কুড়িগ্রামের রাজারহাটে মাদ্রাসা কমিটির জালিয়াতি ফাঁস: নেই দান, তবু ’দাতা’ সদস্য

তদন্ত প্রতিবেদন শিক্ষা বোর্ডে

0
49
রাজারহাটে পাঠানহাট মহিলা দাখিল মাদরাসায় দাতা–প্রতিষ্ঠাতা নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ / ছবি - এই বাংলা

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি :

কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার পাঠানহাট মহিলা দাখিল মাদরাসায় নিয়মবহির্ভূতভাবে দাতা ও প্রতিষ্ঠাতা সদস্য নিয়োগ এবং পকেট কমিটি গঠনের মাধ্যমে ব্যাপক অনিয়মের তথ্য উন্মোচিত হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার কর্তৃক পরিচালিত তদন্তে জালিয়াতির প্রমাণ মেলায় গত ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাঠানো হলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় নি।

​তদন্ত প্রতিবেদনে জানা যায়, মাদরাসা সুপার ও প্রস্তাবিত ম্যানেজিং কমিটি বাতিলের দাবিতে দৈনিক সমকালের প্রতিনিধি ও রাজারহাট প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মোঃ আসাদুজ্জামান আসাদ বেশ কিছুদিন আগে মাদরসা শিক্ষাবোর্ডে একটি অভিযোগ দাখিল করেন।

অভিযোগের মূল বিষয় ছিল— মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের প্রবিধানমালা উপেক্ষা করে কোনো প্রকার আর্থিক অনুদান ছাড়াই জালিয়াতির মাধ্যমে দাতা ও প্রতিষ্ঠাতা সদস্য অন্তর্ভুক্ত করা এবং জমি সংক্রান্ত তথ্য গোপন করা।

পরে মাদরসা শিক্ষাবোর্ড থেকে রাজারহাটের উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর পত্র মারফত সংশ্লিষ্ট বিষয়টি তদন্তসাপেক্ষে প্রতিবেদন দাখিলের আহবান জানায় মাদরসা বোর্ড। পরে রাজারহাটের উপজেলা নির্বাহী অফিসার তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দেন।

​তদন্ত কমিটির পর্যালোচনায় দেখা গেছে, উক্ত মাদরাসার ম্যানেজিং কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে ২০০৯ সালের মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড (গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি) প্রবিধানমালার বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ধারা সরাসরি লঙ্ঘন করা হয়েছে। ​

প্রবিধানমালার ২ নং ধারা অনুযায়ী, দাতা সদস্য হতে হলে ন্যূনতম ২০ হাজার টাকা থেকে ১ লক্ষ টাকা এককালীন দান করা বাধ্যতামূলক ।বর্তমান ম্যানেজিং কমিটির দাতা সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত জনাব আলহাজ্ব হেলাল উদ্দিন আহমেদ এই অর্থ প্রদানের কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেননি।

প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হতে হলে প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক পর্যায়ে ৬ লক্ষ টাকা বা সমমূল্যের স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি দান করতে হয়। অথচ প্রতিষ্ঠাতা সদস্য আলহাজ্ব মনছুর আহমেদ কোনো বৈধ দলিল বা দানপত্র দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন, যা ধারা ৪-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন

​এছাড়া প্রবিধানমালার ৮ ও ১২ ধারা অনুযায়ী সদস্যদের যোগ্যতা যাচাই করা বাধ্যতামূলক। তদন্তে দেখা গেছে, কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই একটি ‘পকেট কমিটি’ গঠন করা হয়েছে, যেখানে ভুল ও জাল তথ্য দিয়ে সদস্য পদ দেওয়া হয়েছে।

মাদরাসা সুপার খাস জমিকে নিজের জমি দেখিয়ে জালিয়াতি করেছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র অনুযায়ী, খাস বা বিতর্কিত জমিতে মাদরাসা স্থাপন করে মালিকানা দাবি করা দণ্ডনীয় অপরাধ। এটি প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক স্বীকৃতির মৌলিক শর্তের পরিপন্থী।

​কমিটি গঠনে জালিয়াতি এবং নিয়োগ সংক্রান্ত অনৈতিক দাবির প্রমাণ মিলেছে সুপারের বিরুদ্ধে। প্রবিধানমালার ৪৫ ও ৪৬ ধারা অনুযায়ী, জালিয়াতি বা দুর্নীতির সাথে যুক্ত থাকলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।

রাজারহাট ​উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোঃ আল ইমরান স্বাক্ষরিত পত্রে জানানো হয়েছে যে, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় মাদরাসার সুপার ও প্রস্তাবিত ম্যানেজিং কমিটি তাদের দায় এড়াতে পারেন না। নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী প্রয়োজনীয় ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রতিবেদনটি শিক্ষা বোর্ডে পাঠানো হয়েছে।

​এ বিষয়ে মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান এর সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি জানান, “এই সমস্ত ঠুনকো অজুহাতে কমিটি ভেঙ্গে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মোঃ মনছুর আহমেদের সাথে মুঠো ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন প্রতিষ্ঠানকে আমি চেয়ার টেবিল দান করেছি এবং শুরু থেকে আমি দাতা সদস্য।”

রাজারহাট উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারঃ) মোঃ কামরুল ইসলাম বলেন, “নিয়ম বহির্ভূত ভাবে প্রতিষ্ঠাতা এবং দাতা সদস্য পদে কাউকে নেয়া হলে আইনগত ভাবে সেই কমিটি বৈধ হয় না।”

এই বাংলা/এমএস

টপিক 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here