মোহাম্মদ মোশার্রাফ হোছাইন খান :
মৎস্য অধিদপ্তরের প্রথম থেকে তৃতীয় গ্রেডের পদসমূহে ভারপ্রাপ্তদের ভারে ভারাক্রান্ত। প্রতিষ্ঠানটির সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী যোগ্যদের যথাসময়ে নিয়মতান্ত্রিকভাবে পদোন্নতি না দেয়ায় এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। যথাসময়ে পদোন্নতি না পাওয়ায় কর্মকর্তাদের কর্মস্পৃহা হ্রাস পাচ্ছে, ফলে মৎস্য অধিদপ্তরের সকল কর্মকাণ্ড গতিহীন হয়ে পড়ছে।
দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন
২০২৩ সালের মৎস্য অধিদপ্তরের অনুমোদিত জনবল কাঠামো মতে, প্রথম গ্রেডের একজন মহাপরিচালক, দ্বিতীয় গ্রেডের একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক, তৃতীয় গ্রেডে ৮ জন বিভাগীয় পরিচালকসহ আরো ১১টি পরিচালক (১ টি রিজার্ভসহ) পদের সংস্থান রয়েছে। এ হিসেবে তৃতীয় গ্রেডের ১৯ টি পদ রয়েছে। সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় ১ বছর ১ম গ্রেডের মহাপরিচালক ও ২য় গ্রেডের অতিরিক্ত মহা পরিচালক পদে নিয়মিত কোন কর্মকর্তা নেই। গুরুত্বপূর্ণ এই পদ দুইটি চালানো হচ্ছে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব দিয়ে। ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক পদে কর্মরত আছেন ১১তম বিসিএস (মৎস্য) ক্যাডার ড. মো. আবদুর রউফ ও ভারপ্রাপ্ত অতিরিক্ত মহাপরিচালক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন মো. জিয়া হায়দার চৌধুরি। এই দুই কর্মকর্তার চাকুরিও শেষ পর্যায়ের দিকে। প্রতিষ্ঠানটির সাংগঠনিক কাঠামো মতে-প্রশাসন উইং, অভ্যন্তরীণ মৎস্য উইং, বাঁওড় মৎস্য উন্নয়ন প্রকল্প, যশোর, বাজেট ও অর্থ উইং, মৎস্য পরিকল্পনা ও জরিপ উইং, এফটিএ, সাভার, সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তর, চট্টগ্রাম, বু-ইকোনমি উইং, সামুদ্রিক মৎস্য জরিপ ইউনিট. মৎস্য পরিদর্শন ও মাননিয়ন্ত্রণ উইং, আট বিভাগে ৮ জন রিজার্ভ পদসহ তৃতীয় গ্রেডের পরিচালক বা সমমর্যাদার ১৯ জন কর্মকর্তা নিয়োগের বিধান রাখা হয়েছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট ও অন্যান্য সূত্রে জানা যায়, মৎস্য অধিদপ্তরে তৃতীয় গ্রেডের পরিচালক ও সমমর্যাদা সম্পন্ন অধিকাংশ পদে নিয়মিত কর্মকর্তা নেই। এ সব পদগুলোর দায়িত্বে রয়েছেন চলতি দায়িত্ব অথবা অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রাপ্ত সিনিয়র কর্মকর্তারা। প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসন উইং এ পরিচালক হিসেবে চলতি দায়িত্বে রয়েছেন এ, এস, এম, রেজাউল করিম। এ ছাড়া অন্যান্য উইং এবং সমমর্যাদার অধিনস্থ প্রতিষ্ঠান সমূহে পরিচালক চলতি অথবা অতিরিক্ত হিসেবে কর্মরত থাকা কর্মকর্তারা হলেন- অভ্যন্তরীণ মৎস্য উইং এ ড. মোঃ মোতালেব হোসেন, বাজেট ও অর্থ উইং এ মোঃ সাহেদ আলী, মৎস্য পরিকল্পনা ও জরিপ উইং এ প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পদে মোঃ সাহেদ আলী, এফটিএ, সাভার, ঢাকায়, অলক কুমার সাহা, ব্লু ইকোনমি উইং এ মোঃ সাজদার রহমান, সামুদ্রিক মৎস্য জরিপ ইউনিটে ড. মঈন উদ্দিন আহমদ, মৎস্য পরিদর্শন ও মাননিয়ন্ত্রণ উইং এ ড. মোঃ খালেদ কনক। অগ্রানোগ্রামে সংস্থানকৃত তৃতীয় গ্রেডের পরিচালক বা সম মর্যাদাসম্পন্ন ১৯ জন কর্মকর্তা থাকার কথা থাকলেও প্রতিষ্ঠানটির বেশিরভাগ পদে নিয়মিত কোন কর্মকর্তা নেই।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়,মৎস্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদোন্নতিতে গুরুত্বহীনতা এ ক্যাডারের সবচেয়ে বড়ো সমস্যা। ফাঁসির আদেশপ্রাপ্ত শেখ হাসিনার সাশনের সাড়ে ১৫ বছর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় রহস্যজনক কারণে এ দপ্তরটিকে গুরুত্বহীন করে রাখে। বিসিএস মৎস্য ক্যডারে যোগদান করা একজন উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তাকে কমপক্ষে ১২ থেকে ১৫ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে পরবর্তী পদে পদোন্নতি পেতে। এতে তার চাকুরীজীবনের প্রায় অর্ধেক বয়স শেষ হয়ে যেত একটি পদোন্নতিতে।
তৃতীয় গ্রেডে পদোন্নতিতে গ্রেডেশনে থাকা ১৭ তম বিসিএস (মৎস্য) কর্মকর্তাদেরকেও এ পরিস্থিতির শিকার হতে হয়েছে। নিয়মতান্ত্রিকভাবে পদোন্নতি হলে এসকল কর্মকর্তা অনেক আগেই এই গ্রেডে পৌঁছাতে পারতেন এবং পরবর্তী গ্রেডের জন্য অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারতেন। এতে মৎস্য অধিদপ্তরকেও ভারপ্রাপ্তদের বোঝা বহন করার প্রয়োজন হতো না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সচিব আবু তাহের মুহাম্মদ জাবের জানান, ”সার্বিক বিষয়ে সমাধানের কাজ চলছে। অল্প সময়ের মধ্যে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধান করা সম্ভব হবে বলে আশা করছি। মাননীয় উপদেষ্টা মহোদয় সকল কর্মকাণ্ডে অত্যন্ত আন্তরিক।”
এদিকে, গত ০৯ নভেম্বর সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের সুপারিশক্রমে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালেয়ের ০৯ নভেম্বর ২০২৫ তারিখের ০৫.০০,০০০০,০০০,১৩৩.১২.০১৪৮.২৫.৫৫৭ স্মারক নাম্বার মোতাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, মৎস্য-১ অধিশাখার যুগ্মসচিব মোঃ হাসানুজ্জামান স্বাক্ষরিত ৩৩.০০.০০০০.১২৬.১২.০১২.২৪.৮৪৮ নং স্মারক নম্বরের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিসিএস (মৎস্য) ক্যাডারের মৎস্য অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগীয় পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মোঃ মনিরুল ইসলাম (০০২১৯) ও একই ক্যাডারের খুলনা বিভাগীয় পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মোঃ জাহাঙ্গীর আলমকে (০০২২০) পরিচালক/সমমান তৃতীয় গ্রেডের পদে পদোন্নতি দেয়া হয়।
গ্রেডেশন তালিকা সূত্রে জানা যায়, প্রথম ৯ জন কর্মকর্তাকে বাদ দিয়ে এ দুই কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। পদোন্নতির এ প্রক্রিয়া নিয়ে মৎস্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ -অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। কর্মকর্তারা মনে করছেন, এতে মেধাক্রমে আগে থাকা কর্মকর্তারা গ্রেডেশনে পিছিয়ে পড়বেন। এর ফলে আগে যোগদান করা সিনিয়র কর্মকর্তাদেরকে তাদের অধীনে চাকুরি করতে হবে। যা চাকরি জীবনে অসম্মান ও মানসিক কষ্টের কারণ হতে পারে।
সূত্র জানায়, প্রথম ৯ কর্মকর্তার এনএসআই রিপোর্ট না পাওয়ায় তাদের এসএসবি হয়নি। রিপোর্ট পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি মন্ত্রণালয়ের ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। তাদের প্রশ্ন– রিপোর্ট আসা না আসার বিষয়টি কেন কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব ফেলবে? ‘এখানে তো বাদ পড়া কর্মকর্তারাই ভুক্তভোগী’–মন্তব্য করেন এক কর্মকর্তা।
গ্রেডেশন অনুযায়ী বঞ্চিত ৯ কর্মকর্তা হলেন– মৎস্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) এস এম রেজাউল করিম, পরিচালক (অভ্যন্তরীণ মৎস্য) ড. মোতালেব হোসেন, পরিচালক (ব্লু ইকনোমি) সাজদার রহমান, মৎস্য পরিদর্শন ও মাননিয়ন্ত্রণ উইং এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. খালেদ কনক, সিলেট বিভাগের পরিচালক আসাদুল বাকী, চট্টগ্রাম বিভাগের পরিচালক আনোয়ার হোসেন, প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (মৎস্য, পরিকল্পনা ও জরিপ) সাহেল আলী, চট্টগ্রাম মৎস্য অধিদপ্তরের পরিচালক (সামুদ্রিক মৎস্য) ড. মঈন উদ্দিন আহমেদ এবং পরিচালক সাইফুদ্দিন ইয়াহিয়া।
তারা সবাই গত বছরের ২০ ডিসেম্বর পরিচালক পদের যোগ্যতা অর্জন করেন। কিন্তু বাদ দিয়ে পদোন্নতির জন্য বিবেচিত হয়েছেন সাভারের মৎস্য প্রশিক্ষণ অ্যাকাডেমির পরিচালক অলক কুমার সাহা, মৎস্য অধিদপ্তরের পরিচালক মনিরুল ইসলাম ও খুলনা বিভাগের পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম– যারা চলতি বছরের ৩০ আগস্ট যোগ্যতা অর্জন করেছেন।
এদিকে, ঢাকা পোস্ট নামক একটি অনলাইন পোর্টালের নিউজে বলা হয়েছে,” ৮ নভেম্বর শনিবার রাতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি) সভায় মৎস্য ক্যাডারের সিনিয়র ৯ কর্মকর্তাকে বাদ দিয়ে তালিকায় থাকা নিচের কর্মকর্তাদের পদোন্নতির সুপারিশ করে।” সরকারি ছুটির দিনে সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি)’র সভা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে বলে জানা যায়।
এই বাংলা/এমএস
টপিক

