প্রফেসর ড. আবু তালেব (বাউবি) :
বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে যেমন উত্তাপ বাড়ছে, তেমনি সাধারণ মানুষের দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়েছে নির্বাচন ব্যবস্থাপনার ওপর—বিশেষ করে ভোটকেন্দ্রগুলোর সার্বিক প্রস্তুতি ও পরিচালনার দিকে। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে নির্বাচন কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভোটকেন্দ্রই হলো ভোটার ও রাষ্ট্রের প্রথম প্রত্যক্ষ সংযোগস্থল এবং গণতন্ত্রের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। ভোটাররা যদি নির্বিঘ্নে কেন্দ্রে প্রবেশ করে নির্ভয়ে ভোট দিতে পারেন এবং সম্মানজনক পরিবেশে কেন্দ্র ত্যাগ করেন, তবেই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়। সামান্য ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতাও পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
ভোট জট একটি বড় চ্যালেঞ্জ :
নির্বাচন কেন্দ্রে ভোট জট বা ভোট জ্যামিং একটি গুরুতর সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। অনাকাঙ্ক্ষিত ভিড়, দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে ভোটারদের প্রবেশে বিলম্ব ঘটানো ভোটারদের অধিকার ক্ষুণ্ন করে। এতে নারী, প্রবীণ ও শারীরিকভাবে দুর্বল ভোটাররা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হন।
প্রশাসনিক অদক্ষতা :
পর্যাপ্ত বুথের অভাব ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে ভোট জট সৃষ্টি হয়। এ সমস্যা সমাধানে ভোটার সংখ্যার অনুপাতে বুথ স্থাপন, দায়িত্বপ্রাপ্তদের মধ্যে স্পষ্ট দায়িত্ব বণ্টন, ভোটার প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভোট জালিয়াতি গণতন্ত্রের জন্য হুমকি :
ভোটাধিকার নাগরিকের মৌলিক অধিকার হলেও ভোট জালিয়াতি সেই অধিকারকে অর্থহীন করে তোলে। একই ব্যক্তি একাধিকবার ভোট দেওয়া, মৃত বা অনুপস্থিত ভোটারের নামে ভোট প্রদান, জোরপূর্বক ভোট দেওয়ানো কিংবা কেন্দ্র দখলের মতো ঘটনাগুলো নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু ক্ষেত্রে নির্বাচন কর্মকর্তাদের অবহেলা, পক্ষপাত বা রাজনৈতিক চাপ ভোট জালিয়াতিকে সহজ করে তোলে। এছাড়া ভোট গণনা ও ফলাফল প্রেরণের সময় কারসাজির অভিযোগও অতীত অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে। এসব রোধে শক্তিশালী ব্যবস্থাপনা, নিরপেক্ষ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, কঠোর শাস্তি এবং নাগরিক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন
এজেন্টদের দায়িত্ব ও সীমাবদ্ধতা :
নির্বাচন কেন্দ্রে প্রার্থীদের এজেন্টরা ভোট গ্রহণ ও গণনা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তবে তাদের অবশ্যই আইন ও নির্বাচন বিধিমালার মধ্যে থেকেই দায়িত্ব পালন করতে হবে। ভোটারকে প্রভাবিত করা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা তাদের এখতিয়ারের বাইরে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
কেন্দ্র ব্যবস্থাপনায় করণীয় :
পূর্ববর্তী নির্বাচনগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নির্বাচন কমিশনকে কেন্দ্র ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পদক্ষেপ নিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে ভোট গ্রহণ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ জোরদার, কেন্দ্রভিত্তিক নিরাপত্তা পরিকল্পনা, সময়মতো ব্যালট ও সরঞ্জাম সরবরাহ এবং নারী, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ভোটারদের জন্য বিশেষ সহায়তা ব্যবস্থা।
অনেক কেন্দ্রে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, বসার ব্যবস্থা ও যাতায়াত সমস্যাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কোথাও অপ্রয়োজনীয় ভিড় ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ নির্বাচন ব্যবস্থাপনাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
প্রযুক্তি ও তদারকির গুরুত্ব :
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ত্রয়োদশ নির্বাচনে প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার কেন্দ্র ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। সিসিটিভি নজরদারি, দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা, কেন্দ্রভিত্তিক মনিটরিং টিম এবং গণমাধ্যম ও নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের অবাধ উপস্থিতি অনিয়ম কমাতে সহায়ক হবে।
প্রত্যাশা :
এই নির্বাচনে জনগণের প্রধান প্রত্যাশা হলো শান্তিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র, প্রশাসনের দৃশ্যমান নিরপেক্ষতা এবং ভোটারদের পূর্ণ নিরাপত্তা। নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত প্রচেষ্টাই পারে ভোটকেন্দ্রগুলোকে জনগণের আস্থার কেন্দ্রে পরিণত করতে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পালাবদলের বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় সফল হতে হলে নির্বাচন কেন্দ্র ব্যবস্থাপনাকে হতে হবে দক্ষ, মানবিক ও প্রশ্নাতীতভাবে নিরপেক্ষ—এমনটাই মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
এই বাংলা/এমএস
টপিক

