নেত্রকোনা প্রতিনিধি :
ভাষা আন্দোলনের রক্তস্নাত ইতিহাস বুকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে থাকা শহীদ মিনার কেবল একটি স্থাপনা নয়—এটি বাঙালির আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা ও মাতৃভাষার প্রতি অঙ্গীকারের প্রতীক। অথচ নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার নাজিরপুর বাজার এলাকায় অবস্থিত নাজিরপুর শহীদ মিনার প্রাঙ্গণেই নিয়মিত বসছে সাপ্তাহিক কাঁচাবাজার। এতে একুশের স্মৃতিস্তম্ভ ঘিরে তৈরি হচ্ছে বাজারের কোলাহল।
সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রতি বৃহস্পতিবার শহীদ মিনারের বেদি ও সিঁড়ি ঘিরে স্তূপ করে রাখা হয় বাঁধাকপি, মিষ্টিকুমড়া, লাউ, বেগুনসহ নানা কৃষিপণ্য। বস্তা ওঠানামা, দাঁড়িপাল্লার ঝনঝন শব্দ আর ক্রেতা–বিক্রেতার হাঁকডাকে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। বিস্ময়ের বিষয়, অনেকেই জুতা পায়ে অনায়াসে উঠে পড়ছেন মিনারের বেদিতে।
দিন শেষে সেখানে পড়ে থাকে পচা সবজি, পলিথিন ও আবর্জনার স্তূপ। যে স্থানে মাথা নত করে ফুল দেওয়ার কথা, সেখানে ছড়িয়ে থাকে ময়লা ও দুর্গন্ধ।
স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, এটি শুধু অব্যবস্থাপনা নয়, ইতিহাস ও ভাষাশহিদদের আত্মত্যাগের প্রতিও অবমাননা। তাঁদের ভাষ্য, প্রতিবছর ২১ ফেব্রুয়ারিকে সামনে রেখে দায়সারাভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা করা হয়। ফুলেল শ্রদ্ধা, বক্তৃতা ও আলোকচিত্রে সাজে প্রাঙ্গণ। কিন্তু দিনটি পার হলেই আবার ফিরে আসে বাজারের দখল।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ‘শহীদ মিনার কি শুধু এক দিনের জন্য? সারা বছর যদি এখানে বাজার বসে, তাহলে একুশের চেতনা আমরা কোথায় ধারণ করছি?’
দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন
অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে চলমান হাটে নির্দিষ্ট জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়েছে। বিকল্প স্থান না থাকায় বাধ্য হয়েই তাঁরা মিনারের আশপাশে বসছেন। প্রশাসন উপযুক্ত স্থান নির্ধারণ করলে তাঁরা সরে যেতে প্রস্তুত বলেও জানান।
এ বিষয়ে নাজিরপুর ইউনিয়নের প্রশাসক মিজানুর রহমান বলেন, বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবহিত করা হবে।
কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুদুর রহমান বলেন, ‘দায়িত্ব নেওয়ার পর বিষয়টি জানতে পেরেছি। খোঁজ নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
প্রশ্ন থেকেই যায়—আমরা কি শহীদদের স্মরণ করি কেবল আনুষ্ঠানিকতায়? শহীদ মিনার কোনো হাটের চত্বর নয়; এটি জাতির আত্মার স্মৃতিস্তম্ভ। একুশের চেতনা যদি সত্যিই আমাদের রক্তে প্রবাহিত হয়, তবে তার সম্মানও হতে হবে প্রতিদিনের, প্রতিক্ষণের।
শহীদ মিনারের বেদিতে শাকসবজির স্তূপ শুধু দৃষ্টিকটু নয়, এটি আমাদের সামষ্টিক উদাসীনতারও প্রতিচ্ছবি। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি কত দ্রুত বাস্তবে রূপ নেয় এবং আমরা নাগরিক হিসেবে আমাদের ইতিহাস ও স্মৃতিচিহ্ন রক্ষায় কতটা সচেতন হই।
এই বাংলা/এমএস
টপিক

