ভরাট ও দখলে সংকুচিত নাসিরনগরের নদী-খাল, হুমকিতে কৃষি ও পরিবেশ

অস্তিত্বসংকটে নাসিরনগরে অসংখ্য খাল- বিল / ছবি - এই বাংলা

নাসিরনগর (ব্রাহ্মণবাড়ীয়া) প্রতিনিধি :

একসময় নদীই ছিল জনপদের প্রাণস্পন্দন। যোগাযোগ, কৃষি সেচ ও মাটির উর্বরতায় নদীর অবদান ছিল অনস্বীকার্য। কিন্তু হাওরবেষ্টিত ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার নাসিরনগর উপজেলায় এখন অসংখ্য নদী, খাল ও জলাশয় তাদের স্বাভাবিক প্রবাহ হারিয়ে ধুঁকছে। ভরাট হয়ে যাচ্ছে চিরচেনা জলপথ, কমছে নাব্যতা, অনিশ্চিত হয়ে উঠছে নৌযান চলাচল। এর প্রভাব পড়ছে ইরি-বোরো চাষ, মাছচাষ ও স্থানীয় পরিবেশে।

উপজেলাটি নদীবেষ্টিত হওয়ায় ছোট-বড় খাল ও জলাশয়ের জাল ছড়িয়ে আছে সর্বত্র। তবে প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি মানবসৃষ্ট হস্তক্ষেপে এসব জলপথ দ্রুত ভরাট হয়ে চর জেগে উঠছে। বর্ষা মৌসুমে উজানের অতিবৃষ্টিতে পাহাড়ি পলি এসে নদীর তলদেশ ভরাট করছে। নদীতীরের নির্বিচার বৃক্ষনিধন ভাঙনকে ত্বরান্বিত করছে। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের মতে, খাল দখল, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ ও স্থাপনা গড়ে তোলাই সংকটকে তীব্র করেছে।

উপজেলার কুকুরিয়া খাল—যা উপজেলা সদর দিয়ে নাসিরপুর হয়ে লঙ্ঘন নদীতে মিলিত হয়েছে—বর্তমানে ভরাটের প্রকট উদাহরণ। খালের মাঝখানে বিস্তীর্ণ চর জেগে উঠেছে, পলি জমে স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

একই চিত্র দেখা যাচ্ছে উপজেলার বিভিন্ন খালেও। পলি জমে পানি চলাচল প্রায় অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ফলে জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে, কৃষিজমিতে সেচ সংকট দেখা দিচ্ছে এবং বর্ষায় জলাবদ্ধতার আশঙ্কা বাড়ছে। বহু স্থানে সড়ক, বাঁধ, আবাসিক স্থাপনা ও বর্জ্য নির্গমনের কারণে নদীর প্রাণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সেতু ও কালভার্ট নির্মাণের পর পানি চলাচলের পথ সচল না রাখায় অনেক জলাশয় কার্যত মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে।

দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন

পরিণতিতে বর্ষায় পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে দু’কূল উপচে বন্যা দেখা দিচ্ছে। আবার শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে সেচ ও মাছচাষ ব্যাহত হচ্ছে। প্রাকৃতিক জলাধারের ধারণক্ষমতা কমে যাওয়ায় শহরাঞ্চলেও পানি সরবরাহে সংকট তৈরি হচ্ছে।

অনুসন্ধানে রাজনৈতিক প্রভাব ও দখলদারিত্বের অভিযোগও উঠেছে। পরিবেশ রক্ষায় স্থানীয়দের আন্দোলন ও প্রশাসনিক নির্দেশনা থাকলেও প্রভাবশালীদের চাপ ও সমন্বয়হীনতার কারণে বহু অবৈধ বাঁধ ও দখল অপসারণ করা সম্ভব হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নদী ও খাল নিয়মিত খনন করে নাব্যতা ফিরিয়ে আনা জরুরি। অপদখলীয় জলাশয় উদ্ধার, অপরিকল্পিত বাঁধ অপসারণ এবং শিল্পকারখানায় বাধ্যতামূলক বর্জ্য শোধনাগার স্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে নদীর পানির সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, সামাজিক সংগঠন ও নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ সংকট কাটানো সম্ভব নয়।

নদী শুধু পানি নয়—নদী এক ঐতিহ্য ও সভ্যতার ধারক। নদীর মৃত্যু মানে জনপদের জীবন ও অর্থনীতির মৃত্যু। তাই নাসিরনগরের নদী-খাল রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এর মাশুল গুনতে হবে পুরো জনপদকেই।

এই বাংলা/এমএস

টপিক 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here