
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি :
কুড়িগ্রামের চারটি সংসদীয় আসনে ধানের শীষ প্রতীকের কোনো প্রার্থীই জয়লাভ করতে পারেননি। নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর দলীয় নেতাকর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা। অভিযোগ উঠেছে—দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দল, নেতৃত্বের অদক্ষতা, গ্রুপিং, বিতর্কিত ব্যক্তিদের কমিটিতে অন্তর্ভুক্তি, ভোট সমীকরণের জটিল হিসাব ও স্থানীয় সমন্বয়হীনতার কারণেই এমন ভরাডুবি হয়েছে।
দলীয় সূত্র ও প্রার্থীদের বক্তব্য অনুযায়ী, কুড়িগ্রাম জেলা আহ্বায়ক মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফার নেতৃত্ব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তোষ ছিল। নিজের বলয়ে কমিটি গঠন, বিতর্কিতদের পদায়ন এবং রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্যতার সংকট—এসব ইস্যু ভোটের সময় সামনে আসে। তার নাগরিকত্ব সংক্রান্ত একটি মামলা উচ্চ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে—এমন আলোচনাও মাঠে প্রভাব ফেলেছে বলে দাবি তৃণমূলের।
কুড়িগ্রাম-১-এ গ্রুপিংয়ে ডুবলেন রানা: নাগেশ্বরী ও ভূরুঙ্গামারী উপজেলা নিয়ে গঠিত কুড়িগ্রাম-১ আসনের প্রার্থী মোঃ সাইফুর রহমান রানা পরাজয়ের জন্য সরাসরি কুড়িগ্রাম জেলা নেতৃত্বকে দায়ী করেছেন।
রানা বলেন, ‘আমার হারার পেছনে কুড়িগ্রাম জেলা আহ্বায়কের সরাসরি ভূমিকা আছে। নাগেশ্বরী ও ভূরুঙ্গামারী উপজেলা কমিটিকে আমাকে হারাতে ইন্ধন দেওয়া হয়েছে। শুধু আমার আসন নয়, চারটি আসনেই অদক্ষ নেতৃত্বের কারণে ভরাডুবি হয়েছে।’
ভূরুঙ্গামারী উপজেলা বিএনপির সদস্য মোঃ রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘মাঠে কর্মীরা একসঙ্গে কাজ করেনি। জেলা নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থা ছিল শুরু থেকেই।’
ভোটের ফলাফল দাঁড়িপাল্লা ১,৩৪,৬৪৮। ধানের শীষ ১,১৭,৩৫৬। ব্যবধান ১৭২৯২।
কুড়িগ্রাম-২-এ বিতর্কিত নেতৃত্ব ও ভোট সমীকরণ: সদর, রাজারহাট ও ফুলবাড়ী উপজেলা নিয়ে গঠিত
কুড়িগ্রাম-২ আসনে অভ্যন্তরীণ বিরোধ ছিল তীব্র। সদর উপজেলা কমিটির আহ্বায়ক-সদস্য সচিবকে নিয়ে নানা বিতর্ক ছিল। টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজি, হাটের ইজারাদারির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাদেরই দায়িত্ব দেওয়া হয়—এমন অভিযোগ উঠেছে। সদর পৌর কমিটির বিরুদ্ধেও রয়েছে একই অভিযোগ, এ কমিটির সদস্য সচিব জাতীয় পার্টি থেকে এসেই জেলা আহ্বায়ককে ম্যানেজ করে এমন গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়ে নিয়ে টেন্ডারবাজিতে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগও ভোটে প্রভাব ফেলেছে।
কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও অতিরিক্ত পিপি আশরাফ আলী বলেন, ‘৫১ সদস্যের জেলা কমিটির বেশিরভাগ সদস্যকে সম্পৃক্ত করা যায়নি। মাঠে সমন্বয় ছিল না।’ কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোস্তাফিজার রহমানের বিরুদ্ধে ভারতীয় নাগরিকত্বের মামলার বিষয়টি এবং তার অনুগতদের দিয়ে সদর উপজেলা ও পৌর বিএনপির কমিটি ছিল বিতর্কিত, অনেক নিবেদিত ও যোগ্য নেতা ছিলেন, যাদের ব্যক্তিস্বার্থে দায়িত্ব দেননি তিনি। তিনি নিজেই নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান হন।
এ আসনে জামায়াত সমর্থিত ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ড. আতিক মুজাহিদ এবং বিএনপি প্রার্থী সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদের মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতাও আলোচনায় ছিল।
কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আবু দারদা হেলাল বলেন, কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হাসিবুর রহমান হাসিবের সঙ্গে কায়কোবাদের দীর্ঘদিনের বিরোধও ভোটে প্রভাব ফেলেছে বলে অভিযোগ।
এ ছাড়া যুগ্ম আহ্বায়ক হাসিবুর রহমান হাসিবের স্ত্রী আফিয়া চৌধুরী জামায়াতের সক্রিয় সদস্য হওয়ায় তাকে ধানের শীষের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে দেখা যায়নি। বিজয়ী এনসিপির প্রার্থী ড. আতিক মুজাহিদ বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হাসিবুর রহমানের নিকট আত্মীয় হওয়ায় প্রকাশ্যে ধানের শীষের পক্ষে থাকলেও ভেতরে ভেতরে এনসিপির পক্ষে কাজ করার অভিযোগ রয়েছে। তবে এ ব্যাপারে হাসিবুর রহমানের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, ‘কুড়িগ্রাম-২ আসনে আওয়ামী লীগ ও হিন্দু অধ্যুষিত কেন্দ্রগুলোতে জামায়াত সমর্থিত এনসিপি প্রার্থী তুলনামূলকভাবে কম ভোট পেয়েছেন। বিএনপি যে ভোট পেয়েছে, তার একটি বড় অংশ এসেছে এসব এলাকা থেকে। তবে দলীয় ঐক্য না থাকায় সেটি জয়ে রূপ নেয়নি।’
ভোটের ফলাফল শাপলাকলি প্রতীক ১,৭৯,৩৮৬। ধানের শীষ-১,৬৯,৩৮৬। ভোটের ব্যবধান ১০৪০০।
কুড়িগ্রাম-৩-এ খালেক-তাসভীর দ্বন্দ্বে বিপর্যয়: উলিপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত কুড়িগ্রাম-৩ আসনের বিএনপি প্রার্থী তাসভীর উল ইসলামের সঙ্গে কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল খালেকের দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল প্রকাশ্য।
দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন
তাসভীর উল ইসলাম বলেন, ‘খালেক ও তার গ্রুপ আমাকে জিততে দেবে না—এ কথা আমি একাধিকবার বিভাগীয় ও কেন্দ্রীয় নেতাদের জানিয়েছি। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। মাঠে তারা ধানের শীষে ভোট দেয়নি।’
স্থানীয় ভোটার মোঃ আব্দুল করিম বলেন, ‘আমরা বিভ্রান্ত ছিলাম। দলীয় নেতারাই যদি একে অপরের বিরুদ্ধে কাজ করে, সাধারণ ভোটার কী করবে?’
ভোটের ফলাফল দাঁড়িপাল্লা ১,০৫,৫৯৪। ধানের শীষ ৭৭৯৬৩। ব্যবধান ২৭৬৩১।
কুড়িগ্রাম-৪-এ নিষ্ক্রিয়তা ও স্বতন্ত্র ফ্যাক্টর: চিলমারী, রৌমারী ও রাজীবপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত কুড়িগ্রাম-৪ আসনে চিলমারী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আব্দুল বারী সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ আছে, প্রকাশ্যে ধানের শীষের পক্ষে থাকলেও ভেতরে ভেতরে স্বতন্ত্র প্রার্থী রোকনুজ্জামান শাহিনের পক্ষে কাজ করেছেন।
এ আসনের প্রার্থী মোঃ আজিজুর রহমান বলেন, ‘দলীয় নেতৃত্বের পূর্ণ সহযোগিতা পাইনি। বিশেষ করে চিলমারী উপজেলা থেকে কাঙ্ক্ষিত সমর্থন মেলেনি।’
রৌমারী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোঃ আব্দুর রাজ্জাকের নিষ্ক্রিয়তাকেও অনেকেই ভরাডুবির কারণ হিসেবে দেখছেন।
ভোটের ফলাফল দাঁড়িপাল্লা ৭৮,৯৪৩। ধানের শীষ ৫৭,৯৪৫। ব্যবধান ২০,৯৯৮।
আওয়ামী ও হিন্দু ভোটের প্রভাব: রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কুড়িগ্রামের বিভিন্ন আসনে আওয়ামী ঘরানার ও হিন্দু ধর্মাবলম্বী ভোটারদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কুড়িগ্রাম-২ ও কুড়িগ্রাম-৩ আসনে হিন্দু ও আওয়ামী অধ্যুষিত কেন্দ্রগুলোতে বিএনপি প্রার্থী জামায়াত প্রার্থীর তুলনায় বেশি ভোট পেয়েছেন।
একজন স্থানীয় শিক্ষক বলেন, ‘হিন্দু ও আওয়ামী ভোটারদের একটি অংশ কৌশলগতভাবে ভোট দিয়েছে। তবে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল না থাকলে ফল ভিন্ন হতে পারত।’
অন্যদিকে, কুড়িগ্রাম-১ ও কুড়িগ্রাম-৪ আসনে আওয়ামী ও হিন্দু ভোটারদের বড় অংশ নিজ নিজ পছন্দের প্রার্থীদের ভোট দিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এসব ভোট না থাকলে বিএনপির ফল আরও খারাপ হতে পারত।
দেখা যাচ্ছে, কুড়িগ্রামে ধানের শীষ প্রতীকের ভরাডুবির পেছনে একক কোনো কারণ নয়; বরং নেতৃত্ব সংকট, গ্রুপিং, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, বিতর্কিত নেতৃত্ব, স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রভাব এবং ভোট সমীকরণের জটিল সমন্বয় কাজ করেছে।
এই বাংলা/এমএস
টপিক
