টাঙ্গাইল প্রতিনিধি :
গণ-অভ্যুত্থানের পরবর্তী রাজনৈতিক উত্তাপে সরগরম হয়ে উঠেছে টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসন। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই এই আসনে বাড়ছে নির্বাচনী উত্তেজনা। নির্বাচনের আগে মাঠজুড়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। চলছে গণসংযোগ, ব্যানার-ফেস্টুনে ভরে গেছে শহর ও গ্রাম। চায়ের দোকান থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক সবখানেই চলছে প্রার্থীদের নিয়ে আলোচনা ও বিশ্লেষণ।
নির্বাচন অফিস সূত্রে জনা যায়, ঘাটাইল পৌরসভা ১২টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এ আসনে মোট ভোটার তিন লাখ ৫৯ হাজার ৩৮০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার এক লাখ ৮০ হাজার ৪৯৩ জন, মহিলা ভোটার এক লাখ ৭৮ হাজার ৮৮৫ জন এবং হিজড়া ভোটার ২ জন। আসনটিতে পুরুষ এবং নারী ভোটার প্রায় আনুপাতিক সমান হওয়ায় নারী ভোটরদের ভোটে প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারণ হবে। প্রত্যেক দল নারী ভোটারদের ভোট টানতে কাজ করে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে।
এ আসনটিতে বিএনপি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, গণসংহতি আন্দোলন, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, জাতীয় পার্টি, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও জাকের পার্টিসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় বিএনপি। দলটির হেভিওয়েট তিন প্রার্থীসহ মোট সাতজন সম্ভাব্য প্রার্থী এখন মাঠে সরব। এর মধ্যে দলটি আজাদ ও নাসির দুই গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।
গত ৩৭ বছর ধরে ঘাটাইল আসনে বিএনপির মুখ ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা লুৎফর রহমান খান আজাদ। ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালে টানা চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। মন্ত্রিসভায় থেকেও দায়িত্ব পালন করেন তিনবার। তার হাতেই ঘাটাইলে হয়েছে অসংখ্য উন্নয়ন প্রকল্প, স্কুল, কলেজ, মাদরাসা, হাসপাতাল, পৌরসভা, ব্রিজ-কালভার্টসহ নানা অবকাঠামো। এ জন্যই তিনি ‘আধুনিক ঘাটাইলের রূপকার’ হিসেবে পরিচিতি পান। ২০১৮ সালের নির্বাচনে তিনি বিএনপির প্রার্থী হলেও ভোট বর্জন করেছিলেন। কিন্তু এবার দলীয় মনোনয়ন পেতে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন তিনি।
বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য তরুণ নেতা অ্যাডভোকেট ওবায়দুল হক নাসির এখন মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে আছেন। ছাত্রদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক এই নেতা গত কয়েক বছরে ঘাটাইল বিএনপিকে পুনর্গঠন করেছেন। তিনি ইউনিয়ন ও পৌরসভায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন, তৃণমূলে সভা-সমাবেশ এবং দলীয় ৩১ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন। তরুণ প্রজন্মের নেতাকর্মীদের মধ্যে তার প্রতি উচ্ছ্বাস দেখা গেলেও সিনিয়র নেতাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে।
অন্যদিকে, দলীয় অভ্যন্তরে আজাদ বিরোধী অনেক নেতার অভিযোগ দীর্ঘ দিন ঘাটাইল বিএনপি অভিভাবকহীন ছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে শত শত নেতাকর্মী মামলা-হামলার শিকার হলেও আজাদ তাদের পাশে ছিলেন না। তৃণমূলে মূল্যায়নের অভাবেও ক্ষোভ জমেছে তার বিরুদ্ধে। এই সুযোগে নাসির নিজের অবস্থান শক্ত করেছেন। তবে আজাদের অনুসারীরা বলছেন, ঘাটাইলের প্রতিটি উন্নয়নে আজাদের অবদান আছে। ঘাটাইলবাসীই নির্ধারণ করবে, কে তাদের এমপি হবেন।
এদিকে, দলের আরেক হেভিওয়েট প্রার্থী বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও পূর্ব ঘাটাইলের কৃতী সন্তান মাইনুল ইসলামও মনোনয়নপ্রত্যাশী। ২০১৮ সালের নির্বাচনে তিনিও সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকায় ছিলেন। পাহাড়ি অঞ্চলে তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। দলের দুঃসময়ে রাজপথে থেকে সংগঠনের প্রতি অঙ্গীকার ও ত্যাগের জন্য তৃণমূলের একটি বড় অংশ তাকে সমর্থন দিচ্ছে।
অন্যদিকে, বিএনপির অভ্যন্তরীণ ত্রিমুখী দ্বন্দ্বের বিপরীতে সংগঠিত ও নিরবভাবে নির্বাচনী প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির একক প্রার্থী অধ্যক্ষ হুসনী মোবারক বাবুল ইতোমধ্যে মাঠে নেমেছেন। জুলাই আন্দোলনে শহীদ পরিবারের পাশে থাকা, মানবিক কার্যক্রম ও সামাজিক ভূমিকার কারণে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে জামায়াতের প্রতি ইতিবাচক সাড়া মিলছে। বাবুল বলেন, আমরা মানুষের সাথে থেকে কাজ করছি, মানুষের আস্থা অর্জনই আমাদের মূল শক্তি।
এদিকে আলোচনায় রয়েছেন কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি ও যুবদলের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক খলিলুর রহমান খলিল, কেন্দ্রীয় যুবদলের সহসভাপতি জাহিদুর রহমান দিপু সরকার এবং তরুণ শিল্পপতি ও ছাত্রনেতা শামীম মিয়া। বিএনপির কেন্দ্রীয় যুবদল নেতা মিয়া রাসেলও মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী রেজাউল করিম, গণসংহতি আন্দোলনের মোফাখারুল ইসলাম, এনসিপির উত্তরাঞ্চলের যুগ্ম মুখ্য সংগঠক সাইফুল্লাহ হায়দার এবং জাকের পার্টির আ: আজিজ খান অটলও নির্বাচনী প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানিয়েছে দলীয় সূত্র।
ভোটারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘ রাজনৈতিক সহিংসতা, মামলা-হামলা ও অস্থিরতায় তারা ক্লান্ত। এখন তারা উন্নয়ন, শান্তি ও কর্মসংস্থান চায়। একজন ভোটার বলেন, আমরা এমন নেতা চাই, যিনি দলবাজি বা চাঁদাবাজি নয়, বরং মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলবেন। নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক মাস বাকি। ঘাটাইল আসনের রাজনীতিতে এখন প্রশ্ন একটাই দীর্ঘ দিনের প্রভাবশালী নেতা আজাদ কি আবারো মনোনয়ন পাবেন, নাকি তরুণ নাসির ও মাইনুল ইসলামের নেতৃত্বে বিএনপিতে আসবে প্রজন্ম পরিবর্তন? আর বিএনপির এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের ফায়দা তুলে নিতে প্রস্তুত জামায়াতে ইসলামী, যারা এবার একক প্রার্থী নিয়ে মাঠে বেশ সক্রিয় ও সংগঠিত।
এই বাংলা/এমএস
টপিক

