মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

স্বপ্নের ডিএসটিপিপি এখন দুঃস্বপ্ন, ঢাকা ওয়াসার ৩ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকার শোধনাগার বর্জ্য সংকটে অচল

এইবাংলা অনলাইন
  • প্রকাশকালঃ বুধবার, ৮ জুলাই, ২০২৬

মোহাম্মদ মোশার্রাফ হোসাইন খান :

 

ঢাকাপয়ঃবর্জ্য শোধনের মাধ্যমে ঢাকা শহরের একাংশের পরিবেশ রক্ষা এবং রাজধানীর প্রায় ৫০ লাখ মানুষকে আধুনিক স্যানিটেশন সেবার আওতায় আনার এক বিশাল স্বপ্ন দেখিয়েছিল ঢাকা ওয়াসা। চিনের এক্সিম ব্যাংকের মেগা ঋণে প্রায় ৩ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে ‘দাশেরকান্দি পয়ঃনিষ্কাশন শোধনাগার প্রকল্প’। তবে সরকারের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)-এর একটি গোপন মূল্যায়ন প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, শতভাগ অর্থ ছাড় এবং মেগা কেনাকাটার উৎসব শেষ হলেও, ওয়াসার চরম অদক্ষতা ও হঠকারিতায় পুরো প্রকল্পটি এখন এক অকেজো ‘শ্বেত হস্তী’তে পরিণত হয়েছে।

মূল শহরের ঘরবাড়ির সাথে সংযোগ লাইনের কাজ না করেই আগে প্ল্যান্ট বানিয়ে ফেলায়, সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার এই মহাযজ্ঞ এখন বর্জ্যের অভাবে খাঁ খাঁ করছে।১. কোনো ‘বিশদ সমীক্ষা’ ছাড়াই সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার প্রকল্প!আইএমইডি রিপোর্টের ২২ নম্বর পৃষ্ঠার নথি ঘাঁটলে এই মেগা প্রকল্পের সবচেয়ে বড় শুভঙ্করের ফাঁকিটি বেরিয়ে আসে। নথিতে খোদ সরকারি মূল্যায়ন বিভাগ স্বীকার করেছে—“এ প্রকল্পের জন্য কোন বিষদ ফিজিবিলিটি স্টাডি (সম্ভাব্যতা যাচাই) করা হয়নি”।

হাতিরঝিল প্রকল্পের আওতায় বুয়েটের একটি অত্যন্ত সীমিত পর্যায়ের পুরনো সমীক্ষাকে ঢাল বানিয়ে ওয়াসা এই অন্ধ মেগা প্রজেক্টের জন্ম দেয়।বিশদ সমীক্ষা না থাকায় শুরুতেই ঋণদাতা সংস্থা চায়না এক্সিম ব্যাংকের সাথে চুক্তি আটকে থাকে দীর্ঘ দুই বছর। কিন্তু ওপেন টেন্ডার বা উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক দরপত্র ছাড়াই চিনের শর্ত মেনে ‘জিটুজি’ (G2G) চুক্তির আওতায় পুরো প্রজেক্টের চাবি ‘টার্ন-কি’ হিসেবে তুলে দেওয়া হয় চিনের সরকারি প্রতিষ্ঠান ‘হাইড্রোচায়না কর্পোরেশন’-এর হাতে। ওয়াসার নিজস্ব কোনো বিশদ টেকনিক্যাল সমীক্ষা না থাকায় চিনা ঠিকাদার যেভাবে ছক সাজিয়েছে, ওয়াসা সেভাবেই অন্ধের মতো বিল পাস করেছে।

২. সরকারি স্বীকারোক্তি: “সংযোগ লাইনের কাজ এখনো শুরুই হয়নি”ধানমন্ডি, কলাবাগান, রমনা, তেজগাঁও, মহাখালী, গুলশান ও বনানীসহ রাজধানীর বিস্তীর্ণ এলাকার বিষাক্ত বর্জ্য যাতে হাতিরঝিল ও বালু নদীতে মিশতে না পারে, সেজন্য বুয়েটের নকশায় ১১টি বিশেষ ডাইভারশন স্ট্রাকচার (SSDS) তৈরি করা হয়েছিল। পরিকল্পনা ছিল—রামপুরা সুয়েজ লিফটিং স্টেশনের মাধ্যমে এই বর্জ্য ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ ডাবল লাইনের পাইপলাইন দিয়ে দাশেরকান্দি প্ল্যান্টে নেওয়া হবে।প্ল্যান্ট তৈরি হয়েছে, ১০ কিলোমিটারের ট্রাঙ্ক লাইনও রামপুরা এসে থমকে গেছে।

কিন্তু মূল গলদ হলো, শহরের ঘরবাড়ি থেকে বর্জ্য এই ট্রাঙ্ক লাইনে আনার মূল কানেক্টিং নেটওয়ার্কটিই ওয়াসা তৈরি করেনি। আইএমইডি রিপোর্টের ২৬ নম্বর পৃষ্ঠায় স্পষ্ট সিলমোহর দিয়ে লেখা হয়েছে—“গুলশান, বনানী, বারিধারা, বসুন্ধরা, বাড্ডা, ফার্মগেট… যে নেটওয়ার্কের কাজ এখনো শুরুই হয়নি”।ফলাফল যা হওয়ার তা-ই হয়েছে; দৈনিক ৫০ কোটি লিটার বর্জ্য শোধনের দানবীয় ক্ষমতাসম্পন্ন এই প্ল্যান্টটি এখন বর্জ্যের তীব্র সংকটে ভুগছে। শুষ্ক মৌসুমে এটি তার মূল ক্ষমতার অর্ধেকেরও কম (মাত্র ২৫০ এমএলডি) ক্ষমতা নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে চলছে। আর শহরের লাখ লাখ মানুষের বর্জ্য আগের মতোই সরাসরি হাতিরঝিল ও নদীগুলোকে বিষাক্ত করছে।

৩. কাজ কম করেও চিনা ঠিকাদারের ১০০% বিল খালাস!আইএমইডি রিপোর্টের ২৫ ও ৩১ নম্বর পৃষ্ঠার তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা ওয়াসার দরকষাকষির কোনো সুযোগ না থাকার পূর্ণ সুযোগ নিয়েছে চিনা ঠিকাদার। মূল ট্রাঙ্ক সুয়ার লাইনের চুক্তি ছিল ৫ কি.মি. $\times$ ২ ডাবল লাইন (১০ কি.মি.)। কিন্তু বাস্তবে দূরত্ব কম হওয়ায় ঠিকাদার নির্মাণ করেছে ৪.৮ কি.মি. $\times$ ২ ডাবল লাইন (৯.৬ কি.মি.)।চুক্তি অপেক্ষা প্রায় আধা কিলোমিটার কাজ কম করা সত্ত্বেও ওয়াসা রহস্যজনকভাবে তাদের বিল থেকে কোনো টাকা কাটেনি। আইএমইডি লিখেছে—“এর জন্য কোন মূল্য সমন্বয় করা হয়নি।

দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন

এ ধরনের চুক্তিতে এরূপ ক্ষেত্রে দরকষাকষির সুযোগ থাকে না”। মূল শহরের সংযোগ লাইন ছাড়াই চিনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তাদের জন্য বরাদ্দকৃত পুরো ২,০৬৬ কোটি টাকার প্রকল্প সাহায্য (PA) ফান্ডের শতভাগ (১০০%) বিল তুলে নিয়ে নির্বিঘ্নে বিদায় হয়েছে।

৪. রকেট গতিতে গাড়ি ও গ্যাজেট বিলাস, মাঝপথে পালালো পরামর্শকমাঠপর্যায়ে ৫০ লাখ মানুষের পয়ঃনিষ্কাশন লাইন করার ক্ষেত্রে ওয়াসার গতি শূন্য হলেও, কর্মকর্তাদের বিলাসিতা আর কেনাকাটার ফাইল পাস হয়েছে আলোর গতিতে। ২০১৬ সালের জুন মাসের মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে কর্মকর্তাদের চড়ার জন্য প্রায় ৭২ লাখ টাকার জিপ গাড়ি, ৫০ লাখ টাকার ডাবল কেবিন পিকআপ এবং ১০ লাখ টাকার ৫টি মোটরসাইকেল কেনাকাটার চুক্তি ও ডেলিভারি শতভাগ নিশ্চিত করা হয়।

মোটরসাইকেল কেনার ফাইলটি তো একই দিনে (২৬ জুন ২০১৯) টেন্ডার খুলে, মূল্যায়ন শেষ করে, প্রজেক্ট ডিরেক্টরের অনুমোদন বাগিয়ে কার্যাদেশ পর্যন্ত দিয়ে দেওয়া হয়—যা সরকারি ক্রয়ের ইতিহাসে এক ‘অলৌকিক’ ঘটনা!শুধু তা-ই নয়, উন্মুক্ত দরপত্রের নিয়ম ভেঙে ল্যাপটপ, কম্পিউটার ও ডিজিটাল ক্যামেরা কেনাকাটায় সরাসরি ‘DPM’ পদ্ধতিতে নির্ধারিত ৬২ লক্ষ টাকার স্থলে উড়ানো হয়েছে ৮০ লক্ষ ১০ হাজার টাকা।

আইএমইডি স্পষ্ট ভাষায় একে “ক্রয় শৃঙ্খলার পরিপন্থী” বলে চিহ্নিত করেছে।ওয়াসার এই অন্তহীন সময়ক্ষেপণ এবং হঠকারিতা সহ্য করতে না পেরে ২০২০ সালের নভেম্বরে মাঝপথেই প্রজেক্টের মনিটরিং ও কোয়ালিটি চেকের কাজ ফেলে দেশ ছাড়ে আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কোরিয়ার ‘হানকুক ইঞ্জিনিয়ারিং’। ফলে পরবর্তী দীর্ঘ ৩ বছর চিনা ঠিকাদাররা কী মানের কাজ করল, তা দেখার মতো কোনো স্বাধীন আন্তর্জাতিক সংস্থাই প্রকল্পে ছিল না।

৫. অচল প্ল্যান্ট সচল রাখার নামে পৌনে ২০০ কোটির মেগা অপচয়সংযোগ লাইনের অভাবে দাশেরকান্দি প্ল্যান্টটি যখন বর্জ্য সংকটে ভুগছে, ঠিক তখনই এটি সচল রাখার নামে জনগণের ট্যাক্সের টাকা উড়ানো হয়েছে দুহাতে। আইএমইডি-এর ব্যয় বিভাজন সারণি বলছে, বর্জ্য না থাকা সত্ত্বেও প্ল্যান্টের বিদ্যুৎ বিল বাবদ প্রায় ৫৫ কোটি টাকা এবং প্ল্যান্টের জ্বালানি বাবদ পুরো ৫০ কোটি টাকাই খরচ দেখানো হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, বর্জ্য শোধনের কেমিক্যাল কিনতেই খরচ করা হয়েছে প্রায় ৭৭ কোটি টাকা। যে প্ল্যান্ট তার মূল উদ্দেশ্যই সফল করতে পারছে下 না, সেখানে পরিচালন ব্যয়ের নামে এই পৌনে দুই শত কোটি টাকার মেগা অপচয় কার পকেটে গেল, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে।

৬. চূড়ান্ত ফাঁদ ‘এগজিট প্ল্যান’: ঋণের বোঝা জনগণের ঘাড়েআইএমইডি রিপোর্টের ৮ নম্বর পৃষ্ঠার অফিশিয়াল ‘এগজিট প্ল্যান’ (Exit Plan)-এর দিকে তাকালে গা শিউরে ওঠার মতো এক চরম বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়।

দলিলে স্পষ্টাক্ষরে লেখা আছে—“বাস্তবায়নের পর, প্রকল্পটি DWASA-এর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ শাখায় স্থানান্তরিত হবে এবং পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আর্থিক প্রয়োজন DWASA রাজস্ব বাজেট থেকে পূরণ করা হবে”।যে মেগা প্রকল্প সংযোগ লাইনের অভাবে ১ টাকাও আয় করতে পারছে না, তার পেছনে প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকার বিদ্যুৎ বিল, কেমিক্যাল আর জ্বালানির এই বিশাল খরচ এখন টানতে হবে ঢাকা ওয়াসাকে।

ইতিমধ্যেই শত শত কোটি টাকার পুঞ্জীভূত লোকসানের বোঝা কাঁধে নিয়ে চলা ঢাকা ওয়াসা এই ‘শ্বেত হস্তী’র দৈনিক খরচ জোগাতে গিয়ে নিশ্চিতভাবেই দেউলিয়া হওয়ার পথে হাঁটবে। আর তার চূড়ান্ত খেসারত দিতে হবে রাজধানী ঢাকার সাধারণ মানুষকে—পানির দাম আর সুয়ারেজ বিলের মেগা মূল্যবৃদ্ধির অদৃশ্য চাবুক সহ্য করে।

সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার চাবি রইল চিনা ঠিকাদারের পকেটে, আর ঋণের চূড়ান্ত বোঝা চিরকালের জন্য চেপে বসল সাধারণ জনগণের ঘাড়ে।

এই বাংলা/এমএস

টপিক

এই সম্পর্কিত আরো খবর