বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:০৭ পূর্বাহ্ন

সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের আমলনামা: তোষামোদের রাজনীতি ও বিরোধী নিধন

এইবাংলা অনলাইন
  • প্রকাশকালঃ রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২৬

মোহাম্মদ মোশার্রাফ হোছাইন খান :

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভারসাম্য রক্ষার জন্য স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অভিভাবকের পদটি অপরিসীম গুরুত্ব বহন করে। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর মতো একটি স্বাধীন সংস্থাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার এবং পরবর্তীতে তার বিনিময়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদ লাভ করার সবচেয়ে বিতর্কিত উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন দেশটির ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। ২০১১-২০১২ সালের বহুল আলোচিত পদ্মা সেতু কেলেঙ্কারিতে তৎকালীন ক্ষমতাশীনদের আইনি ‘ক্লিনচিট’ বা দায়মুক্তি দেওয়া এবং একই সাথে প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক নেতৃত্বকে আইনি জালে অবরুদ্ধ করার যে ছক বাস্তবায়িত হয়েছিল, মো. সাহাবুদ্দিন ছিলেন তার অন্যতম প্রধান প্রশাসনিক কারিগর। একটি স্বাধীন ওয়াচডগ (Watchdog) প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে থেকে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুর প্রতি প্রদর্শিত এই নিরঙ্কুশ আনুগত্যই পরবর্তীতে দেশের সব জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে টপকে ২০২৩ সালে তাঁকে দেশের রাষ্ট্রপতি পদে আসীন করার মূল সমীকরণ হিসেবে কাজ করে। তবে ২০১৭ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকে অডিট প্রধান হিসেবে তাঁর উপস্থিতি ঘিরে এস আলম গ্রুপের হাজার কোটি টাকার আর্থিক জালিয়াতি, তাঁর পরিবারের অনৈতিক ক্ষমতার দাপট এবং ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র নিয়ে তাঁর স্ববিরোধী বক্তব্য—সব মিলিয়ে তাঁর পুরো মেয়াদকালটি কেবল দেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর চরম নৈতিক স্খলনের দলিলই নয়, বরং তা বাংলাদেশের সমসাময়িক ইতিহাসে এক নজিরবিহীন সাংবিধানিক নৈতিকতার সংকট হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

প্রাথমিক জীবন ও আনুগত্যের রাজনৈতিক ইতিহাস

১৯৪৯ সালে পাবনায় জন্মগ্রহণকারী মো. সাহাবুদ্দিন ১৯৭১ সালে পাবনায় ছাত্ররাজনীতি ও মুক্তিযুদ্ধে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনোবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর (MSc) ও এলএলবি (LLB) সম্পন্ন করে বিসিএস (বিচার) ক্যাডারে যোগ দেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর তিনি তিন বছর কারাবন্দী ছিলেন এবং ২০০৬ সালে জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে অবসর নেন।

অবসরের পর তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নে তাঁর দৃশ্যমান ভূমিকা শুরু হয়:

  • ‘সাহাবুদ্দিন কমিশন’ (২০০১-উত্তর সহিংসতা) ও দলীয় বয়ান: ২০০১ সালের ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা তদন্তে ২০০৯ সালে গঠিত ‘বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন’-এর প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পান সাবেক বিচারক মুহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। ২০১১ সালের ২৪ এপ্রিল তিনি ৩ সদস্যের কমিশনের রিপোর্ট দাখিল করেন, যা পরবর্তীতে ১ এপ্রিল ২০১৪ তারিখে বাংলাদেশ গেজেটে (অতিরিক্ত সংখ্যা, পৃষ্ঠা ১১০৯৩–১১১৪০) প্রকাশিত হয়।
    গেজেটের নথি অনুযায়ী, এই কমিশন ভোলা জেলাসহ বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত সহিংসতাকে ‘মানবতাবিরোধী সহিংসতা’ ও ‘মধ্যযুগীয় বর্বরতা’ হিসেবে অ্যাখ্যা দেয়। ভোলার লালমোহনের ‘ভেন্ডারবাড়ী’ গণধর্ষণ কেলেঙ্কারি, ‘জয়ন্তী-সংগ্রাম’ ট্র্যাজেডি এবং চরছকিনা গ্রামে খোরসেদ আলম হত্যাকাণ্ডের মতো লোমহর্ষক ঘটনাগুলো চিহ্নিত করে তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও জামায়াত সমর্থিত ২৫ হাজার ক্যাডার এবং স্থানীয় শীর্ষ নেতাদের সুনির্দিষ্টভাবে অভিযুক্ত করে কমিশন। আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরপেক্ষ তদন্তের আড়ালে তৈরি এই প্রতিবেদনটি তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে বিরোধী জোট বিএনপি-জামায়াতের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও আইনি বয়ান (political narrative) তৈরির মূল প্রামাণিক হাতিয়ার সরবরাহ করে, যা সাহাবুদ্দিনকে শাসকদলের আস্থাভাজন করে তোলে।

  • পদ্মা সেতু কেলেঙ্কারি ও ‘ক্লিনচিট’-এর কৌশলগত রাজনীতি:
    ৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতু ছিল দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলাকে রাজধানীর সঙ্গে যুক্ত করার সবচেয়ে বড় মেগা প্রকল্প, যার নির্মাণব্যয় পরবর্তীতে নিজস্ব অর্থায়নে ৩০,১৯৩.৩৯ কোটি টাকায় পৌঁছায়। কিন্তু শুরুতে ২০১১ সালের এপ্রিলে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ১২০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি হলেও একই বছরের ১০ অক্টোবরে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে অর্থায়ন স্থগিত করা হয়। পরবর্তীতে ২০১২ সালের ২৯ জুন ক্যানাডীয় প্রতিষ্ঠান ‘এসএনসি-লাভালিন’-এর সঙ্গে দুর্নীতি ষড়যন্ত্রের অভিযোগে বিশ্বব্যাংক ঋণচুক্তি চূড়ান্তভাবে বাতিল করে।
    বিশ্বব্যাংকের শর্ত ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ২০১২ সালের ২৩ জুলাই তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং ২৪ জুলাই সেতু সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়াকে ওএসডি করা হয়। এই আন্তর্জাতিক সংকটকালে তৎকালীন দুদক কমিশনার মো. সাহাবুদ্দিন শেখ হাসিনা সরকারকে কূটনৈতিক ও আইনি সুরক্ষা দেওয়ার কৌশল নেন:

    • মামলা ও গ্রেপ্তারের নাটকীয়তা: বিশ্বব্যাংকের চাপ প্রশমিত করতে ২০১২ সালের ১৭ ডিসেম্বর সাহাবুদ্দিনের নেতৃত্বাধীন দুদক বাধ্য হয়ে সাবেক সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়াকে প্রধান আসামি করে ৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে এবং ২৬ ডিসেম্বর তাঁকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেয়। কিন্তু মূল রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও মন্ত্রীদের কৌশলে বাদ রাখা হয়।

    • ২০১৪ সালের চূড়ান্ত দায়মুক্তি (ক্লিনচিট): বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন ছেড়ে দিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর, সাহাবুদ্দিনের প্রত্যক্ষ তদারকিতেই ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর দুদক ঘোষণা দেয়—”পদ্মা সেতুতে কোনো দুর্নীতি হয়নি”। এরপর ২০১৪ সালের ২৬ অক্টোবর আদালত ও দুদকের খাতায় মামলাটির আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটিয়ে তৎকালীন মন্ত্রী ও সচিবদের সম্পূর্ণ দায়মুক্তি (ক্লিনচিট) প্রদান করা হয়।

ক্যানাডার রায়কে রাজনৈতিক হাতিয়ারকরণ ও সাম্প্রতিক আইনি মোড় (২০১৭-২০২৬):
২০১৭ সালে ক্যানাডার আদালত যখন এসএনসি-লাভালিন (SNC-Lavalin)-এর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আনা মামলাটি প্রমাণের অভাবে খারিজ করে দেয়, তখন তৎকালীন সরকার সেটিকে রাজনৈতিক ও নৈতিক বিজয়ের ‘আন্তর্জাতিক সনদ’ হিসেবে লুফে নেয়। সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে তৎকালীন দুদক কমিশনার মো. সাহাবুদ্দিন এই রায়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে দাবি করেন যে, বিশ্বব্যাংকের দুর্নীতির অভিযোগ ছিল সম্পূর্ণ “মনগড়া ও ভিত্তিহীন”। এই রায়কে পুঁজি করে সমালোচকদের “দেশবিরোধী ষড়যন্তকারী” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও গণঅভ্যুত্থানের পর এই “ক্লিনচিট” আখ্যানের প্রকৃত সত্য উন্মোচিত হতে শুরু করে। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) বর্তমান চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেন যে, ২০১৪ সালে রাজনৈতিক চাপে এবং “গায়ের জোরে” দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট প্রাথমিক প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও মামলাটি ধামাচাপা দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে দুদক মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করে নতুন তদন্ত শুরু করে, যা সাহাবুদ্দিনের দেওয়া সেই দায়মুক্তির অবৈধতাকে ২০২৬ সালে এসে সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

তারেক রহমান ও খালেদা জিয়াকে আইনি জালে ফাঁসাতে প্রধান ভূমিকা

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিকভাবে ধ্বংস ও মাইনাস করার যে নীল নকশা বাস্তবায়িত হয়েছিল, তাতে তৎকালীন দুদক কমিশনার সাহাবুদ্দিনের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত প্রত্যক্ষ ও কৌশলগত:

  • জজ আদালতের খালাস বাতিল, তড়িঘড়ি আপিল ও বিচারকের পিছু ধাওয়া:
    ২০১৩ সালের ১৭ নভেম্বর ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৩-এর বিচারক মোতাহার হোসেন তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ২১ কোটি টাকা অর্থ পাচারের (মানি লন্ডারিং) মামলায় তারেক রহমানকে সম্পূর্ণরূপে খালাস (Acquit) দেন। কিন্তু এই রায়ের পর সাহাবুদ্দিনের নেতৃত্বাধীন দুদক চরম আগ্রাসী ভূমিকা নেয়। বিচারক মোতাহার হোসেনের অবসর গ্রহণের পরপরই দুদক তাঁর বিরুদ্ধে ঘুষ ও অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধানের ঘোষণা দেয় এবং তাঁকে খুঁজে বের করতে ইন্টারপোল, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই এবং এগমন্ট গ্রুপের শরণাপন্ন হয়। একই সঙ্গে বিচারিক আদালতের এই খালাসের রায়ের বিরুদ্ধে দুদকের ইতিহাস ভেঙে অভূতপূর্ব দ্রুততায় হাইকোর্টে আপিল করা হয়। কমিশনার হিসেবে সাহাবুদ্দিন নিয়মিত প্রেস ব্রিফিং করে তারেক রহমানের সাজা নিশ্চিত করার জনমত তৈরি করেন। এই চতুর ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আইনি প্রক্রিয়ার ফলেই ২০১৬ সালের ২১ জুলাই হাইকোর্টে তারেক রহমানকে ৭ বছরের কারাদণ্ড ও ২০ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছিল।

  • সর্বোচ্চ আদালতে তারেক রহমানের চূড়ান্ত খালাস ও ষড়যন্ত্র ফাঁস:
    পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও আইনি পর্যালোচনার পর ২০২৫ সালের ৬ মার্চ প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন চার বিচারপতির সর্বোচ্চ আপিল বিভাগ গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের আপিল মঞ্জুর করে রায়ে তাঁদের নির্দোষ সাব্যস্ত করে চূড়ান্ত খালাস দেন। এই রায়ের ফলে এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, ২০১৬ সালে সাহাবুদ্দিনের তত্ত্বাবধানে গঠিত দুদকের আপিল এবং সাজা দেওয়ার পুরো বিষয়টিই ছিল রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ।

জিয়া ট্রাস্ট মামলার চার্জশিট অনুমোদন ও রাজনৈতিক পুরস্কারের সমীকরণ

  • বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব—সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ‘মাইনাস’ করার প্রক্রিয়ায় তৎকালীন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার মো. সাহাবুদ্দিনের (চুপ্পু) প্রশাসনিক ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গভীর ও সুদূরপ্রসারী।

  • বিশেষ করে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা দুটিকে সচল রাখা ও দ্রুত সাজার মুখোমুখি দাঁড় করানোর নেপথ্যে তিনি তদারকি কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ ও ২০১১ সালে দায়েরকৃত এ দুটি মামলায় তদন্ত কার্যক্রম দ্রুত শেষ করা, আইনের গ্যাঁড়াকলে ফেলে তড়িঘড়ি করে কমিশনারদের বোর্ড সভায় অভিযোগপত্র (চার্জশিট) অনুমোদন দেওয়া এবং পরবর্তীতে বিচারিক কার্যক্রমে গতি আনার ক্ষেত্রে সাহাবুদ্দিন তাঁর অর্পিত প্রশাসনিক ক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করেন।

  • নিয়মতান্ত্রিক স্বাধীন ও নিরপেক্ষ অনুসন্ধান প্রক্রিয়ার চেয়ে রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে তিনি অভিযোগপত্র দাখিল নিশ্চিত করেছিলেন। একই সঙ্গে, বিচারিক আদালতে অর্থ পাচার মামলায় তারেক রহমান সম্পূর্ণ খালাস পাওয়ার পর দুদকের ইতিহাস ভেঙে অভূতপূর্ব দ্রুততায় উচ্চ আদালতে আপিল করা এবং ওই খালাসের রায় দেওয়া বিচারক মোতাহার হোসেনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক তদন্ত সংস্থার সাহায্য চেয়ে চাপ সৃষ্টির পুরো নকশাটি ছিল তাঁর রাজনৈতিক কৌশলেরই অংশ।

  • বিরোধী রাজনৈতিক নেতৃত্বকে আইনি বাধ্যবাধকতায় আটকে রেখে তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের রাজনৈতিক অবস্থানকে ঝুঁকিমুক্ত করার এই “বিশেষ প্রশাসনিক সেবা”ই পরবর্তীতে সাহাবুদ্দিনের পরম আনুগত্য ও উপযোগিতার বড় সনদ হিসেবে কাজ করে। প্রশাসনিক ও বিচারিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুর প্রতি প্রদর্শিত এই নিরঙ্কুশ তো তোষামোদই পরবর্তীতে দেশের সব জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গকে টপকে তাঁকে দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে বেছে নেওয়ার মূল সমীকরণ বা ‘পুরস্কার’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

‘সালাম’ বিতর্ক ও রাষ্ট্রপতির পদে আইনি টানাপোড়েন

২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে মো. সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনীত করা হলে দেশজুড়ে চরম বিস্ময় ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়।

  • ‘সালাম’ বিতর্ক: রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন—মনোনয়ন পাওয়ার আগে তিনি যখন শেখ হাসিনাকে সালাম করতে যেতেন, শেখ হাসিনা তা এড়িয়ে যেতেন। পরে তিনি বুঝতে পারেন শেখ হাসিনা মনে মনে তাঁকে রাষ্ট্রপতি বানিয়ে রেখেছিলেন। পদের এই তোষামোদমূলক ব্যাখ্যা সুশীল সমাজে হাস্যাস্পদের জন্ম দেয়।

  • দুদক আইনের ৯ ধারা লঙ্ঘন: ২০০৪ সালের দুদক আইনের ৯ ধারা অনুযায়ী অবসরপ্রাপ্ত কমিশনারদের ‘প্রজাতন্ত্রের কোনো লাভজনক পদে’ বসা আইনিভাবে নিষিদ্ধ। সাবেক দুদক কমিশনার হওয়ায় হাইকোর্টে তাঁর নিয়োগ নিয়ে রিট হলেও শেষ পর্যন্ত আদালতের রায়ে তিনি বেঁচে যান, তবে সাংবিধানিক নৈতিকতার প্রশ্নটি অমীমাংসিত থেকে যায়।

ইসলামী ব্যাংক, এস আলম লিঙ্ক ও পারিবারিক অর্থ পাচার

সাহাবুদ্দিনের সবচেয়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক ও অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারি তৈরি হয় ২০১৭ থেকে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডে তাঁর উপস্থিতি ঘিরে।

  • অডিট প্রধানের দায়ভার: ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপ জোরপূর্বক ইসলামী ব্যাংক দখল করার পর, তাদেরই স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ‘জেএমসি বিল্ডার্স’-এর প্রতিনিধি হয়ে সাহাবুদ্দিন ব্যাংকের পরিচালক, পরে ভাইস চেয়ারম্যান এবং অডিট কমিটির চেয়ারম্যান হন। অডিট কমিটির মূল কাজ জালিয়াতি রোখা হলেও, তাঁর মেয়াদকালেই এস আলম গ্রুপ ব্যাংকের কোটি কোটি টাকা বেনামী ঋণের নামে বের করে নিয়ে যায়।

ব্যাংকার ছেলে, এস আলম সিন্ডিকেট ও অর্থ পাচার: সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সময়কালে তৈরি হওয়া আর্থিক জালিয়াতির অন্যতম বড় ভিত্তি ছিল ইসলামী ব্যাংক ও এস আলম গ্রুপের সাথে তাঁর পরিবারের অনৈতিক লেনদেনের যোগসাজশ। অনুসন্ধানে উঠে আসে, তাঁর একমাত্র সন্তান আরশাদ আদনান (রনি)—যিনি পেশায় একজন ব্যাংকার ও চলচ্চিত্র প্রযোজক—বাবার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার সুযোগ নিয়ে ব্যাংকিং খাতের নেপথ্য ‘ফাইন্যান্সিয়াল ম্যানেজার’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপ জোরপূর্বক ইসলামী ব্যাংক দখল করার পর সাহাবুদ্দিন অডিট কমিটির প্রধান ও ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ব্যাংকের মূল অডিট তদারকির দায়িত্বে থেকে এস আলম গ্রুপকে কোটি কোটি টাকার বেনামী ঋণ সুবিধা পাইয়ে দিতে তিনি ও তাঁর ছেলে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখেন। এ সুবিধার বিনিময়ে এস আলম গ্রুপ থেকে শত শত কোটি টাকার অনৈতিক আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করার এবং সেই অর্থ রনির সরাসরি মধ্যস্থতায় অফশোর চ্যানেল, ট্রেড-বেসড মানি লন্ডারিং ও বেনামী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করার গুরুতর অভিযোগ ওঠে। দুবাইয়ের গোল্ডেন ভিসা গ্রহণ, মালয়েশিয়ার ‘সেকেন্ড হোম’ প্রজেক্ট, সিঙ্গাপুর ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ও ব্যাংকিং ডিপোজিট গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এই পারিবারিক-ব্যাংকিং সিন্ডিকেটের সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে বলে বিভিন্ন অনুসন্ধানে উন্মোচিত হয়।

দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন

 রাষ্ট্রপ্রধানের পরিবারের নৈতিক অবক্ষয় ও ক্ষমতার দাপট

একটি দেশের সর্বোচ্চ পদের মর্যাদা কীভাবে পরিবারের সদস্যদের ঔদ্ধত্যে ক্ষুণ্ন হয়, তার বড় প্রমাণ সাহাবুদ্দিনের পরিবার:

  • মিডিয়াপাড়ায় ‘দালালি’ ও বিনোদন নেটওয়ার্ক: আরশাদ আদনান (রনি) একদিকে আওয়ামী লীগের সংস্কৃতি বিষয়ক উপকমিটির পদ এবং অন্যদিকে চলচ্চিত্র প্রযোজকের (যেমন: প্রিয়তমা মুভি) আড়ালে মিডিয়াপাড়ায় ক্ষমতার একচ্ছত্র নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। বিনোদন জগতকে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ও লীগ নেতাদের অনৈতিক সুবিধা আদান-প্রদানের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

  • নাতি কর্তৃক পুলিশ পেটানোর ঘটনা (মে ২০২৪): ২০২৪ সালের মে মাসে গুলশান ডিপ্লোমেটিক জোনে সাহাবুদ্দিনের নাতি ও তার বন্ধুরা রং ড্রাইভে গিয়ে এক সাইকেল আরোহীকে আঘাত করে। এম্বাসির দায়িত্বে থাকা অন-ডিউটি পুলিশ সদস্য বাধা দিতে আসলে রাষ্ট্রপতির নাতি ও তার সঙ্গীরা পুলিশ সদস্যকে মারধর করে ইউনিফর্ম ছিঁড়ে ফেলে। রাষ্ট্রপতির পরিবার হওয়ায় কোনো আইনি পদক্ষেপ ছাড়াই তৎকালীন সময়ে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়া হয়, যা ক্ষমতার নগ্ন অপব্যবহারের চরম দৃষ্টান্ত।

গণঅভ্যুত্থান, পদত্যাগপত্র নিয়ে মিথ্যাচার ও অন্তিম অধ্যায়

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মুখে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর দ্বিমুখী ভূমিকা চূড়ান্ত সংকট তৈরি করে।

  • সংসদ বিলুপ্ত ও বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি: আন্দোলনকারীদের দাবির মুখে ৬ আগস্ট তিনি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত করেন এবং বিশেষ ক্ষমতাবলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তি দেন।

  • পদত্যাগপত্র বিতর্ক ও বঙ্গভবন ঘেরাও: ৫ আগস্ট রাতে জাতির উদ্দেশে ভাষণে তিনি শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র পাওয়ার কথা বললেও, অক্টোবরে এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেন—“শেখ হাসিনার পদত্যাগের কোনো দাপ্তরিক প্রমাণ আমার কাছে নেই।” একই সময়ে লন্ডনে থাকাকালে শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর কথিত গোপন ফোনালাপের খবর ছড়িয়ে পড়লে ছাত্র-জনতা বঙ্গভবন ঘেরাও করে তাঁর পদত্যাগের আল্টিমেটাম দেয়।

  • শারীরিক অসুস্থতা ও পদত্যাগ: রাজনৈতিক চাপ, সামাজিক অনাগ্রহ এবং সরকারের মনোনীত ব্যক্তিদের অপসারণের দাবির মুখে সাহাবুদ্দিনের শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটে। হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, কিডনি জটিলতা এবং ‘অটোনমিক নিউরোপ্যাথি’র (ঘন ঘন জ্ঞান হারানোর রোগ) কারণে শেষ পর্যন্ত তিনি নির্ধারিত মেয়াদের আগেই রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন।

ইতিহাসের দায় ও সাংবিধানিক নৈতিকতার শিক্ষা

মো. সাহাবুদ্দিন (চুপ্পু)-এর কর্মজীবন ও রাষ্ট্রপতিত্বের ইতিহাস কেবল একজন ব্যক্তির উত্থান-পতনের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজনৈতিক ব্যবহার ও নৈতিক স্খলনের এক জীবন্ত দলিল। দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো একটি স্বাধীন সংস্থাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে একদিকে ক্ষমতার শীর্ষবিন্দুকে আইনি সুরক্ষা দেওয়া, আর অন্যদিকে বিরোধী নেতৃত্বকে ধ্বংস করার যে রাজনৈতিক সমীকরণ তিনি তৈরি করেছিলেন—তারই চূড়ান্ত পুরস্কার ছিল দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ। কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ করেছে, অনৈতিক আনুগত্যের ওপর দাঁড়িয়ে তৈরি হওয়া ক্ষমতার ভিত্তি কখনোই স্থায়ী হয় না। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে এসে তাঁর দেওয়া বিতর্কিত ‘ক্লিনচিট’গুলো যেমন আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, তেমনি তাঁর পরিবারের সীমাহীন আর্থিক জালিয়াতি ও ক্ষমতার দাপটও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উন্মোচিত হয়েছে। একটি নজিরবিহীন ও বিতর্কিত মেয়াদের পর তাঁর এই অসম্মানজনক বিদায় ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রনায়ক ও নীতি-নির্ধারকদের জন্য একটি চিরন্তন বার্তা রেখে গেল—রাষ্ট্রীয় পদের প্রতি আনুগত্যের চেয়ে সাংবিধানিক নৈতিকতা ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা বিসর্জন দিলে, ইতিহাসের কাঠগড়ায় তার বিচার অবধারিত এমনই বলেছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।

এই সম্পর্কিত আরো খবর