ঋণ পেতে আইএমএফের শর্ত পূরণ করতে পারেনি এনবিআর

0
71
প্রতিকী ছবি

এই বাংলা ডেস্ক নিউজ :

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় ঘাটতি ছিল। এদিকে আইএমএফের ঋণ বিতরণের অন্যতম শর্ত ছিল রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা। এই শর্ত গত তিন অর্থবছর পূরণ করতে পারেনি এনবিআর। শুধু লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পিছিয়ে আছে এমন নয়, এছাড়া দেশে কর-জিডিপি অনুপাত গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন এবং এশিয়া প্যাসিফিকের ৩৭ টি দেশের মধ্যে কর আদায়ে সর্বশেষ স্থানে বাংলাদেশ।

আইএমএফের এবারের দল সংস্থাটির ‘পরিমাণগত কর্মক্ষমতা মানদণ্ড’ (কোয়ান্টিটেটিভ পারফরম্যান্স ক্রাইটারিয়া বা কিউপিসি) পূরণ নিয়ে বেশি দিচ্ছে। কিউপিসি হচ্ছে আইএমএফের বাধ্যতামূলক শর্ত। গত মে মাসে কিউপিসির কিছু শর্ত যুক্ত হয়েছে। এগুলো হচ্ছে বিদেশি ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে সীমা নির্ধারণ, জ্বালানি ও সার আমদানির বকেয়া পরিশোধ এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ।

গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। পরে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ৩ লাখ ৭০ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা বা ১৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ কম আদায় হয়েছে।

  • ঋণ পেতে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের শর্ত ছিলো আইএমএফের
  • গত তিন অর্থবছর এ শর্ত পূরণ করতে পারেনি এনবিআর
  • ষষ্ঠ কিস্তির অর্থছাড়ের আগে আইএমএফের একটি দল এ মাসেই ঢাকায় আসছে

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, গত অর্থবছরে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল ছিল। যার প্রভাব রাজস্ব আদায়ে পড়ে। রাজস্ব খাতকে সংস্কারে উদ্যোগ নিলেও বাস্তবায়নে যথাযথ সমন্বয়হীনতার কারণে এনবিআরে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। এছাড়া নীতিগত ত্রুটি, করফাঁকি, দুর্নীতির কারণে রাজস্ব বোর্ড রাজস্ব আদায় বাড়াতে পারে না। লক্ষমাত্রাও অর্জন করতে পারে না। গত বছর এনবিআরের আন্দোলনের কারণে রাজস্ব আহরণে বড় অঙ্কের ঘাটতি হয়ে যায়।

এইএমএফের-এর শর্ত অনুযায়ী, এনবিআর কর নীতি ও কর আদায়/প্রশাসন কার্যক্রম আলাদা করে দুটি বিভাগ গঠন করার প্রস্তাব রয়েছে।

আইএমএফের শর্তপূরণে এনবিআরকে দুইটি ভাগে বিভাজন করে গত ১২ মে একটি অধ্যাদেশ জারি করা হয় । অধ্যাদেশে বলা হয়, এনবিআরকে বিলুপ্ত করে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব বাস্তবায়ন নামে দুটি ভাগ করা হবে। অধ্যাদেশের বিভিন্ন দিকের সংস্কার নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আন্দোলন শুরু করে। এই আন্দোলন টানা দুমাস চলে। এতে এনবিআরের পুরো কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দেয়। আন্দোলনটি সর্বোচ্চ রাজস্ব আহরণের মাস মে-জুনে হয়। আন্দোলনের কারণে রাজস্ব আদায় অনেক কম হয়েছে গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে।

বাংলাদেশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি আইএমএফ ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন করে। এরপর ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম কিস্তির ৪৭ কোটি ৬৩ লাখ ডলার, একই বছরের ডিসেম্বরে দ্বিতীয় কিস্তির ৬৮ কোটি ১০ লাখ ডলার, ২০২৪ সালের জুনে তৃতীয় কিস্তির ১১৫ কোটি ডলার এবং ২০২৫ সালের জুনে চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তির ১৩৩ কোটি ডলার পেয়েছে বাংলাদেশ।

সাত কিস্তিতে সাড়ে তিন বছরে আইএমএফ ৪৭০ কোটি ডলার দেবে বলেছিল। আইএমএফ থেকে মোট পাওয়া গেছে ৩৬৪ কোটি ডলার। বাকি আছে ১০৬ কোটি ডলার। এর মধ্যে গত জুন মাসে আইএমএফের পর্ষদ বাংলাদেশের ঋণ কর্মসূচির মেয়াদ বাড়িয়েছে ছয় মাস এবং বাড়তি ৮০ কোটি ডলারও যুক্ত করেছে। কিস্তির সংখ্যাও এখন ৭ থেকে বেড়ে ৮টি হয়েছে। ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচি বেড়ে এখন ৫৫০ কোটি ডলারের হয়েছে। ফলে মোট পাওয়ার বাকি এখন ১৮৬ কোটি ডলার। আর নতুন সময়সীমা অনুযায়ী ঋণ কর্মসূচির মেয়াদ শেষ হবে ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে।

এরআগে, মোটা দাগে মুদ্রাভাণ্ডার বলেছে যে তাদের দেয়া শর্ত পূরণ না করার কারণে চতুর্থ কিস্তির ঋণ সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে এবং বাংলাদেশ সরকার বলেছে যে কিছু কিছু দেয়া শর্ত এখনই মানা সম্ভব নয়। বৈশ্বিকভাবে এ জাতীয় ঘটনা আন্তর্জাতিক মুদ্রাভাণ্ডারের জন্য নতুন কিছু নয়। কঠিন শর্তসাপেক্ষে উন্নয়নশীল দেশে ঋণ দেয়া এবং সেসব শর্ত কঠোরভাবে পালন না হলে ঋণ স্থগিত করা মুদ্রাভাণ্ডারের কর্মসংস্কৃতির এক উল্লেখযোগ্য অংশ।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, এনবিআরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা আগে তিনবার অর্জন করা হয়নি। এখন অর্জন করা না গেলে অব্যাহতি নিতে হবে। অব্যাহতি আর পাওয়া যাবে কি না, তা একটা বড় প্রশ্ন। এটা নিয়ে আলোচনা চলবে বোঝা যাচ্ছে। জাহিদ হোসেন আরও বলেন, মুদ্রা বিনিময় হারের চর্চাটা বদলে গেছে। এখন আর বলে দেওয়া হচ্ছে না কত হবে। আর ঋণ পুনঃতফসিল নীতিমালা আগের মডেলেই করা হয়েছে। এসব নিয়েও প্রশ্ন তুলতে পারে আইএমএফ।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বাংলাদেশে চলমান ঋণ কর্মসূচি থেকে ষষ্ঠ কিস্তির অর্থছাড়ের আগে আইএমএফের একটি দল আবারও ঢাকায় আসছে। ১৩ থেকে ১৭ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভা। ওই সভার পর আইএমএফের দলটি ঢাকায় আসবে ২৯ অক্টোবর। দলটি বাংলাদেশে থাকবে দুই সপ্তাহ।

আইএমএফের গবেষণা বিভাগের উন্নয়ন সামষ্টিক অর্থনীতি শাখার প্রধান ক্রিস পাপাজর্জিওর নেতৃত্বাধীন দলটি শুরু থেকে পঞ্চম কিস্তির অর্থছাড়ের সঙ্গে সম্পর্কিত শর্ত পূরণের অগ্রগতি পর্যালোচনা করবে। এ জন্য দলটি বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বিদ্যুৎ বিভাগ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে বৈঠক করবে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, বাংলাদেশের কর রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা এখন উন্নয়ন অর্থায়নের জন্য বড় সীমাবদ্ধতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের উন্নয়ন অর্থায়ন এখন সম্পূর্ণভাবে ঋণনির্ভর। ঋণের বোঝা এবং ঋণ পরিশোধের দায় ক্রমেই বাড়ছে। বাস্তবে আমরা এখন আগের ঋণ শোধ করছি নতুন ঋণ নিয়ে।

তিনি আরো বলেন, কর সংস্কার এমনভাবে করতে হবে যাতে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ে। এজন্য দুটি মৌলিক দিক জরুরি— কর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও কর ফাঁকি রোধ। এই প্রক্রিয়াকে হতে হবে স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক ও জবাবদিহিমূলক। মধ্যমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি অপরিহার্য। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এখন পর্যন্ত রাজনৈতিক নেতৃত্ব এই প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিত— হয় ইচ্ছাকৃতভাবে, নয়তো চাহিদার অভাবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে বুঝতে হবে, কর সংস্কার না হলে তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলোও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না।

এই বাংলা/এমএস

টপিক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here