বিশেষ প্রতিনিধি :
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে লিজ দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে প্রতিবাদ জানিয়েছে সংগঠন ‘স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টি’। আজ রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকার রাজু ভাস্কর্যের সামনে ‘লালকার্ড’ কর্মসূচির মাধ্যমে তারা সরকার ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের বিরুদ্ধে এই প্রতিবাদ জানায়।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো আইনগত বা সাংবিধানিক এখতিয়ার নেই চট্টগ্রাম বন্দরের মতো কৌশলগত স্থাপনা নিয়ে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করার। কারণ এই সরকার কোনো বিপ্লবী সরকার নয়; প্রচলিত সংবিধানের অধীনেই শপথ নেওয়া একটি অন্তর্বর্তী সরকার। বক্তারা আরও বলেন, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর নির্বাহী বিভাগ নির্বাচন কমিশনের অধীন হয়ে যায়। সে সময় রুটিন কার্যক্রম ছাড়া অন্য কোনো নীতিগত বা দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নেওয়া সরকারের এখতিয়ারবহির্ভূত।
সমাবেশে বন্দরের শ্রমিক আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, আন্দোলনরত ছয়জন শ্রমিককে ডিবি পরিচয়ে তুলে নেওয়া হয়েছে। এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে তারা অবিলম্বে শ্রমিকদের মুক্তির দাবি জানান।
লালকার্ড কর্মসূচি থেকে সরকারের কাছে তিন দফা দাবি তুলে ধরেন শিক্ষার্থীরা। দাবিগুলো হলো— এক. ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে নিউমুরিং টার্মিনাল লিজ বা কনসেশন চুক্তির প্রক্রিয়া অবিলম্বে বাতিল করতে হবে।
দুই. ‘ইকোনমিক হিটম্যান’ হিসেবে পরিচিত আশিক চৌধুরী, লুৎফে সিদ্দিকী, মনিরুজ্জামান এবং নৌ উপদেষ্টা সাখাওয়াত হোসেনকে সরকারের সব ধরনের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিতে হবে।
তিন. বন্দরের শ্রমিকদের বিরুদ্ধে সব ধরনের দমন–পীড়ন বন্ধ করতে হবে এবং ডিবি পরিচয়ে যাদের তুলে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে, তাদের অবিলম্বে মুক্তি দিয়ে নিরাপদে পরিবারের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
শিক্ষার্থীরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এসব দাবি মানা না হলে আন্দোলন আরও তীব্র করা হবে এবং কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা আসতে পারে।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনাল দেশের একমাত্র লাভজনক ও বিশ্বমানের কনটেইনার টার্মিনাল। নির্বাচনের ঠিক আগে তড়িঘড়ি করে একটি বিতর্কিত বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে কনসেশন চুক্তিতে এটি লিজ দেওয়া বাংলাদেশের অর্থনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌম স্বার্থের পরিপন্থী।
তাঁরা অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকার বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে শুধু টার্মিনাল অপারেটর হিসেবে নয়, বরং আফ্রিকান মডেল অনুসরণ করে দীর্ঘমেয়াদি ‘কনসেশনিয়ার’ হিসেবে নিয়োগ দিতে যাচ্ছে। এতে ভবিষ্যতে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর বিদেশি নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে, যা অর্থনৈতিক সংকট, জাতীয় নিরাপত্তা হুমকি এবং সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন করতে পারে।
দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন
বক্তারা আরও বলেন, উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়া এবং দেশি–বিদেশি অন্যান্য যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে প্রতিযোগিতার সুযোগ না দিয়ে চুক্তি করার চেষ্টা অস্বচ্ছতা, কমিশন বাণিজ্য ও ব্যক্তিগত স্বার্থের প্রশ্ন তোলে।
সমাবেশে বলা হয়, শিক্ষার্থীরা চট্টগ্রাম বন্দরকে সিঙ্গাপুরের মতো একটি আঞ্চলিক ট্রানজিট হাবে পরিণত করতে চান। কিন্তু ডিপি ওয়ার্ল্ড, এপিএম টার্মিনালস বা মেডলগের মতো বড় আন্তর্জাতিক অপারেটররা কখনোই চট্টগ্রাম বন্দরের আঞ্চলিক হাব হিসেবে গড়ে ওঠা চায় না। ‘আইমেক করিডর’সহ বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক স্বার্থের অংশ হিসেবে দেশি–বিদেশি লবিস্টরা চট্টগ্রাম বন্দরকে বিদেশি সিন্ডিকেটের হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেন বক্তারা।
এ সময় ‘সিঙ্গাপুর ও ভিয়েতনামের বন্দর বিদেশিরা পরিচালনা করে’—এমন বক্তব্যকে অসত্য ও বিভ্রান্তিকর দাবি করে শিক্ষার্থীরা বলেন, বাস্তবে সিঙ্গাপুরের কোনো কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি অপারেটরদের হাতে নেই।
একইভাবে ভিয়েতনামেও কোনো টার্মিনাল এককভাবে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি।
বিক্ষোভ সমাবেশে সংহতি জানিয়ে বার্তা পাঠান অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টির আহ্বায়ক মুহাম্মদ জিয়াউল হক, যুগ্ম আহ্বায়ক মুহিউদ্দিন রাহাত, দপ্তর সম্পাদক সাইফুল ইসলাম, জুবায়েদুল ইসলাম শিহাব, জাবির বিন মাহবুবসহ প্রায় দুই শতাধিক শিক্ষার্থী।
সমাবেশে বক্তব্য দেন সার্বভৌমত্ব আন্দোলনের মুখপাত্র শামীম রেজা, পিসিসিপির সাবেক সভাপতি শাহাদাত ফরাজী সাকিব এবং ইউনাইটেড ইয়াং ফোর্সের সভাপতি শাকিল মিয়াসহ অন্যান্য নেতারা।
এই বাংলা/এমএস
টপিক

