কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি :
একাত্তরের রক্তঝরা দিনগুলোতে কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী উপজেলা ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অন্যতম বধ্যভূমি।
বিশেষ করে উপজেলার বালাবাড়ি রেলস্টেশন সংলগ্ন এলাকাটি মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব আর ত্যাগের এক জীবন্ত দলিল।
কিন্তু স্বাধীনতার ৫৪ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভটি আজ চরম অবহেলা, মাদকসেবীদের দৌরাত্ম্য আর প্রশাসনের উদাসীনতায় তার পবিত্রতা হারাতে বসেছে।
সরেজমিন দেখা যায়, একসময়ের গৌরবোজ্জ্বল এই স্মৃতিস্তম্ভটি এখন আগাছা আর ঝোপঝাড়ে ঢাকা এক জঙ্গলাকীর্ণ স্থান। সীমানা প্রাচীরের গ্রিল চুরি হয়ে গেছে অনেক আগেই।
স্তম্ভের দেয়ালে খোদাই করা শহীদদের নাম ও ইতিহাসের অনেক অংশই এখন অস্পষ্ট। দিনের বেলায় স্থানীয়রা এখানে অবাধে গরু বেঁধে রাখেন, কেউবা শুকোতে দেন কাপড় ও মাছ। এমনকি প্রবেশপথেই নাকে আসে প্রস্রাবের উৎকট দুর্গন্ধ।
রাতের অন্ধকার নামলেই বদলে যায় এই পবিত্র স্থানের দৃশ্যপট। নেই কোনো বৈদ্যুতিক বাতি বা নৈশপ্রহরীর ব্যবস্থা। বধ্যভূমির ভেতরে নির্মিত জরাজীর্ণ কক্ষে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখা গেছে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর প্যাকেট, সিগারেটের ফিল্টার ও গাঁজার অবশিষ্টাংশ।
স্থানীয় বাসিন্দা মোঃ মাহাতাব আলীর অভিযোগ, ‘রাতে এই পাশ দিয়ে হাঁটা যায় না। গাঁজার গন্ধে দম বন্ধ হয়ে আসে। প্রাচীর না থাকায় মাদকসেবীরা ভেতরে অবাধে আড্ডা জমায়।’
১৯৭১ সালের ১১ নম্বর সেক্টরের অধীনে চিলমারীর তিনটি স্থানে নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল পাকিস্তানি বাহিনী। ১৭ অক্টোবর সেক্টর কমান্ডার কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে চিলমারী শত্রুমুক্ত হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে অন্তত ২০ মুক্তিযোদ্ধার শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়ে পালিয়েছিল হানাদাররা। সেই সব শহীদের রক্তে ভেজা মাটিতেই গড়ে তোলা হয়েছিল এই স্মৃতিস্তম্ভ।
দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন
স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা কর্ণধর বর্মা ব্যথিত কণ্ঠে বলেন, ‘আমাদের সহযোদ্ধাদের এখানে নির্মমভাবে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। আজ সেই পবিত্র মাটিতেই লোকে প্রস্রাব করে, গরু বাঁধে– এটা দেখার কেউ নেই। প্রশাসনের কোনো উদ্যোগ আজ অবধি চোখে পড়েনি।’
কেবল বিজয় দিবস বা স্বাধীনতা দিবসে লোক-দেখানো ফুল আর মোমবাতি জ্বালানো ছাড়া সারা বছর কেউ এর খবর রাখে না বলে আক্ষেপ করেন আরেক বাসিন্দা আহসান হাবিব। বীর শহীদদের সম্মান রক্ষার্থে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে এই বধ্যভূমিটির আধুনিকায়ন ও যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি মনে করেন তিনি।
চিলমারী উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ক মোঃ আব্দুর রহিম সরকার জানান, তারা বারবার প্রশাসনকে জানিয়েও কোনো প্রতিকার পাননি।
এ বিষয়ে চিলমারীর বিদায়ী চিলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সবুজ বসাকের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলেন, ‘বিষয়টি অবগত হলাম। অতি দ্রুত এই বধ্যভূমিটি সংস্কার ও সংরক্ষণের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
এই বাংলা/এমএস
টপিক

