস নামতে থাকলে একসময় এসকল চাষাবাদ থেকে সরে আসবেন বলে জানান চরাঞ্চলের মানুষজন। ফলনে ঘাটতি না হলেও দামে ঘাটতি। ধার দেনা করে চাষাবাদ করে পথে বসতে হবে চাষিদের।
উলিপুর উপজেলা কৃষি অফিস সুত্রে জানা যায়, এবারে লক্ষ্য মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে পেঁয়াজ ৬শত ১৯ হেক্টর, উৎপাদন ৬ হাজার ৪ শত ৩৭ মেট্রিকটন, আলু ১ হাজার ১শত হেক্টর, ১৪শত ৫৬ মেট্রিকটন। পেঁয়াজ, রসুন ও আলু সহ বিভিন্ন ধরনের ফসলাদি প্রায় ৮০ ভাগ চাষাবাদ হয় উপজেলার বিভিন্ন চরাঞ্চল এলাকায়। এসকল চাষাবাদের জন্য চাষিদের বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ দেয়া অব্যহত রয়েছে।
জানা যায়, উলিপুর উপজেলায় তিস্তা নদী দ্বারা বেষ্টিত ৩টি ইউনিয়ন দলদলিয়া, থেতরাই ও বজরা। এসব ইউনিয়নে কদমতলা, দলদলিয়া, গোড়াইপিয়ার, জুয়ানসতরা, আমনিয়াসা, হোকডাঙ্গা, টিটমা, নাগড়াকুড়া, দড়িকিশোরপুর, মধ্যগোড়াই, কদমতলা, অজুর্ন, বিরহিম, সন্তোষ অভিরাম, সাদুয়াদামারহাট, কর্পূরা, খারিজালাটশালা সহ ছোট বড় অসংখ্য চর ভেসে উঠেছে। এসব চরাঞ্চল সহ ব্রহ্মপুত্রের কিছু চর সহ মোট ৮৪টি চরাঞ্চলে ৬ হাজার ৬ শত ৫০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরনের ফসলের চাষাবাদ করেছেন চরাঞ্চলের কৃষকেরা।
সরেজমিনে উলিপুর উপজেলার তিস্তার চরাঞ্চল বেষ্টিত বিভিন্ন চরে গিয়ে দেখা যায়, পেঁয়াজ, রসুন ও আলু ঘরে উঠাতে ব্যাস্ত সময় পার করছেন চরাঞ্চলের মানুষজন। বৈরি আবহাওয়ায় বৃষ্টির কথা মাথায় রেখে ঘরে উঠাচ্ছেন এসকল ফসল। গত কয়েকদিন আগে হঠাৎ বৃষ্টির কারণে পেঁয়াজ, রসুন ও আলুর পঁচন শুরু হয়েছে। বাজারে চাহিদা ও দাম কম থাকায় বিপাকে পড়েছেন এসকল চাষিরা।
একদিকে পঁচন অন্যদিকে দাম কম থাকায় ধার দেনা করে চাষাবাদ করা চাষিদের মনে চিন্তার ছাপ পড়েছে। খরচের টাকা না উঠাতে পারলে তাদের জীবনমান কষ্টের মধ্যে পড়ে যাবে। এভাবে প্রতি বছর লোকসান গুনতে হলে এ সকল চাষাবাদ থেকে বিমুখ হবেন চরায়ঞ্চলের মানুষজন বলে জানান তারা।
দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন
উলিপুর উপজেলার জুয়ানসতরা চর এলাকার পেয়াজ চাষী মোঃ আমিনুল ইসলাম জানান, এবারে তিস্তার চরাঞ্চলে ১ একর জমিতে পেঁয়াজ চাষ করেছেন। ফলন অনেক ভালো হয়েছে। গত কয়েকদিন আগে হঠাৎ বৃষ্টি হওয়ায় পেঁয়াজ পঁচে যাচ্ছে। বাজারে চাহিদা ও বাজারদর কম থাকায় বিক্রি করতে পারছেন না। একর জমিতে খরচ হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার টাকা। পেঁয়াজের ফলন হয়েছে প্রায় ১শ মণ।
এছাড়া এক বস্তা (১ মণ) পেঁয়াজ নদীর এপাড় থেকে ওপাড়ে নিতে নৌকা ও ঘোড়ার গাড়ি পরিবহন বাবদ খরচ হয় ৭০ থেকে ৮০ টাকা। সেখান থেকে হাটে নিতে পরিবহন বাবদ খরচ হয় ৪০ টাকা। মণ প্রতি খরচ হয় ১১০ থেকে ১২০ টাকা। বর্তমান প্রতি মণ পেঁয়াজ বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৫০০ টাকা থেকে ৫২০ টাকা। ১শ মণ পেঁয়াজ বিক্রি করে আসে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। পেঁয়াজ বিক্রি করে পরিবহন ও চাষাবাদ খরচ যা হয় তাই উঠানো সম্ভব হচ্ছেনা। এভাবে বাজার মন্দা চলতে থাকলে চরাঞ্চলের মানুষজন এসব চাষাবাদ না করে অন্য কিছু করার চিন্তা ভাবনা করবে বলে জানান তিনি।
গোরাইপিয়ার চর এলাকার রসুন চাষী মোঃ গোলাম রব্বানী জানান, চরাঞ্চলে এবারে ৫০ শতক জমিতে রসুনের চাষাবাদ করেছেন। রসুন উঠানো পর্যন্ত খরচ হবে প্রায় ৬০ হাজার টাকা। রসুনের ফলন অনেক ভালো হয়েছে। তিনি ৬০ মণ রসুনের আশা করছেন। বর্তমান বাজারে রসুন মণ প্রতি বিক্রি হচ্ছে ১২শত টাকা। রসুন বাজারে বিক্রি করে আয় হবে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা। পরিবহন ও চাষাবাদ খরচ মিলে লোকসানে পড়তে হবে।
দরিকিশোরপুর চর এলাকার আলু চাষী মোঃ নুরুজ্জামান মিয়া জানান, কেজি প্রতি আলুতে খরচ হয়েছে ১৫ টাকা। তা বাজারে গিয়ে কেজি প্রতি বিক্রি করছেন ১০ থেকে ১২ টাকা। কেজিতে লোকসান হচ্ছে ৩ থেকে ৫ টাকা। আলু চাষ করে এবারে ঋণী হয়ে গেলাম। ধার দেনা করে আলু চাষাবাদ করেছি এসকল টাকা কিভাবে পরিশোধ করবেন এ নিয়ে অনেক চিন্তিত।
উলিপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও কৃষিবিদ মোঃ মোশারফ হোসেন বলেন, পেঁয়াজ, রসুন ও আলু সহ বিভিন্ন ধরনের ফসলাদি প্রায় ৮০ ভাগ চাষাবাদ হয় উপজেলার বিভিন্ন চরাঞ্চলে। চরাঞ্চলে ফলন অনেক ভালো হয়। কোন কারণে বাজারদর ও চাহিদা কমে গেলে চরাঞ্চলের কৃষকেরা অনেক সমস্যায় পড়ে যায়। খরচের টাকা উঠাতে না পারলে অনেক ক্ষতির মুখে পড়ে যাবে এসকল এলাকার চাষিরা। তবে চাহিদা ও বাজারদর বৃদ্ধি পেলে বাজারজাত করার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
এই বাংলা/এমএস
টপিক

