কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি :
যখন বাগান শুরু করেন তখন গ্রামের মানুষ ‘পাগল’ বলে উপহাস করত সায়েদুল ইসলামকে। আজ তাঁর বাগান দেখতেই বিকেলে ভিড় জমায় দূর-দূরান্তের তরুণ-তরুণীরা। অভাবের তাড়নায় পড়াশোনা বন্ধ হওয়া যে যুবক ২০১০ সালে কাজের সন্ধানে পাড়ি জমিয়েছিলেন রাজধানী ঢাকায়, এক যুগ পর নিজ গ্রামে ফিরে তিনি ঘটিয়েছেন এক নীরব বিপ্লব।
কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলার ধরনীবাড়ী সরকারপাড়া গ্রামের মোঃ সায়েদুল ইসলাম প্রমাণ করেছেন, মাটি ও ফুলের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা আর পরিশ্রম থাকলে ভাগ্য বদলানো সম্ভব। মাত্র ১০-২০ শতক জমি থেকে শুরু হওয়া সেই যাত্রা আজ এক একরের বিশাল গোলাপ বাগানে রূপ নিয়েছে; যেখানে ফুটে থাকা লাল, হলুদ আর সাদা চায়না গোলাপগুলো যেন সায়েদুলের দীর্ঘদিনের হাড়ভাঙা খাটুনির এক একটি রঙিন হাসির প্রতিচ্ছবি।
মোহাম্মদ আলীর ছেলে মোঃ সায়েদুল ইসলাম (৪৫) একসময় প্রচণ্ড অভাবের মধ্য দিয়ে দিন কাটিয়েছেন। ঢাকার আগারগাঁওয়ে ফুলের আড়তে কাজ করার সময় যশোর থেকে আসা চাষিদের দেখে উদ্বুদ্ধ হন। ২০২২ সালে গ্রামে ফিরে যখন ফুল চাষের কথা ভাবেন, তখন জমি না থাকায় কেউ তাঁকে বিশ্বাস করতে চাইছিল না। এমনকি অনেকে তাঁকে ‘নাদান’ বা অবুঝ বলে ডাকত। কিন্তু দমে যাননি। ঋণ করে চারা কিনে শুরু করা সেই বাগান আজ তাঁকে এক একর জমির মালিক এবং একটি পাকা বাড়ির স্বপ্ন সারথি করে তুলেছে।
মোঃ সায়েদুল ইসলামের এই সাফল্যে বড় শক্তি তাঁর ছেলে মোঃ লিমন মিয়া। কোনো বাইরের শ্রমিক ছাড়াই বাবা-ছেলে মিলে সারাক্ষণ বাগানের পরিচর্যা করেন। সায়েদুলের ভাষায়, ‘ফুল হচ্ছে পবিত্র প্রেম, ফুলকে ভালোবেসে আমি মানুষকে ভালোবাসতে শিখেছি।’ তাদের এই পরিশ্রমের ফসল হিসেবে প্রতি দুই দিন পরপর ঢাকার আড়তে যাচ্ছে হাজার হাজার টাকার গোলাপ। বিশেষ করে ফেব্রুয়ারি মাসে ফুলের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় তাদের ব্যস্ততা এখন তুঙ্গে।
দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন
তবে বাগানের সফলতা এত সহজে আসেনি। পর্যাপ্ত জমি ছিল না। মাত্র দশ শতক জমি দিয়ে যাত্রা। শুরুতে যারা উপহাস করত, আজ তারাই সায়েদুলের বাগানে এসে শান্তি খুঁজে পায়। প্রতিবেশী আইয়ুব আলী বলেন, প্রথমে পাগলামী মনে হলেও এখন দেখছি সায়েদুলের কারণে আমাদের গ্রামটি ‘ফুলের গ্রাম’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। স্কুলের শিক্ষার্থী ববিতা আক্তার জানায়, এই বাগানটি এখন তাদের অবসরের বিনোদন আর মানসিক প্রশান্তির আধার।
মোঃ সায়েদুল ইসলামের স্বপ্ন এখানেই থেমে নেই। তিনি আগামীতে ৫ একর জমিতে ফুল চাষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। বর্তমানে তাঁর বাগানে ১৫ হাজার গাছ রয়েছে এবং বাড়তি আয়ের জন্য তিনি ৫শ’ কলম চারাও তৈরি করেছেন।
কৃষি কর্মকর্তা মোঃ শাহজাহান আলী এবং উলিপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোঃ মোশারফ হোসেন এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তারা জানান, ১২ মাসের ফুল চাষ এলাকার কৃষি অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
এই বাংলা/এমএস
টপিক

